নাগিনের ছোবল কিংবা বাঘের গর্জন

খেলাটা যখন ক্রিকেট আর একটি দল যখন বাংলাদেশ তখন নাটক না হয়ে পারেনা। নাটকের শেষ অংকে কিংবা মাঝে অতি নাটকীয়তা হয়েই যায়। নিদাহাস ট্রফির অলিখিত সেমি-ফাইনালেও তাই হলো। সুন্দর এক সন্ধ্যায় প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের বাইশ গজে টস জিতে বল করার অধিকার নিতে এতটুকু ভাবতে হয়নি সাকিব আল হাসানকে।

সদ্যই শ্রীলঙ্কায় এসে দলে যুক্ত হয়ে সাকিব বুঝিয়ে দিলেন তিনি অন্য ধাতুতে গড়া। সাকিব আসায় দল উজ্জীবিত হয়েছে, তা টের পেতে সময় লাগেনি। শ্রীলঙ্কার উইকেট তখন টিকটিকির ন্যাজের মতো পড়া শুরু করেছে। সে সময়ে খেই হারাতেও সময় কম লাগেনি। লাগামহীন ডেথ ওভারে রান উঠেছে। আবার ব্যাট হাতে সামলে নিয়েও পথ হারিয়েছিল দল। উত্থান পতনে ভরপুর, বিনোদনের ঝুলি নিয়ে থাকা ম্যাচের প্রায় ৩৯ ওভার ছিল স্নায়ুর ওপর চাপ। তারপর, তারপর কি যে হলো।

শেষ ওভারে দরকার ১২ রান, স্ট্রাইকিং এন্ডে মুস্তাফিজ। প্রথম বলে বাউন্সার, ব্যাট বল লাগলোই না মুস্তাফিজের। দ্বিতীয় বলে এবার আরো বড় বাউন্সার, ফিজের দৌড়ে রান হলো বটে তবে নাটকের শুরু এখানেই। নো ডাকতে গিয়েও ডাকলেন না আম্পায়ার সাহেব। আমাদের অন্য ধাতুতে গড়া কাপ্তান তখন আর চুপ থাকতে পারেননি। যা নাক উঁচু দেশগুলো ভাবতেও পারেনি তাই করে বসলো আমাদের সাকিব। প্রায় কুড়ি বছরেরও বেশি সময় আগে রানাতুঙ্গা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যা করেছিলেন তাই করতে উদ্যত হলেন সাকিব।

আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বয়কট করতে চেয়েছিলেন খেলা, এমন দু:সাহস কয়জন দেখাতে পারবে? আমাদের দলে সাকিব পারে, তামিম পারবে, মাশরাফিও পারতো। আর নতুনরা পারবে। নতুনদের রক্তে সে বীজ বোপিত হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। মাহমুদুল্লাহ, ফিজদের মাঠেই থাকতে পরামর্শ দিয়ে সুজন, ওয়ালশ বাহবা যেমন পাবেন সাকিব বড় কলিজা দেখিয়ে প্রতিবাদ করে তারচেয়েও ঢের অভিনন্দনের দাবী রাখেন।

এতেই হয়তো নড়বড়ে হয়ে পড়লো লঙ্কানরা, ৪-২-৬ তখন সম্ভবপর হয়ে গেল যেন চোখের পলকে। স্ট্রোইট ড্রাইভে মারা ছয় কিংবা ফ্লিক করে মারা শেষ ছয় দুটোই ছিল দেখার মত। মাহমুদুল্লাহ জানান দিলেন সাম্রাজ্যের ভার সাকিবের হাতে সঁপে দিলেও যুদ্ধজয়ের কাজটা তার। এক ম্যাচ আগে করেছিলেন মুশফিক, এবার মাহমুদুল্লাহ। দুজনেই টি-২০ বিশ্বকাপে প্রায় জেতা ম্যাচ হাতছাড়া করেছিলেন ভারতের সাথে। তার জন্যই হয়তো তাদের জন্য এমন করে ম্যাচ জেতা জরুরী ছিল। সেদিন দুজনে মিলে হেরেছিলেন একটি ম্যাচ, তার বদলে দুজনে জিতিয়ে দিলেন আরো দুটো ম্যাচ।

অভিজ্ঞতার যে টি-টোয়েন্টিতেও প্রয়োজন হয় তা এবার ভালো করেই বুঝিয়ে দিল বাংলাদেশের পারফরম্যান্স। তামিম, মুশফিকুর, রিয়াদে ভর করে পাওয়া জয় যতোটা স্বস্তির লিটন, সৌম্য, সাব্বিরে ভর করে হারা ততোটা অস্বস্তির। ম্যাচ জিতলে অপ্রাপ্তিগুলো চাপা পড়ে যায় প্রাপ্তির নিচে। ঠিক যেমনি করে সৌম্য, সাব্বির নিজেদের দুর্বলতা ঢাকা পড়ে গেছে তামিম, রিয়াদের বীরগাঁথায়। জয়ের ধারা বজায় রাখতে চাইলে ফাইন টিউনিং জরুরী, এক ম্যাচের জন্য নয়; আগামী কয়েক বছরের ধারাবাহিকতার জন্য।

ম্যাচ শেষে সিনিয়র, জুনিয়র মিলে বুনো উল্লাস জানান দিলো আমরাও পারি। বড়দের চোখ রাঙাতে পারি, তর্জনী তুলে গর্জন করতে পারি, নাগিন নেচে ছোবল দিতে জানি, আবার জার্সি খুলে উল্লাসও করতে জানি।

লর্ডসের ড্রেসিংরুমে সৌরভ জার্সি খুলে নায়ক বনেছিলেন, তাহলে সাকিব জার্সি খুলে কেন খলনায়ক হবেন? রানাতুঙ্গা নো-বল দেয়ার প্রতিবাদ করে জাতীয় বীর বনেছিলেন, সাকিব নো-বল না দেয়ার প্রতিবাদ করলে কেন বীর হবেন না? সব ‘কেন’ কিন্তুর জবাব মিলতে পারে আরেকটি জয়ে, মুশফিক রিয়াদ করেছে এবার পালা সাকিবের। এবার তিন সিনিয়রের হাত ধরে আসুক প্রথম ত্রিদেশীয় ট্রফির শিরোপা। গর্জে উঠুক বাংলার বাঘ, আরো একবার। কিংবা নাগিনের ছোবলে নীল হোক রোহিত শর্মারা!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।