দক্ষিণী ঐতিহ্যের ধারক: একজন সেলুলয়েড বিজ্ঞানী

মহামতি রজনীকান্ত ও কমল হাসান– পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র যাদের হাত ধরে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে, নাগার্জুনা তাদের অন্যতম। ভারতের ওই অঞ্চলের নায়ক হতে গেলে নাকি অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে ‘পুরুষালি’ গোঁফ লাগে! আর নাগার্জুনার সেটা খুব ভালই আছে। সেই সাথে সুঠাম দেহ ও অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা তো আছেই। ব্যস, আর ঠেকায় কে!

বাবা-মা উভয়েই ফিল্মের লোক হওয়ায় ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি এই অভিনেতাকে। বলা যায়, নাগার্জুনার রক্তেই অভিনয় প্রতিভা মিশে আছে। বাবা ছিলেন ষাট ও সত্তরের দশকের জনপ্রিয় অভিনেতা নাগেশ্বর রাও আক্কিনিনি, মা অভিনেত্রী অন্নাপূর্ণা আক্কিনিনি।

১৯৬৭ সালে ‘সুদিগুন্ডালো’ ছবিতে শিশু শিল্পী হিসেবে অভিষেক হলেও ১৯৮৬ থেকে তাঁকে রুপালি পর্দায় নায়কের ভূমিকায় দেখা যায়। প্রথম ছবি ‘বিক্রম’ রেকর্ড পরিমাণ হিট করে। এ ফিল্ম দিয়েই তিনি দর্শক হৃদয়ে এককভাবে জায়গা করে নেন। কয়েক বছর পর ‘মজনু’ ছবিতে বিয়োগান্ত চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রমাণ করেন যে ‘ট্র্যাজেডি কিং’ হিসেবে পরিচিত বাবা নাগেশ্বরের ইমেজের সাথে তার ইমেজের অনেকাংশে মিল রয়েছে।

একে একে অসংখ্য হিট সিনেমা উপহার দিয়ে তিনি সাউথের ফিল্মে নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অন্যন্য উচ্চতায়। পেয়েছেন অনেক ইতিবাচক সমালোচনা এবং বিভিন্ন ফিল্ম এওয়ার্ডস। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ছবি হলো: রাঘাবেন্দ্র রাওয়ের পরিচালনায় শ্রীদেবীর বিপরীতে ‘আখারি পরাতাম’ (১৯৮৮), রাম গোপাল ভার্মার ‘শিবা’ (১৯৮৯), মণি রত্নমের ‘গীতাঞ্জলী’ (১৯৮৯), প্রিয়দর্শনের ‘নির্নয়ম’ (১৯৯১), রাম গোপাল ভার্মার ‘অ্যান্থম’ (১৯৯২), মুকুল এস আনন্দর ‘খুদা গাওয়াহ’ (১৯৯২) ‘হ্যালো ব্রাদার’ (১৯৯৪), ‘সান্তোসাম’ (২০০২), ‘মানমাধুডু’ (২০০২), ‘পায়ানাম’ (২০১১), ‘মানাম’ (২০১৪), ইত্যাদি।

এসব চলচ্চিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে নাগার্জুনা দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ছয়টি নন্দী পুরস্কার এবং তিনটি ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন।

সিনেমাপাড়ায় একটা কথা খুব প্রচলিত যে, ‘ফিল্মের ভুত যার মাথায় একবার চেপেছে, তার পড়াশোনা চিরতরেই জলে গেছে!’ সালমান খান, অক্ষয় কুমার, দীপিকা পাড়ুকোন, রনবীর কাপুর কিংবা হালের আলিয়া ভাটকেই যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরা যায়। অভিনয়ের জন্য ওরা পড়াশোনায় বেশি দূর এগোতে পারেনি। কিন্তু নাগার্জুনা এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণই ব্যতিক্রম। তিনি শুধু দক্ষ অভিনেতাই নন, বরং প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনাতেও বেশ ভালো। ইস্টার্ন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্র্যাজুয়েশনশন কমপ্লিট করেছেন।

বড় পর্দার পাশাপাশি ছোট পর্দায়ও কোনো অংশে কম যান না নাগার্জুনা। অমিতাভ বচ্চনের ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’র দক্ষিণী সংস্করণ ‘মিলো এভারু কোটিসোয়ারিডু’তে অমিতাভের মতোই সফল উপস্থাপনার ঝলক দেখিয়েছেন তিনি। এখানেই শেষ নয়, তেলেগু ‘বিগ বস’-এরও সঞ্চালক তিনি।

তুখোড় ফিল্ম প্রডিউসারে হিসেবেও নিজের নাম করেছেন এই অভিনেতা। তাঁর বাবার বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান অন্নপূর্ণা স্টুডিওকে পুনরায় চালু করেন তিনি, যা টলিউডে ইদানীংকালের সর্বাপেক্ষা সফল প্রোডাকশনের একটি।

দক্ষিণের এই অভিনেতাকে অনেকে সেলুলয়েড বিজ্ঞানী বলে থাকেন। তিনি তার আশপাশে থাকা প্রতিভা খুঁজে বের করতে পারেন খুব সহজেই। যাঁদের আগে চলচ্চিত্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই, এমন নতুনদেরই তিনি পরিচালনায় বেশি সুযোগ দেন। তবে, নতুনরা কখনো তাঁকে নিরাশ করেননি, যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ রাম গোপাল ভার্মা, গীথা কৃষ্ণ, উপ্পালাপাতি নারায়ণ রাও, প্রাভিন গান্ধী, ভি আর প্রতাপ ইত্যাদি জনপ্রিয় পরিচালক।

নাগার্জুনা সম্ভবত দক্ষিণের সবচেয়ে নিয়মানুগত ব্যক্তিত্ব। তিনি কখনো সন্ধ্যা ছয়টার পর কাজ করেন না। খুব বেশি প্রয়োজনে যদি রাতে শুটিং করতেই হয়, তাহলে অন্তত চার দিন আগে তাকে জানাতে হয়।

১৯৫৬ সালে তামিলনাড়ুর চেন্নাইতে জন্মগ্রহণ করা এই অভিনেতার আসল নাম আক্কিনেনি নাগার্জুনা। তার পরিবার পরবর্তীতে হায়দ্রাবাদে চলে আসায় যেখানে তিনি হায়দ্রাবাদ পাবলিক স্কুল এবং লিটল ফ্লাওয়ার জুনিয়র কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দু’বার বিয়ে করেছেন, এবং দুই সন্তানের জনক।

প্রথমে বিয়ে করেন ডি রামানাইডুর মেয়ে দুগ্গাবতীকে। ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর তিনি ফের বিয়ে করেন তাঁরই সহ–অভিনেত্রী অমলাকে। অভিনেত্রী টাবুর সাথে তাঁর সম্পর্কের ‍গুঞ্জন ছিল। যদিও, বরাবরই নিজেদের স্রেফ ‘ভাল বন্ধু’ বলে জানিয়ে এসেছেন দু’জন।

প্রথম ঘরের ছেলে নাগা চৈতন্যও দক্ষিণের বড় তারকা। বিয়ে করেছেন আমার সুপার স্টার সামান্থাকে। বছর দুয়েক আগে সেই বিয়ের আয়োজন মুগ্ধ হয়ে দেখেছিল গোটা ভারত। অথচ, এখনো চাইলে নিজের ছেলের বড় ভাইয়ের চরিত্রে দিব্যি মানিয়ে যাবেন নাগার্জুনা।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।