ক্রিকেট ও নাটোরের গল্প: ইতিহাসের এক অজানা অধ্যায়

রাজশাহী শহরের সীমান্তঘেরা একটি জেলা নাটোর। কে না জানে এই নাটোরের নাম। জীবনানন্দ দাশের সেই কিংবদন্তিতুল্য বনলতা সেনের বাসভূমি হিসেবে জায়গাটি আমাদের মনে আলাদাভাবে স্থান দখল করে আছে। যদিও এই জেলাই বনলতার নাটোর কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে।

গ্রামাঞ্চলে জমজমাট সাপ্তাহিক বা মাসিক হাটবাজার, বছরভর মেলা, পালাগানের আসর সবমিলিয়ে এই অঞ্চল থাকে বেশ চঞ্চল ও উৎসবমুখর। এখানকার বিখ্যাত কাঁচাগোল্লা মিষ্টি ও সন্দেশ শুধু দেশেই প্রসিদ্ধ নয় বিদেশের গণ্ডিতেও ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে দুটি চিনি মিল রয়েছে যা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অবদান রেখেছে।

একটা সময়ে, নাটোর ছিল জলাভূমি, বেশিরভাগই ছিল জলের নিচে। ১৭০৬ সালে রাজা রামজীবন রায় এই জলাভূমির রূপে মুগ্ধ হয়ে এর বেশিরভাগ অংশ ভরাট করে এখানেই তাঁর রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। এরমধ্য দিয়ে নাটোরের যেন নতুন জীবন শুরু হল। নাটোরের মহারাজারা ধীরে ধীরে, নাটোরকে অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম অভিজাত ও আকর্ষণীয় নগরী হিসেবে গড়ে তোলেন। তাঁরা ভাল শিক্ষাব্যবস্থা, শক্তিশালী অর্থনীতি, সুস্থ শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চার উপর জোর দিয়েছিলেন। নাটোর খেলাধুলার বিকাশ থেকেও খুব একটা দূরে ছিল না, ব্রিটিশ রাজত্বেও তা বজায় ছিল।

সেটা সেই সময়ের কথা, যখন ব্রিটিশরা ক্রিকেট খেলাকে আত্মস্থ করে ফেলছিল এবং অভিজাত ব্রিটিশরা খেলাটি গণপ্রচলন করতে শুরু করল, যা থেকে উপমহাদেশের ব্রিটিশরাও পিছিয়ে ছিল না।

১৭২১ সালে, ব্রিটিশ ভারতে ব্রিটিশ নাবিকরা কাম্বাটের বন্দরে নিজেদের মধ্যে একটি ক্রিকেট ম্যাচ খেলেছিল। সৈনিকরা দূরদেশে পড়ে থেকেও নিজদেশের ঐতিহ্যের স্বাদ পেতে মাঝেমাঝেই ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করত। এই ম্যাচে স্থানীয় আমজনতা উপস্থিত থাকলেও খেলার কিছুই বুঝত না। ক্রিকেট সহজেই বুঝে ফেলার মত খেলা ছিল না, আর স্থানীয়রা এটি গুরুত্বও দিত না। তারপরও ইংরেজরা উপমহাদেশে ক্রিকেটকে প্রচলনে আগ্রহী ছিল, এবং এখানে খেলার পরিমাণ বাড়াতে থাকে।

ভারতীয় উপমহাদেশের মহারাজারা তাদের শৌখিনতার প্রকাশ ও অভিজাত মহলে অবস্থান আরো সুদৃঢ় করতে ব্রিটিশদের রাজকীয় খেলাগুলি আয়োজন করতে পছন্দ করতেন। তাঁরা পোলো, গলফ এবং ঘোড়দৌড় এর মত অভিজাত খেলাগুলিতে বিশেষ দৃষ্টি দিতেন। এটা তাদের মর্যাদাবৃদ্ধি ও নাম ছড়ানোর একটি কৌশল ছিল। তাই আরেক রাজকীয় খেলা ক্রিকেট তাঁদের নেকনজরে পড়ল। তাঁরা ক্রিকেট প্রচলনের দিকে আগ্রহী হতে লাগল।

ব্রিটিশ রাজ ও মহারাজাদের ক্রিকেট ম্যাচ

প্রখ্যাত ক্রীড়ালেখক ও গবেষক বোরিয়া মজুমদার তাঁর ‘ক্রিকেট ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া’ বইয়ে লিখেছেন, ‘কিছু অভিজাত ব্যক্তিবর্গের জন্য, ক্রিকেট ছিল সামাজিক গতিশীলতার একটি হাতিয়ার। আবার অনেকে ক্রিকেটকে ভাবত নিজেদের মাটিতে শাসিত জাতি হয়ে শাসকদের বানানো খেলাতেই তাঁদের হারিয়ে একটি চ্যালেঞ্জ করার একটি মাধ্যম হিসেবে। আসলে উপনিবেশ জাতির কাছে ক্রিকেট খেলার চেয়ে বেশিকিছু ছিল, এটি প্রকৃতপক্ষে নিগূঢ় উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী উপর রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের একটি প্রতিকী অর্থ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছিল।’

আসলেই ক্রিকেট একটি কার্যকর রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল এবং সামাজিক গতিশীলতা অর্জনের মাধ্যমগুলির মধ্যে একটি ছিল এবং একই সাথে, ক্রিকেট বিভিন্ন প্রতিবেশী প্রতিদ্বন্দ্বী রাজ্যের মহারাজাদের মধ্যে শক্তি ও সামর্থ্য দেখিয়ে কর্তৃত্ব প্রদর্শন করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, যা এই খেলাটিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।

কুচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ ভূপ বাহাদুর এবং নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্র নারায়ন রায়, বাংলায় ক্রিকেটকে ছড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম কারিগর ছিলেন।

কুচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ ভূপ বাহাদুর

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে কুচবিহারের মহারাজা নিজের খরচে তিনটি ক্রিকেট দল চালাতেন। জো ভেইন, জর্জ কক্স এবং ফ্রাঙ্ক টাররান্টের মতো পেশাদার ব্রিটিশ ক্রিকেটাররা তার দলের হয়ে খেলতেন। কুচবিহার একাদশ খুব ভারসাম্যপূর্ণ দল ছিল। যথেষ্ট দক্ষতার কারণে বিশ্বের অন্যান্য সেরা প্রথম শ্রেণীর দলকেও চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা রাখত।

ক্রিকেট রাজ্যে কুচবিহারের মহারাজের এই একক রাজত্ব নাটোরের জমিদারকেও উসকে দেয়। জগদীন্দ্র নারায়ন রায় ১৯০৬ সালের দিকে একটি ক্রিকেট দল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পি ভিটাল, জেএস ওয়ার্ডেন, পি শিবরাম ও কে সেশাচারির মত ক্রিকেটারদের দলে আনেন।

মহারাজা রায় সাফল্য পাবার জন্য উদগ্রীব ছিলেন। তিনি দক্ষিণ কলকাতার পুরোনো বালিগঞ্জের কাছে বনদেল রোডে ৪৫ একর জমি কিনে একটি ক্রিকেট মাঠ নির্মাণ করেন। মাঠটার নাম হয় নাটোর গার্ডেন। তখন নাকি মাঠটা কলকাতার খ্যাতনামা ইডেন গার্ডেনকেও পাল্লা দিত। মহারাজ তাঁর দলে স্বজা্তিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাখতেন, বিশেষত বাঙালিদের তিনি দলে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন। ফলে তাঁর দল প্রচুর বাঙালি সমর্থন পেতে থাকে মাঠে, এবং সাধারণ বাঙালিরাও ক্রিকেটে আগ্রহী হতে থাকে।

নাটোরের মহারাজার ক্রিকেট পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে হেমচন্দ্র রায় বলেন, ‘যখন নাটোর দল বাংলার ক্রিকেটকে শাসন করছিল তখন আরেক বাঙালি রাজ্য কুচবিহারের মহারাজাও একটি ভালমানের ক্রিকেট দল গঠন করেছিলেন। কিন্তু, আমরা বাঙালিরা কুচবিহারের জয়ে তেমন উচ্ছ্বসিত ছিলাম না। কারণ এই জয়ের কৃতিত্বগুলি দলটির বিদেশী ও অন্য রাজ্যের খেলোয়াড়দের ছিল, কুচবিহার দলের মধ্যে বাঙালিদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য।’

সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়

নাটোরের মহারাজা একজন অন্তপ্রাণ স্বদেশী ছিলেন এবং কয়েক বছর তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ১৮ বছর বয়সে তিনি সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের অনুরোধে নাটোর রাজনৈতিক সমিতির সভাপতি হন। ১৮৯৪ সালে তিনি রাজশাহী পৌরসভায় সদস্য হওয়ার জন্য সুরেন্দ্রনাথ ও আনন্দমোহন বোসের দলে যোগ দেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর তিনি বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তার স্বদেশী  মনোভাব তাঁর ক্রিকেট অনুরাগেও বেশ ভাল প্রভাব ফেলেছিল।

মহারাজ ক্রিকেটের মাঠকে একটি নিছক খেলার মাঠ ভাবতেন না, তিনি এটিকে একটি যুদ্ধের ময়দান ভাবতেন – তাঁর অভিপ্রায় ছিল ব্রিটিশদের তাদের প্রিয় খেলাতে হারিয়ে দিয়েই কিঞ্চিৎ মৌন শিক্ষা দেয়ার। কুচবিহারের মহারাজা তাঁর দলে ইংরেজ খেলোয়াড়দের খেলালেও মহারাজা রায় শুধু ভারতীয়দের মধ্যে ক্রিকেট সম্প্রসারণেই আগ্রহী ছিলেন।

নাটোর মহারাজের সেই বিখ্যাত ক্রিকেট দল

তিনি তাঁর দলকে ট্রেনিং দিতে প্রখ্যাত ক্রিকেটার সর্দারঞ্জন রায়কে কোচ হিসেবে নিয়োগ দেন। পরবর্তীকালে, সর্দারঞ্জন রায়ের দুই ভাই মুক্তিদারঞ্জন ও কুলদারঞ্জন বাংলা ও তদুপরি ভারতের ক্রিকেট উন্নয়নে নাটোরের মহারাজার দলে কাজ করার জন্য যোগ দেন।

নাটোরের মহারাজা তাঁর স্বপ্নপূরণের জন্য এতটাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন যে, তাঁর প্রিয় পালকপুত্র শিরিশচন্দ্র রায়ের জীবনাবসানও তাঁকে টলাতে পারেনি। সেই পালকপুত্র নাটোরের একটি দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেছিল এবং তার বাবা ছিল নাটোর কোর্টের একজন কেরানি। সেখান থেকে রাজা তাঁকে তুলে এনে নিজের বাড়িতে স্থান দেন। তিনি এই পুত্রকে যথেষ্ট ভালবাসতেন। শিরিশচন্দ্র নিজেও ছিলেন প্রতিভাবান তরুণ ক্রিকেটার।

কিন্তু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে তিনি মহারাজ রায়কে ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান। মহারাজ এতে তীব্র আঘাত পান।  তিনি শোকাবহ মন নিয়ে শান্তিনিকেতনে চলে যান। কিন্তু এক মাস পরেই রাজ্যে ফিরে আসেন, তাঁর ফেলে আসা সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য। তাঁর এই শক্ত মনোবল অভিজাত মহলের আলোচনায় তো ছিলই, সাধারণ মানুষদেরও চমকে দিয়েছিল।

দলের খেলোয়াড় নির্বাচন করার সময়, মহারাজা রায় কখনো বর্ণ, গোত্র বিবেচনা করতেন না। উচ্চবর্ণের ক্রিকেটার বাদ দিয়ে নিম্ন-বর্ণের হিন্দু মনি দাসকে দলে নিয়ে তিনি উচ্চবংশের তাচ্ছিল্যের শিকারও হয়েছিলেন। কিন্তু মনি দাস বাংলার বিখ্যাত ক্রিকেটার ও উচ্চবংশীয় কালাধন মুখার্জীর চেয়েও ভাল ক্রিকেট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

মহারাজা রায় তখন বলেন, ‘বর্তমান বাঙালি ক্রিকেটারদের মধ্যে, মনি দাস খুব ভাল করছে। তাঁর প্রতিভা বুঝতে পেরে আমি তাঁকে গোহালির বিপক্ষে ওপেনিংয়ে পাঠাতে চাচ্ছিলাম। সে নামতে রাজি হচ্ছিল না। আসলে তাঁর অন্যান্য বিশিষ্ট সতীর্থদের সাথে একই কাতারে খেলতে ও পারফর্ম করতে সে সংকোচবোধ করছিল। এই অবস্থা দেখে আমি তাকে ডেকে পাঠালাম এবং বললাম, আমাদের প্রথম পরিচয়, আমরা বাঙালি! তাই ভাল ক্রিকেট খেলে সুনাম অর্জন করে বাংলার ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়ার কাজটা কিন্তু তোমার মত বাঙালিদেরই পালন করতে হবে। ভারতীয় ক্রিকেটের নেতৃত্ব তুলে নিতে এটাই সময়, তাই নিজেকে প্রমাণ করাই এখন বাঙালিদের গুরুদায়িত্ব। আমার কথা শোনার পর সে আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়, সে আমাকে প্রণাম করে আমার আশীর্বাদ নিয়ে মাঠে নামে এবং দলের জন্য অমূল্য একটি ইনিংস খেলে দলকে এগিয়ে দেয়।’

বাবাজি পালওয়ানকার বালো

মহারাজা রায় ক্রিকেটার চিনে তাঁদের প্রতিভা ধরতে পারতেন। বাবাজি পালওয়ানকার বালোর মতো দুর্দান্ত বাঁ-হাতি আর্ম স্পিনার আবিস্কার করেন, নাটোর দলের কম্বিনেশনের বৈচিত্র্য এতে বহুগুণে বেড়ে যায়। দলটি ঔপনিবেশিক ভারতের সেরা ব্যালেন্সড ক্রিকেট দলগুলির মধ্যে একটি হয়ে ওঠে যখন পালওয়ানকারের দুই ভাই গণপতি ও ভিথালের মতো ক্রিকেটার দলে যোগ দেন।

পালওয়ানকার বালোকে ছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের কথা ভাবাই যায় না। ৩৩ টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলে ১৭৯ টি উইকেট পাওয়া এই ক্রিকেটারকে বলা হয় উপমহাদেশীয় ক্রিকেটের প্রথম ‘নায়ক’। নাটোর মহারাজের দলে আরো ছিলেন শিশাচারী, কেএন মিস্ত্রী, ওয়ার্ডেন, এইচএল সেম্পাররা।

নাটোর দল বাঙালিদের জন্য গর্বের প্রতীক হয়ে ওঠে। তাদের জয়গুলি এই জাতিকে নিজেদের নিচু ও অথর্ব ভাবা থেকে ধীরেধীরে সরিয়ে আনতে থাকে। মহারাজ রায়ের ক্রিকেট নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষাগুলি শুধু খেলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অন্যদের মত শুধু তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের খেল দেখাতেই থেমে ছিল না। তিনি খেলার স্পিরিট ও ঐক্যবদ্ধ মনোভাব সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। তিনি খেলায় অন্যায় সহ্য করতেন না কিন্তু তিনি সহনশীল ছিলেন।

নাটোরের রাজবাড়ি

একবার হাই কোর্টের আইনজীবীদের বিরুদ্ধে এক ম্যাচে আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তে নাটোরের একজন ব্যাটসম্যান রান আউট হন। বর্তমানে ডাইরেক্ট হিটে স্টাম্প ভাঙতে পারলে আউট দেয়া হলেও তখনকার নিয়মে, কেউ সরাসরি হাত দিয়ে স্টাম্প না ভাঙলে আউট দেয়া হত না। সে ম্যাচে ফিল্ডারের থ্রো ননস্ট্রাইক এন্ডে বোলার মিস করেন, এবং বল সরাসরি স্টাম্পের বেইল ভেঙে দেয়। আম্পায়ার ভেবেছিলেন, স্টাম্পে লাগার আগে বল বোলারের হাতেই ছিল।

বোলার পূর্ণ রায় স্বয়ং আম্পায়ারের কাছে গিয়ে সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানায় কারণ সে জানত,  বল তাঁর হাত স্পর্শ করেননি। কিন্তু নাটোরের মহারাজা ব্যাপারটি লক্ষ করে এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হন, তিনি বলেন, আউট ইজ আউট! আউট একবার দেয়া হয়ে গেছে তাই ব্যাটসম্যানকে ফিরে যেতেই হবে, এটাই নিয়ম। মহারাজ মূলত আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং খেলায় স্পিরিটের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেন। আম্পায়ার, রাজার দলের বিপক্ষে ভুল আউট দিয়ে কিছুটা শংকিত ছিলেন, কিন্তু মহারাজ স্বয়ং তাঁকে নিয়ে সাহস দিয়ে বলেন, মানুষ মাত্রই ভুল হয়, সুতরাং এটি হতেই পারে।

নাটোরের শংকর গোবিন্দ চৌধুরী স্টেডিয়াম

১৯১৪ সালের দিকে, যখন ভারত টেস্ট খেলার মহেন্দ্রক্ষণে ছিল, তখন মহারাজা রায়ের ক্রিকেট নিয়ে উৎসাহ কিছুটা কমতির দিকে যেতে দেখা যাচ্ছিল। আসলে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী কুচবিহারের মহারাজা এর কয়েক বছর আগে মারা যাওয়ার পর থেকেই ক্রিকেট থেকে মহারাজ আগ্রহ হারাতে শুরু করেন। তিনি বাঙালি সাহিত্য প্রচারে মনোনিবেশ করেন এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সাথে তাঁর কার্যক্রমের ফলে বাংলার ক্রিকেটে তাঁর উপস্থিতি কমে আসতে থাকে।

নাটোরের মহারাজা ক্রিকেটকে এতটাই ভালবেসেছেন, সময় দিয়েছেন যতটা তিনি তাঁর পরিবারকেও দেন নি, যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন যা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশী, কিন্তু ঠিক কি কারণে এতটা আগ্রহী হয়েছিলেন তা বলা মুশকিল। হয়তো, দেশের প্রতি প্রবল আবেগ এবং কুচবিহারের মহারাজার সাথে ঠান্ডা লড়াই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যা কুচবিহারের রাজা মারা যাওয়ার পর স্লান হয়ে যায়। কিন্তু যেটাই হোক, নাটোরের মহারাজা্র ক্রিকেটআগ্রহই যে এদেশে ক্রিকেটকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল তা বলাই বাহুল্য।

১৯১১ সালে ব্রিটিশ ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দল

নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্র কলকাতা ক্রিকেট ক্লাবের সদস্য ছিলেন। বলা হয়, নাটোর স্টেডিয়ামও তাঁরই বানানো। স্টেডিয়ামটির নাম এখন শংকর গোবিন্দ নারায়ন চৌধুরী স্টেডিয়াম। মহারাজের এক চোখ ছিল না। তারপরও ক্রিকেট পাগল এই মানুষটি নিজে ক্রিকেট খেলতেন। বোলিং না করলেও ব্যাটিং আর ফিল্ডিংটা খারাপ করতেন না।

দার ছেলে কুমার জোগিন্দ্র নারায়ন নাথও ভাল ক্রিকেটার ছিলেন। ১৯২৫ সালে জগদীন্দ্র মারা যান। এরপর দলটা তাঁর ছেলেই চালাতেন। ইতিহাস বলে, নাটোরের এই ক্রিকেট দলটা ১৯৪৫ সাল অবধি টিকে ছিল।

– ক্রিকেটসকার ও ইএসপিএন ক্রিকইনফো অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।