একবার নয়, তিনবার তিনি তাজমহল বিক্রি করে ফেলেন!

‘নটওরলাল: ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঠগবাজ’ – এই কথাটা দিয়ে তাঁকে মোটামুটি ব্যাখ্যা করা যায়, তবে তারপরও কিছু ব্যখ্যা বাকি থাকে। কারণ, কারো কারো মতে এই ‘ভদ্রলোক’ কেবল ভারত নয়, গোটা বিশ্বের ইতিহাসেরই সবচেয়ে বড় ঠগবাজ।

পুরো নাম মিথিলেশ কুমার শ্রীবাস্তব। জন্ম ১৯১২ সালে বিহারের সিওয়ান জেলা বাঙগ্রা গ্রামে। তিনি পেশায় ছিলেন একজন আইনজীবি। সেখান থেকে হয়ে গেলেন কিংবদন্তিতুল্য একজন ঠগবাজ। মৃত্যুর পরও (যদি আদৌ মারা গিয়ে থাকেন) তাঁর গল্পগুলো বেঁচে আছে।

  • কখনো রাষ্ট্রপতি, কখনো বিজনেস ম্যাগনেজ

মানুষদের বোকা বানানো তাঁর জন্য কোনো ঘটনাই ছিল না। ওই আমলে পাসওয়ার্ড বা পিন নম্বর বলতে কিছু ছিল না। সিগনেচারেই সব কাজ হত। খুব দক্ষতার সাথে নটওরলাল ডাক্তার রাজেন্দ্র প্রসাদ কিংবা ধিরুভাই আম্বানীর সিগনেচার নকল করতে পারতেন। এই করে তিনি অনেকবার হাজারের ওপর রূপি সরিয়ে নিয়েছেন। টাটা, বিরলা, আম্বানি বা মিত্তাল সবার চোখেই ধুলো ছুড়েছেন তিনি।

  • তাজমহল বিক্রি!

তিনি সরকারি কর্মকর্তা সেজে ধোকা দিতেন বিদেশি টুরিস্টদের। সেই করতে গিয়ে একবার নয়, তিনবার তিনি বিক্রি করেছিলেন সম্রাট শাহজাহানের বানানো তাজমহল। এখানেই শেষ নয়, দিল্লির লাল কেল্লা দু’বার তিনি বেঁচে দিয়েছিলেন। একবার বিক্রি করেন রাষ্ট্রপতি ভবন। তখনই তাঁর রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদের সই নকল করার দরকার পড়ে।

  • পার্লামেন্ট হাউজ কেলেঙ্কারি

তিনি পার্লামেন্ট ভবনও বিক্রি করে দিয়েছিলেন। শুধু পার্লামেন্ট ভবনই নয়, তার বিক্রির তালিকায় ছিল ৫৪৫ জন সংসদ সদস্যও।

  • মামলার সেঞ্চুরি

ভারতে তিনি ছিলেন ‘ওয়ান্টেড’ আসামী। আটটি রাষ্ট্রে তার বিরুদ্ধে ১০০-টিরও বেশি কেস জমা হয়েছিল।

  • জেল পালানোর ওস্তাদ

তিনি মোট নয়বার গ্রেফতার হয়েছেন। পালিয়ে গেছেন প্রত্যেকবারই। বিরাহ রাজ্য একবার তাঁকে গ্রেফতার করে ১১৩ বছর জেল দিয়েছিল। কিন্তু, তাঁকে আটকাতে পারেনি। খুব বেশি হলে ২০ বছর জেল কাটিয়ে তিনি পালিয়ে যান।

সব মিলিয়ে তিনি পালানোর ওস্তাদই ছিলেন। তাঁর কমপক্ষে ৫০ টি ক্রাইমের নজীর পাওয়া যায়, যেখানে তিনি স্রেফ চোখের নিমিষে গায়েব হয়ে গেছেন। একবার তিনি কানপুর জেল থেকে একজন সাব-ইন্সপেক্টরের পোশাকে বের হয়ে আসেন, গার্ডকে কিছু অর্থ ধরিয়ে দেন। এরপর একটা ট্যাক্সি নিয়ে গায়েব হয়ে যান।

  • লাস্ট এস্কেপ

তার সর্বশেষ পালানোর ঘটনাটা খুবই নাটকীয়। ১৯৯৬ সালের ৪ জুন তাকে নয়াদিল্লির রেলওয়ে স্টেশনে সর্বশেষ দেখা যায়। কানপুর জেল থেকে তাকে এআইআইএমইস হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল। ওই সময়ে ৮৪ বছর বয়স্ক নটওরলাল হুইলচেয়ার থেকে পালিয়ে যান, পুলিশের নাকের নিচ থেকে।

  • মৃত্যু রহস্য

তিনি কবে মারা গিয়েছেন, নাকি আদৌ মারা যান নি – এই রহস্য আদৌ কেউ জানে না। তাঁর ভাইয়ের দাবি ১৯৯৬ সালে তিনি তাঁর শেষকৃত্য করেছেন। আবার নটওরলালের আইনজীবি ২০০৯ সালে তাঁর মক্কেলের বেঁচে থাকার দাবী তোলেন। তখন তাঁর বয়স ৯৭!

  • গরিবের রবিনহুড

তিনি কখনও পুলিশের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াননি। বরং নিজের গ্রামের মানুষই তাঁকে আশ্রয় দিতেন। তিনি ছিলেন গরিবের রবিনহুড। নিজে ঠগবাজি করে যা আয় করতেন তার বড় একটা অংশ ব্যয় করতেন গ্রামের দরিদ্রদের জন্য।

তার গ্রামের মানুষ এখনো তাঁকে ভালবাসে। ২০১১ সালে সিওয়ানে একজন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘১৯৯২ সালে নটওরলাল একবার সিওয়ান শহরে আসেন। ওকে এত ভিড় ছিল যে একবার চোখেও তাঁকে দেখতে পারলাম না।’ ওই শহরে নটওরলালের একটা বড় মুর্তি নির্মানেরও পরিকল্পনা চলছে।

  • বলিউডে নটওরলাল

১৯৭৯ সালে অমিতাভ বচ্চন এই ঠগবাজের জীবন অবলম্বনে নির্মিত ‘মিস্টার নটওরলাল’ সিনেমাটি করেন। এর বাদেও তাঁর জীবনের অনেক অংশ অনেক সিনেমায় দেখা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল অভিষেক বচ্চন ও রানী মুখার্জীর ‘বান্টি ওউর বাবলি’। এর বাদে একালে এসে একই রকম গল্প অবলম্বনে ইমরান হাশমী করেন ‘রাজা নটওরলাল’।

– ইন্ডিয়া টাইমস ও স্কুপহুপ অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।