নাদিম-শ্রাবণ: এক রাজত্ব, দুই রাজা

৯০-এর দশক ছিলো বলিউড সঙ্গীতের স্বর্ণযুগ। এ সময়েই বলিপাড়ায় রোমান্টিক গানের যাদু ছড়িয়েছেন এই জুটি। তাদের কাজ বাদে নব্বই দশক অপূর্ণ। বলিউডের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল সঙ্গীত পরিচালকদের এই জুটি হলেন নাদিম আক্তার শাইফি এবং শ্রাবণ কুমার রাঠোড়।

ঐ সময়টায় যেন নতুনত্বের খুব দরকার ছিলো। সেই নয়া স্বাদ নিয়ে দর্শকদের মাঝে হাজির হয়েছিলেন তারা। সহজ ছিলো সুরগুলো কিন্তু ছিল অনেক গভীর। আসক্তির মতো শ্রোতাদের মনে তীব্র প্রণয় জাগিয়ে তুলতো।

  • শুরু হল পথচলা

১৯৭৩ সালে একটা অনুষ্ঠানে দুজনের পরিচয় হয়। তারপর প্রথম কাজ ছিলো ৭৫ সালে। একটা ভোজপুরি ফিল্মে। হিন্দী ফিল্মে কাজ শুরু ৮১ সালে। সেখান থেকে ৮৯ অবধি কিছু কাজ করলেও তেমন নাম হচ্ছিলো না। এই সময়টায় অনেক চড়াই-উৎরাই পার করেছেন দুজনে। এক সময় মিউজিক ছেড়ে অন্য ব্যবসা করবেন – তাও ভাবছিলেন। কিন্তু হঠাৎ ৯০ সালে গুলশান কুমার (টি সিরিজের প্রতিষ্ঠাতা) ‘আশিকি’ ছবিতে তাদের সুযোগ দেন। বাকিটা যে স্রেফ ইতিহাস, সেটা আর কে না জানে।

  • খ্যাতির শিখড়ে

‘আশিকি’র পর বিজয়রথ দীর্ঘায়িত হল। ওই স্ট্রাগল পিরিয়ডটায় অনেক সুর তারা তৈরী করে রেখেছিলেন, যার কারণে একের পর এক হিট আ্যালবাম আসছিলো।  এর মধ্যে ‘সাজান’, ‘দিল হ্যায় কি মানতে নেহি’, ‘ফুল অর কাঁটে’, ‘দিওয়ানা’, ‘হাম হ্যায় রাহি পেয়ার কে’, ‘রং’, ‘দিলওয়ালে’, ‘রাজা হিন্দুস্থানী’, ‘পরদেশ’ কিংবা ‘ধাড়কান’-এর কথা না বললেই নয়।

২০০০ অবধি এই অ্যালবামগুলো সেরা ছিলো। ‘পরদেশ’কে অনেক সমালোচক এই জুটির সেরা কাজ বলে মন্তব্য কারেন। কারণ. প্রতিটা গানের ভিন্ন ভিন্ন ধরণ, সুরের কারুকার্য ও তাদের সঙ্গীত গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফল ছিল এই সিনেমার গানগুলো।

প্রখ্যাত সুরকা এস. ডি. বর্মনের সুরে অনুপ্রাণিত ছিলেন তাঁরা। গজল থেকে শুরু করে, ক্ল্যাসিকাল, পপ, ড্যান্স নাম্বার, বিরহ=সব ছোঁয়াই ছিলো কাজে। কিন্তু সব ছাপিয়ে তাঁদের ব্রক্ষাস্ত্র ছিলো রোমান্সে ভরপুর মিষ্টি রোমান্টিক গান।

কুমার শানুর খ্যাতির পিছনে তাঁদের অবদান অনেক। সেই কুমার শানু, উদিত নারায়ণ ও অলকা ইয়াগনিক গেয়েছেন তাদের তৈরী গান। পরের প্রজন্মের অনুরাধা পড়ুয়াল, কবিতা কৃষ্ণমর্তি, সাধনা সরগম, অভিজিৎ, সনু নিগমও অনেক কাজ করেছেন তাঁদের সাথে। গীতিকার হিসেবে বেশীরভাগ তাঁদের সাথে ছিলেন সামির। সম্মানজনক ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছেন চারবার।

  • একটি হত্যা ও ছন্দপতন

এই জুটির দুঃসময়ের ঘন্টা বাজা শুরু হয় ১৯৯৭ সালে। হঠাৎ গুলশান কুমার খুন হন। সেই খুনের একজন আসামী হিসেবে নাদিমের নাম উঠে আসে। আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়াদের জড়িত থাকারও অনুমান করা হয়। তখন আবার নাদিম লন্ডনে অবকাশ যাপন করছিলেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করার জন্য ওয়ারেন্ট জারি হয়। পরে অবশ্য লন্ডন এবং ভারতের আদালতে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। কিন্তু ওয়ারেন্টটা  আর ওঠানো হয়নি। এর কারণেই এখনো তিনি লন্ডন ও দুবাইয়ে নির্বাসনের জীবন কাটাচ্ছেন।

সেই সময় থেকে আজ অবধি অনেক সাক্ষাৎকারেই তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবী করেছেন। বলেছেন তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার। কিন্তু, কখনোই দেশে ফেরেননি। ওয়ারেন্ট বাতিল করতে হলে তো তাকে আগে আদালতে হাজিরা দিতে হবে। সেটাতে কেন এত ভয়? কেঁচো খুড়তে সাপ হয়তো বের হলেও হতে পারে!

গুলশান ‍কুমারের সাথে নাদিম-শ্রাবণ
  • পুনরুত্থান

হঠাৎ করেই ছন্দপতন ঘটেছিল। তারপরও বিদেশের মাটিতে কাজ করা বন্ধ হয়নি। ২০০০-এর পরবর্তী সময়ে ‘কাসুর’, ‘আশিকানা’, ‘রাজ’, ‘দিল হ্যায় তুমহারা’, ‘দিল কা রিশতা’, ‘তুমসা নেহি দেখা’, ‘আন্দাজ’, ‘বারসাত’ ইত্যাদি ভাল কিছু কাজ তারা করেছেন বটে, কিন্তু তাতে অনুপস্থিত ছিল পুরনো সেই ম্যাজিক।

  • চূড়ান্ত বিচ্ছেদ

২০০৫ সালে দু’জন আনুষ্ঠানিক ভাবে আলাদা হয়ে যান। কেন আলাদা হলেন? – এই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি কখনো তাঁরা দেননি। হয়তো, এত দূরে বসে এক সাথে কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন তারা। গুজব আছে, ভাল কাজ করেও দিনের পর দিন পুরস্কার বঞ্চিত হওয়ায় আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। আর নাদিম নিজস্ব কিছু ব্যবসায় ব্যস্ত হয়ে যান।  শ্রাবণের দুই ছেলে সঞ্জীব ও দর্শনও সঙ্গীত পরিচালক, ফলে শ্রাবণ ছেলেদের কাজ ও ফিল্ম প্রোডাকশন নিয়েই বেশি ব্যস্ত।

অমিতাভ-জয়ার সাথে নাদিম

পেশার স্বার্থে আলাদা হলেও দু’জনের সম্পর্ক আজো টিকে আছে। নাদিম শাইফি এক সাক্ষাৎকারে ক’দিন আগে বলেন, ‘শ্রাবণ আমার হারিয়ে যাওয়া ভাইয়ের মতো। আমাদের সম্পর্ক এখনো ভালো আছে, জন্মদিন ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে আমরা যোগাযোগ করি, কুশল বিনিময় হয়।’

২০১৩ সালে সোনা গিয়েছিল তাঁরা ‘দিওয়ানা’ সিকুয়াল নিয়ে ফিরবেন। কিন্তু, আদতে সেটা হয়নি। ২০১৬ সাল থেকে একক ভাবে কাজ করছেন নাদিম। একক ভাবে কাজ করে তাঁর দুটি সিনেমা হল ‘ইশক ফরেভার’ ও ‘এক হাসিনা থি এক দিওয়ানা থা’। এছাড়া ১৯৯১ সালে সঞ্জয় দত্তর সিনেমা ‘সড়ক’এর দ্বিতীয় কিস্তিতেও থাকছেন তিনি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।