নাজমুল আবেদীন ফাহিম: হাজারো স্বপ্নের নীরব কারিগর

বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের অভিভাবক বলা যায় তাঁকে। ক্রিকেটারদের সবারই শেষ ভরসার স্থল থাকে প্রিয় ফাহিম স্যার, নাজমুল আবেদীন ফাহিম।

আজকের ফুটে ওঠা ফুলগুলোর কলিগুলো যে তিনিই ফুটিয়েছিলেন। একসময় কাজ ছিল, বয়সভিত্তিক দলগুলোর কোচ হয়ে তরুণ মেধা অন্বেষণ।

সেই সূত্রে চষে বেড়িয়েছেন সারা দেশ। এখন অবশ্য সেই অর্থে সরাসরি কোচিংয়ের সঙ্গে জড়িত না। তিনি আছেন আরো গুরুত্বপূর্ণ পদে। বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগে।

এত বড় পরিসরের দায়িত্ব বেশ ভালভাবেই পালন করছেন তিনি। বয়সভিত্তিক দলগুলোর নানা প্রোগ্রামে খেলোয়াড় তৈরির কাজটি নীরবেই করে যাচ্ছেন প্রায় দুই দশক ধরে। আর খেলোয়াড়দের কখনো কোনো সমস্যা হচ্ছে, তাঁদের প্রিয় ‘ফাহিম স্যার’ তো রয়েছেনই!

সাকিব,মুশফিকরা মাঝেমধ্যেই গুরুর কাছে পরামর্শ নিতে হাজির হন। বেসিক খুঁটিনাটি কিছু পরিবর্তন লাগলে, ফর্মহীনতার কারণ বিশ্লেষণে তিনি সবসময়ই সাহায্য করেন।

শুধু সাকিব, মুশফিকই না, ইমরুল কায়েস, মমিনুল হক, সৌম্য সরকার, জুবায়ের হোসেন-কার জন্য খোলা নেই নাজমুলের দরজা!  বাংলাদেশের ক্রিকেট এর অগ্রগতির পেছনের মানুষগুলোর মধ্যে অন্যতম তিনি।

মানসম্পন্ন ক্রিকেটার গড়ে তোলায় ফাহিম স্যারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ফাহিম স্যারের সাথে ক্রিকেটারদের সম্পর্ক পরিবারের মতো। ক্রিকেটাররা প্রায়ই নিজেরা ফাহিম স্যারের বাড়িতে মুখোমুখি হয়। নিজেরাই নিজেদের মধ্যে ‘মুড়ি পার্টি’র আয়োজন করেন।

বিকেএসপিতে থাকতে ক্রিকেটারদের সন্তানের মতো দেখাশো করতেন। তাই তো ক্রিকেটারদের কাছে প্রিয় দুইজন গুরু হলেন ফাহিম স্যার এবং সালাহউদ্দিন স্যার। অনেকটা নীরবেই বিকেএসপিতে দীর্ঘ ১৭ বছর কাজ করেছেন তিনি।

নাফিস, সাকিব, মুশফিক, শামসুর, মারুফদের থেকে শুরু করে বর্তমানে উঠে আসা সৌম্য, নাসির লিটনরা নিজেদের সমস্যা নিয়ে ছুটে যান তার কাছে। দেশের মধ্যে কেবল বিকেএসপিতে নয় যখন দেশের বাইরে সাকিব-মুশফিকদের নিয়ে যেতেন তখন সবাইকে আগলে রাখতেন।

সেখানে প্রতি রাতেই পরিবারের মতো তাদের সাথে খেলা এবং খেলার বাইরের বিষয় নিয়ে আড্ডা দিতেন। বিকেএসপি থেকে আজ এত স্টার ক্রিকেটার বের হবার পেছনে অন্যতম প্রধান ভূমিকা ছিলো ফাহিম স্যারের।

একসময় ঘরোয়া লিগে খেললেও নিজের খ্যাতি ছড়িয়েছেন কোচ হিসেবে। সব ক্রিকেটারদের খবরই রাখেন তাদের ভুল শুধরানোর জন্য।

জীবনে কখনোই ক্লাবের কোচ হননি বিসিবির সাথে যুক্ত ছিলেন বলে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন তিনি, আজ সেই স্বপ্ন তিনি পূরণ করেছেন। তিনি হাই-পারফর্মেন্স দলের ম্যানেজার। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের কোচ হিসেবে কাজ করছেন তিনি।

২০০৩ সালের ছবি। ইডেন গার্ডেন্সে কিশোর তামিম ইকবালের সাথে কোচ ফাহিম।

মাঠের ক্রিকেটারদের সবাই চিনি, মাঠের বাইরের নাজমুল আবেদীন স্যারদের কয়জনই বা চিনি। শুরু থেকেই বাংলাদেশকে বিশ্বসেরাদের কাতারে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। এদেশের ক্রিকেটারদের প্রতিভাকে বের করে আনেন তারা।

নাজমুল আবেদীন স্যারকে ক্রিকেটাররা এখনো শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে, বিশ্বসেরা হলেও তাদের কাছেই ছুটে যান। এটাই হয়তো তাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।

জাতীয় দলে এখন যারা খেলছেন, তাদের সবাইই কোনো না কোনো ভাবে এই মানুষটির ছাত্র। মুশফিক, তামিম, নাসিররা এখনো ব্যাটিং নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়লে ছুটে যান তাঁর কাছে, টেকনিক্যাল যেকোনো বিষয়ে সবার জন্য তাঁর দুয়ার খোলা থাকে।

তাঁর সর্বশেষ অ্যাসাইনমেন্ট ছিল নারীদের এশিয়া কাপ। মালয়েশিয়াতে দলের সাথে ছিলেন ম্যানেজার-মেন্টর হিসেবে। সেখানে তো রীতিমত ইতিহাসই গড়লেন সালমা, রুমানা, শামীমা, জাহানারারা। প্রথমবারের মত জিতে গেল এশিয়া কাপের শিরোপা। সেটাও আবার ভারতের মত বিশ্বমানের দলকে পাঁচদিনের মধ্যে দু’বার হারিয়ে। আড়ালের নায়ক নাজমুল আবেদীনের এই অবদানটা কখনোই মুছে যাবে না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।