ছবির রকমারি নামকরণ ও দর্শকের রুচি

এককালে যেকোনো নতুন সিনেমা মুক্তির আগে দেখা যেতো গ্রামে-গঞ্জে, অলিগলিতে, পাড়ায়-পাড়ায় মাইকিং করে প্রচারণা করা হত। বর্তমানে এমন চিত্র অবশ্য সচরাচর দেখা যায়না, তবে যদি খুব বেশি হাইপে থাকা কোনো সিনেমা রিলিজ হয়, অথবা দুই ঈদের সিনেমার ক্ষেত্রে এখনো দেখা যায় এরকম মাইকিং করে সিনেমার প্রচার করতে।

সেসব ক্ষেত্রে অতীতে দর্শকদের আকর্ষণ করার জন্য সিনেমার গান বাজানো হতো, মাঝেমধ্যে সিনেমার দু-একটা পাঞ্চলাইনও শোনানো হতো। রাস্তাঘাটের অলিগলিতে ছোটবড় পোস্টার লাগানো হতো। বর্তমানেও সিনেমার প্রমোশনের জন্য পোস্টার লাগানো হয়, মুক্তির আগে গান রিলিজ দেওয়া হয়, ট্রেইলার রিলিজ দেওয়া হয়, হলগুলোতে বড় বড় আকারের ট্রেইলার দেখানো হয় যেগুলোকে সাধারণত ‘হল ট্রেইলার’ বলা হয়ে থাকে।

তবে একটা সিনেমা সংশ্লিষ্ট এতোকিছু থাকার পরও এগুলোকে এক সাইডে সরিয়ে একজন দর্শক সিনেমা দেখার আগে এক‌টি বিশেষ বিষয়ে সবার আগে নজর দেয়, সেটি হলো ‘সিনেমার টাইটেল’ বা সিনেমার নাম।

আপনি একজন দিনমজুরের কথা চিন্তা করুণ কিংবা একজন উচ্চবিত্তের কথা, কিংবা জীবনযুদ্ধে পরাজিত এক মধ্যবিত্তের কথা –  এদের মধ্যে কারো যদি কোনো সিনেমা সম্পর্কে জানার ইচ্ছা জাগে, সে প্রথমেই খেয়াল করবে এর নাম কি! তারপর সে মনে মনে নিজের মতো করে নাম অনুসারে একটা গল্প তৈরী করে নিবে; সিনেমার নাম যেহেতু এমন, তাহলে সিনেমাটা এমন হতে পারে। এরপর দেখবে এর ট্রেইলার মেকিং কেমন কিংবা গানগুলি কেমন, কেউ কেউ দেখবে ছবিটির পোস্টারগুলি কেমন ইত্যাদি।

তো এক্ষেত্রে বুদ্ধিমান পরিচালকরা এমন এক‌টি নাম বাছাই করে যেটি উচ্চারণে সহজ, শুনতে শ্রুতিমধুর, অতি আকর্ষণীয়, একই সাথে সিনেমার মূল বিষয়বস্তুকে এক শব্দে ব্যাখ্যা করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় মালেক আফসারীর ক্যারিয়ার সেরা ছবি ‘এই ঘর এই সংসার’ এর কথা।

সিনেমার নাম শুনলেই বোঝা যায়, এখানে এক‌টি সংসারের গল্প দেখা যাবে। এক‌টি সংসারের সদস্যদের মধ্যে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না এর সবকিছুই যেমন দেখা যায়, এসিনেমাতেও তেমন কিছুই দেখতে পাওয়া যায়। অথবা কথা বলা যায় আমজাদ হোসেনের ‘ভাত দে’-এর ব্যাপারে। সিনেমাতে আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত কে কেন্দ্র করে করুণ এক কাহিনী দেখতে পাওয়া যায়। পরিচালক চাইলে সিনেমার নাম ‘ভাত’ ও রাখতে পারতেন, কিন্তু দুটোর তুলনা করে দেখেন তো কোন নাম বেশি আকর্ষণীয়, ‘ভাত’ না ‘ভাত দে’!

মাঝেমধ্যে সিনেমার নামের মধ্যে বুদ্ধিকরে কিছু সাসপেন্স লুকিয়ে রাখা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় এ.জে মিন্টুর ‘সত্য মিথ্যা’র কথা। এ নামের সার্থকতা লুকিয়ে আছে গল্পের ভেতরে, যেখানে পরিচালক বুদ্ধিকরে একদিকে সিনেমার মূলবিষয়বস্তুকে এক শব্দে বুঝিয়েছেন (সাসপেন্স ড্রামা/থ্রিলার), অন্যদিকে এমন নাম বাছাই করেছেন যেনো নাম শুনেই দর্শকমনে আগ্রহের তৈরী হয়।

আবার মালেক আফসারীর আরেকটি সেরা ছবি ‘ক্ষতিপূরণ’ এর কথাও বলা যায়। এখানে কার ক্ষতি হয়েছে, কে ক্ষতিপূরণ দিবে, এর সবকিছুর উত্তর পাওয়া যায় সিনেমার শেষ ক্লাইম্যাক্সের আগ মুহুর্তে। তখন বোঝা যায় সিনেমায় নামের সার্থকতা কতটুকু।

মাঝেমধ্যে সিনেমার গল্প এক‌ চরিত্রকেন্দ্রীক হলে চরিত্রের নাম অনুসারেই সিনেমার নাম রাখা হয়। যেমন বলা যায় মাসুদ পারভেজ সোহেল রানার ‘মাসুদ রানা’ এর কথা। সিনেমাটি স্পাই থ্রিলার ঘরানার এবং এক‌ চরিত্রকেন্দ্রিক, তাই এমন নাম রাখা। আমাদের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির যে যুগটি অন্ধকার যুগ বলে বিবেচিত, সেসময় এরকম নাম সবথেকে বেশি দেখা যেতো।

মাঝেমধ্যে সিনেমার গান তৈরির সময় পরিচালক যদি আন্দাজ করতে পারেন এই গানটি জনসম্মুখে আসার পর তুমুল জনপ্রিয়তা পাবে, তখন তিনি সেই গানের আকর্ষণীয় লাইনটি সিনেমার নাম হিসেবে রেখে দেন। সিনেমার গান জনপ্রিয় হলে সিনেমাও জনপ্রিয় হয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘নীল আকাশের নিচে’ এর কথা। কিংবা মতিউর রহমান পানুর ‘মনের মাঝে তুমি’র কথা।

ব্যাসিকালি, একবার সিনেমা হিট হয়ে গেলে ঐ সিনেমার নাম ভালো হলো কিনা খারাপ সেটা কেউ মনে রাখে না। কারণ সিনেমার মূল বিষয়বস্তু হলো এর গল্প। কিন্তু যদি গল্পের সাথে সিনেমার নামের যদি কস্মিনকালেও কোনো মিল খুজেঁ পাওয়া না যায় তখনই দর্শকমনে সিনেমা দেখার পর এক প্রকার অস্বস্তির সৃষ্টি হয়। কারণ যে এক্সপেকটেশন নিয়ে একজন দর্শক সিনেমাহলে ঢুকলো সেটা আর পরিপূর্ণতা পায়না।

সম্প্রতি এবারের ঈদে মুক্তি পাওয়া ‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’ সিনেমার ক্ষেত্রে এমনটা দেখতে পেলাম। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চ-মধ্যবিত্ত – এমন কাউকে এখন অবধি পেলাম না যে সিনেমাটি দেখেছে এবং বলেছে নামটি সবদিক দিয়ে ঠিক আছে। সিনেমা সবমিলিয়ে কেমন চলবে তা নির্ভর করে কনটেন্ট এবং মেকিং এর ওপর, কিন্তু মুক্তির পর সিনেমার্টির ওপেনিং খুব একটা আশা জাগানোর মতো কিছু হয়নি।

এদিক থেকে সিনেমার টাইটেলের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়। পাশাপাশি এটাও বোঝা যায়, সিনেমার নামের গুরুত্ব একদিন থেকে নেই আবার অন্যদিক থেকে আছে। ভালো সিনেমার নাম মানুষের মুখে যুগ যুগ ধরে ঘুরে।

আমরা অনেকেই প্রায় সময় বলি, গত দশকের সেরা ছবি হলো গিয়াসউদ্দিন সেলিমের ‘মনপুরা’। একবার একটু ভাবুন তো, সিনেমার নাম যদি হতো ‘প্রেমিকের জেল প্রেমিকার ফাঁসি’ তখন এ ছবিটাকে সেরা হিসেবে উল্লেখ করতে কেমন শোনাতো?

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।