অপরচুনিটি রোভার: এক নিঃসঙ্গ যাযাবর

‘মাই ব্যাটারি ইজ লো, ইটস গেটিঙ ডার্ক’ – হুট করে এই লাইনটা দেখে আপনার চোখ হয়তো থমকে যাবে। হয়তো মনে হবে নতুন কোনো হলিউড সায়েন্স ফিকশনের আইক্যাচি ডায়লগ। তবে এই লাইনটার মাহাত্ম আরেকটু বেশি। এটি ছিলো মঙ্গলের বুকে ঘুরে বেড়ানো আমাদের এক বিশ্বস্ত বন্ধুর শেষ বাক্য।

সময়কাল ২০০৩, জুলাই ৭। নাসার বিজ্ঞানিরা ব্যস্ত একটি রোবট নিয়ে যার নাম ‘MER-B’। এম.ই.আর: মার্স এক্সপ্লোরেশন রোভার নাসার এই প্রোগ্রামের প্রধান কাজ ছিলো চারটি –

  • আমাদের সৌরজাগতিক বন্ধু মঙ্গলের বুকে প্রাণ খুঁজে বেড়ানো।
  • মঙ্গলের আবহওয়ার সম্পর্কে জানা।
  • মঙ্গলের ভূতত্ত্ব বিশ্লেষণ করা
  • এবং মানুষের মঙ্গল যাত্রা করার পথ সূগম করা।

মঙ্গলে পানি এবং প্রানীর সন্ধান কিংবা অস্থিত্ব খুঁজে পেতে নাসাবাসি তৈরি করেন ‘MER-A’ এবং  ‘MER-B’। যাদের অন্য নাম যথাক্রমে  ‘স্পিরিট’ এবং ‘অপরচুনিটি’।

আমাদের গল্প ‘MER-B’ কিংবা ‘অপরচুনিটি’ নিয়ে। অপরচুনিটি পৃথিবীর বুক থেকে ২০০৩ এ বিদায় নিয়ে মঙ্গলে নতুন বাসস্থান বানায় জানুয়ারি ২৫, ২০০৪ সালে। স্পিরিট রোভার মঙ্গলে যাওয়ার মাত্র তিন সপ্তাহ পর।

বিজ্ঞানিরা আশা করেছিলেন রোবট রোভার দুটির কার্যদিন হবে প্রায় ৯০ sol এর মতো। মানে পৃথিবীর নব্বুই দিন থেকে সামান্য বেশি। যদিও স্পিরিট এবং অপরচুনিটি দুজনেরই আয়ুষ্কাল ছিলো আরো বেশি। স্পিরিট মঙ্গলে বেঁচে ছিলো প্রায় ৭ বছরের মতো। আর অপরচুনিটি রোভারের কার্যদিবস ছিলো প্রায় ১৪ বছর। যা নাসার বিজ্ঞানিদের এস্টিমেশনের ৫৫ গুন বেশি।

অপরচুনিটি রোভার এই প্রচেষ্টায় আবিষ্কার করে যে প্রাচীন কোনো এক সময়ে মঙ্গলের আবহাওয়া ছিলো আদ্র এবং উষ্ণ। যা বাড়িয়ে দেয় অতীতে মঙ্গলে প্রাণের উপস্থিতি থাকার সম্ভাবনা। তাছাড়াও অপরচুনিটি প্রথমবার পৃথিবীর বাইরের গ্রহে, পাললিক শীলা পাথরের আবিষ্কার করে। তাছাড়াও অপরচুনিটি ছোট হেমাটাইটের পাথর আবিষ্কার করে, যাকে বিজ্ঞানীরা আদর করে ‘ব্লুবেরি’ নামে ডেকে থাকেন। জীবদ্দশায় অপরচুনিটি সবচে আশা জাগিয়েছিলো যখন সে মঙ্গলে একধরনের মাটির মিনারেল আবিষ্কার করে, যা তৈরি হয়েছিলো পানি দিয়ে। যার পিএইচ ছিলো নিউট্রাল। যা মঙ্গলে পানি থাকার সম্ভাবনাকে দৃঢ় করে।

আগেই বলেছিলাম রোভারের কাজ ছিলো মঙ্গলে পানির অস্থিত্ব বের করা, সে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই অপরচুনিটি রোভার সাফল্যের সঙ্গে মঙ্গলের বিভিন্ন প্যারানমা ছবি তুলে পাঠায় নাসার বিজ্ঞানিদের কাছে। যারা সেই ছবিগুলো পরীক্ষা করে বের করার চেষ্টা করে মঙ্গলে কি আদৌ কখনো পানি ছিলো কিনা।

অপরচুনিটি রোভার তাঁর জীবদ্দশায় প্রায় ৪৫.১৬ কিলোমিটার বা ২৮.০৬ মাইল পথ অতিক্রম করে। আপনি হয়তো ভাবছেন, এ আর এমন কি দূরত্ব? তবে আপনার জন্য সামান্য পরিসংখ্যান যাতে আপনি বুঝতে পারবেন কতোটা ইম্প্রেসিভ ছিলো, অপরচুনিটির যাত্রা।

অপরচুনিটি রোভারের যাত্রাপথ।

অ্যাপোলো লুনার ৭ এর অতিক্রান্ত দূরত্ব ২২.২ মাইল, সোভিয়েত লুনোখোদ ২ পাড়ি দেয় ২৪ মাইল দূরত্ব। এবং অপরচুনিটি রোভারের ৩ সপ্তাহ আগে মঙ্গলে নামা স্পিরিট পাড়ি দেয় মাত্র ৪.৬ মাইল দূরত্ব।

রোভার গুলোকে অন্য একটি গ্রহে চালনা করা আসলেই কষ্টসাধ্য একটি কাজ। কারণ রোভার গুলো চলার পথ নির্ধারণের জন্য ইঞ্জিনিয়ার নির্দেশনা প্রয়োজন। এতে লেগে যায় অনেক সময়। কারণ প্রতিটি মুভমেন্টের আগেই বিজ্ঞানীদের নতুন তথ্য সংগ্রহ করে, তাকে মূল্যায়ন করতে হয়, তারপরই কেবল মাত্র নতুন নির্দেশনা দিতে পারেন একজন বিজ্ঞানী।

অপরচুনিটি রোভার মঙ্গলে চলার সময় মুখোমুখি হয়েছিলো, শত ধুলোর ঝড়ের। সাধারণ অপরচুনিটি চলতো সোলার শক্তির উপর, এবং ঝড়ের সময় হাইবারনেশনে চলে যায়। সর্বশেষ ২০১৮ এর জুন মাসে যখন বিরাট ঝড়ের সম্মুখীন হয়ে অপরচুনিটি হাইবেরনেশনে যায়, তখনও হয়তো বিজ্ঞানিরা ভেবেছিলো প্রতিবারের মতো এবারো অপরচুনিটি রোভার নতুন আশা নিয়ে ফিরে আসবে।

২০০৫ সালেও এমন একটি ঝড়ের সম্মুখীন হয়ে, অপরচুনির প্রায় সবকটি চাকা ডুবে গিয়েছিলো নরম বালির নিচে। ছয় সপ্তাহ বিভিন্নরকম উদ্দীপনার সাহায্যে রোভারটি মুক্ত হতে পারে সে যাত্রায়। আগেই বলেছিলাম প্রতিটি মুভমেন্ট অত্যন্ত কষ্টসাধ্য এই গ্রহে। এই নরম বালি থেকে নিজেকে বাঁচাতে রোভারটির চাকাকে ঘুরোতে হয়েছিলো প্রায় ৬২৯ ফিট সমপরিমাণে।

রোভারের পাঠানো মঙ্গল গ্রহের প্যানারোমিক ছবি।

২০১৮’র জুনে বিশাল ধুলি ঝড়ে আক্রান্ত হয়ে Oppy (অপরচুনিটি রোভারের আদুরে নাম) হাইবারনেশন পর্যায়ে চলে যায়। ১৮’র আগস্টে নাসার বিজ্ঞানীরা Oppy-কে ৪৫ দিনের সময় বেধে দেন, পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ করতে, এবং রোভারটি তা করতে ব্যর্থ হয়। অক্টবরের মাঝামাঝিতেও নাসা আশা করে, রোভারটি হয়তো যোগাযোগ পুন:স্থাপন করতে সক্ষম হবে। তবে সেটিও ব্যর্থ হওয়ার পর বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত নেন, জানুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত তাঁরা অপেক্ষা করবেন।

তবে ২০১৮ সালের সেই বিশাল ঝড়ে আক্রান্ত হয়ে অপরচুনিটি রোভার আর ফিরে আসে নি। নাসার সাথে শেষবার যোগাযোগে বলেছিলো, ‘আমার ব্যাটারি ফুরিয়ে যাচ্ছে, চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে।’ ধারণা করা হয় এই দৈত্যাকার ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয় রোভারের সোলার প্যানেল, যার ফলে এটি যোগাযোগ রক্ষায় ব্যর্থ হয়।

নাসার বিজ্ঞানীরা প্রায় এক বছর পর্যন্ত আশা করেছিলো সবার প্রিয় এই রোভারটি ফিরে আসবে, তবে ১৩ ফেব্রুয়ারি, প্রায় ৮৩৫ টি রিকভারি কমান্ড অপরচুনিটিকে দেয়ার পরও যখন অপরচুনিটি যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়, তখন নাসা থেকে অফিশিয়ালি ‘অপরচুনিটি রোভারের’ যাত্রা সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।