নবাব এলএলবি: কেবলই কি সিনেমা?

জলি এলএলবি, পিঙ্ক, সেকশন ৩৭৫ প্রভৃতি সিনেমাগুলো বলিউডের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কতটা ভ্যালু যুক্ত করেছে তা তর্কসাপেক্ষ হলেও বাংলাদেশের সামাজিক কনটেক্সট এ শাকিব খান অভিনীত নবাব LLB সিনেমাটা যে অতি গুরুত্বপূর্ণ সেই বোঝাপড়ার জন্য প্রথমবার একটি মূলধারার বাণিজ্যিক বাংলা সিনেমা বিষয়ে লিখছি।

কেন?  আমি কি সিনেমাটা দেখে মুগ্ধতায় টইটুম্বুর হয়ে উঠেছি? নাকি শাকিব খানকে নিয়ে লিখে জাতে উঠার খুব খায়েশ আমার? একটাও না, দায়িত্ব সহকারে বলছি।

তাহলে? বাংলাদেশে যারা ফিল্ম ক্রিটিক লিখেন বা ফেসবুকে সিনেমার গ্রুপগুলোতে যে ধরনের ও গড়নের আলোচনা হয় তাতে এই সুনির্দিষ্ট সিনেমাটি নিয়ে না লিখলে হয়তবা এমন অনেক বিষয় অলক্ষ্যে রয়ে যাবে যা নজরে আসা উচিত, অথবা অগুরুত্বপূর্ণ এমন অনেক বিষয় নিয়ে কাঁদা ছোড়াছুড়ি চলবে যার প্রভাবে মূল অবজেক্টিভিটি হারিয়ে যাবে।

তাই, নবাব এলএলবির ক্রিটিক লেখাটা বুদ্ধিবৃত্তিক নৈতিকতার জায়গা থেকে জরুরী বোধ করছি।

নবাব এএলবি কেন্দ্রিক আলোচনায় দুটি দৃষ্টিকোণ চরম প্রাসঙ্গিক।

প্রথমত, সামাজিক ইমপ্যাক্ট; দ্বিতীয়ত সিনেমাটিক গ্রাউন্ড।

এর মধ্যে প্রথম দৃষ্টিকোণটা এত বেশি গুরুত্ববাহী যে দ্বিতীয় অংশটা লেখা না লেখায় কিছুই যায়-আসে না।

আপনি যদি একজন অনুসন্ধানী মানসের ব্যক্তি হয়ে থাকেন ১৯৬০-২০২০ এই সময়সীমাকে ১৫ বছরভিত্তিক ৪টি ব্যবধিতে বিভক্ত করুন: ১৯৬০-১৯৭৫, ১৯৭৬-১৯৯০, ১৯৯১-২০০৫, ২০০৬-২০২০; এবার প্রতিটি সময়সীমায় নির্মিত ৪০টি করে বাংলা সিনেমা নিতে পারেন স্যাম্পল হিসেবে। একদমই ভাবনা-চিন্তার প্রয়োজন নেই, স্রেফ নির্মাণ আর মুক্তিসালের ভিত্তিতে ৪০টি হারে সিনেমা প্রতিটি সময়সীমায় বসান।

আপনি আঁৎকে উঠতে বাধ্য যদি কাজটি সত্যিই করেন!

একটি দশক বা সময়ফ্রেমের সংকটগুলো সম্বন্ধে অভিক্ষেপ তৈরি করতে হলে সমকালীন সিনেমার নেগেটিভ চরিত্রগুলোর বৈশিষ্ট্য বা এক্টিভিটি পর্যবেক্ষণ করতে হয়। বাংলাদেশী সিনেমার যে ৪টি সময়সীমা উল্লেখ করলাম প্রতিটিতে ভিলেনদের বৈশিষ্ট্যে ভিন্নতা থাকলেও একটি পয়েন্ট ৬০ বছরেও কনস্ট্যান্ট বা ধ্রুবক: ভিলেন নারীলোলুপ, সে ধর্ষকামী। রাজ, খলিল, এটিএম শামসুজ্জামান, হুমায়ুন ফরিদী, আহমেদ শরীফ, রাজিব, মিজু আহমেদ, নাসির খান, ডিপজল এর পরম্পরাক্রমে সর্বশেষ মিশা সওদাগর পর্যন্ত বাংলা সিনেমায় এমন একজন ভিলেনও পাওয়া যাবে না যার ক্যারিয়ারে ধর্ষণদৃশ্যে অভিনয় নেই।

অবাক লাগে না ব্যাপারটা? এবং ১৯৯১-২০০৫ সময়সীমার সিনেমাগুলো যদি স্যাম্পল হিসেবে নেন, তার ৮০% এর বেশি ক্ষেত্রেই ধর্ষণদৃশ্য পাবেন। নায়ক-নায়িকার বোন-বান্ধবী, ২য় নায়িকা চরিত্রগুলো তৈরিই হতো ধর্ষিত হতে, এবং নায়ক-নায়িকার প্রথম সাক্ষাৎটাই হতো নায়িকাকে ধর্ষণ থেকে বাঁচাতে। সিনেমার অন্তিম পর্যায়ে ভিলেনের আস্তানায় নায়িকা-সহনায়িকা নাচ-গান করতো। এই সময়সীমায় ড্যানিরাজ নামের এক মধ্যমসারির ভিলেনকে পাওয়া যায়, যাকে ৮০% সিনেমাতেই ধর্ষণ আর খুন দৃশ্যে নৈপুণ্য প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার করা হতো। এমনকি এই সীমায় মিশা সওদাগরও ছিল অবিসংবাদি ধর্ষণ কিং।

উল্লিখিত সময়সীমাটা সিরিয়াসলি পর্যালোচনা করলে সামাজিক ভাঙ্গনের মূল টোনটা উপলব্ধি করা যায়। ধর্ষিতা নারীর সামাজিক অবস্থান বা অভ্যন্তরীণ ক্ষরণ নিয়ে একটাও বাংলা সিনেমা নির্মিত হয়েছে কিনা জানা নেই। মুনমুনের রানী কেন ডাকাত, নিষিদ্ধ নারী সিনেমা দুটিকে এই কাতারে ফেলার যৌক্তিকতা কম। কিংবা সিমলার ‘ধর’, পপির ‘বস্তির রানি সুরাইয়া’ সেই চিরাচরিত প্রতিশোধ। ধর্ষিত নারীমাত্রই দস্যুরানী ফুলনদেবী হতে হবে, এই বক্তব্য  বৃহদার্থে সামাজিক কোনো ইমপ্যাক্ট তৈরি করে না। তাছাড়া সেসব সিনেমায় যতটা না ধর্ষিতার মনোজগত দেখানো হয়েছে তার চাইতে রগরগে ধর্ষণদৃশ্য এবং পরবর্তীতে খোলামেলা নাচ-গানের দৃশ্যায়নেই পরিচালকদের আগ্রহ বেশি পরিলক্ষিত। ফলে মোটাদাগে ওই সিনেমাগুলো আবেদন তৈরিতে ব্যর্থ, কারণ মুনমুন-ময়ুরীর সামাজিক পরিচিতি বাংলা সিনেমার অশ্লীল নায়িকা হিসেবে। ‘স্পটডেড’ নামের এক সিনেমায় মূল নায়িকার পতিতা হয়ে উঠাও দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু সিনেমার মূল টোনে ধর্ষণ আর যৌনতাই প্রাধান্য পেয়েছে।

যে কারণে ৪০০+ বাংলা সিনেমা ঘাঁটাঘাটি করেও ধর্ষিতার সামাজিক পারসপেক্টিভ নিয়ে কোনো কমার্শিয়াল সিনেমা মনে করতে পারলাম না। শাবনুরের নিরন্তর সিনেমাকে উদাহরণ বলা যায়, কিন্তু সেখানেও পতিতার অসহায়ত্ব ব্যাপারটাই মূখ্য, যা এক ধরনের স্টেরিওটাইপ। তাছাড়া ওটাও সেই অর্থে কমার্শিয়াল বাংলা সিনেমা ছিল না।

বাংলা সিনেমায় নায়িকা ম্যানেজমেন্ট সংক্রান্ত পলিসি আছে কিছু। যেমন নায়িকা এখানে বিবাহবহির্ভূত যৌনতায় জড়াবে না, যদি জড়ায় চন্দ্র-সূর্য-মাজার প্রভৃতিকে সাক্ষ্মী রেখে বিয়ে করবে। নায়িকার অন্য কারো সঙ্গে বিয়ে হলে কখনোই বাসর হবে না, তারা আলাদা থাকবে। নায়িকার ভার্জিনিটি এখানে অমূল্য সম্পদ এবং দর্শক আকর্ষণের মূল শর্ত। কিন্তু কেন? যৌনতার সামাজিক মনস্তত্ত্ব পর্যালোচনা করলেই উত্তর পাওয়া যাবে।

মূল নায়িকা কখনোই ধর্ষিত হবে না, ধর্ষিত হবে সাইড নায়িকা বা ফিলার ক্যারেক্টার, ধর্ষণ শেষে যে আত্মহত্যা করবে অথবা ভিলেন কর্তৃক খুন। তার আগে কী হবে? ধর্ষিত হওয়া মানে শরীর অপবিত্র হয়ে গেছে, তাকে কেউ স্পর্শ করতে চাইলে সে সরে যাবে এবং বলবে আমাকে ছু্ঁইয়ো না। অর্থাৎ ধর্ষণকে কোনো দুর্ঘটনা হিসেবে না দেখে সেটা নারীর স্খলন দেখানো হচ্ছে, দর্শককে যৌনতাড়িত করতে আইটেম সং য়ের পাশাপাশি ধর্ষণও হয়েছে একটি আইটেমমাত্র।

আর যদি ঘটনাবশত মূল নায়িকা ধর্ষিত হয়েই যায় সে স্বাভাবিক সামাজিক জীবনযাপন ত্যাগ করে ধরে ধরে প্রতিটি ধর্ষককে খুন করবে, এবং আরো কয়েক নারীকে ধর্ষণ থেকে বাঁচাবে। অর্থাৎ মূল নায়িকা ধর্ষিত হওয়া মানে সিনেমাটাই ধর্ষণময়, কারণে-অকারণে শুধু ধর্ষণায়ন চলতেই থাকবে। ‘I Spit on your grave’ নামে একটি রোমহর্ষক সিনেমা আছে যেখানে নায়িকা ধর্ষিত হয়ে পরবর্তীতে ধর্ষকদের লিঙ্গ কর্তন করে দেয়, যদিও এটাও ‘রানী কেন ডাকাত’ বা ‘নিষিদ্ধ নারী’ এর ইংরেজি সংস্করণই।

একজন ধর্ষিতা যে সামাজিক কুসংস্কারকে চ্যালেঞ্জ জানাবে, এবং শুরুর ট্রমাটিক অভিজ্ঞতা/আচরণ (আত্মহত্যা করতে চাওয়া) কাটিয়ে উঠে লড়বে, এবং সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও অটল থাকতে পারে – এই ব্যাপারটা বাংলাদেশী সিনেমায় একেবারেই প্রথম।

এবং সেই সিনেমায় অভিনয় করেছে সমকালীন কমার্শিয়াল সিনেমার সবচাইতে বড়ো সুপারস্টার— এর অন্যরকম একটা ভ্যালু রয়েছে। ধরা যাক, একই থিমে অমিতাভ রেজা বা তৌকির আহমেদ সিনেমা তৈরি করলো। মেকিং, স্টোরিলাইন, স্ক্রিনপ্লে সবই হয়তোবা এর চাইতে ভিন্ন বা উন্নত হতো, কিন্তু বাংলা সিনেমার দর্শকদের বৃহত্তম অংশের দর্শকদের কাছেই সেটি গণ্য হতো সিনেমার নামে নাটক হিসেবে।

পক্ষান্তরে ‘নাম্বার ওয়ান শাকিব খান’ বা ‘কিং খান’ সিনেমা দেখে হাততালি দেয়া দর্শক যখন কালো গাউন পরিহিত শাকিব খানকে কোর্টে দাঁড়াতে দেখবে, এবং বলতে শুনবে ‘একজন পূর্ণ বয়স্ক মেয়ের বিয়ের আগে যৌন অভিজ্ঞতা থাকা মানেই তাকে ধর্ষণ করা যাবে, এমনটা ভাবার কারণ কী’, কিংবা ‘একটা মেয়ে অফিস শেষে রাতে বাড়ি ফিরলেই যদি খারাপ মেয়ে হয়ে যায় তাহলে এদেশের প্রতিটি কর্মজীবী নারীর চারিত্রিক সমস্যা আছে যারা সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে, সংসার চালাতে উপার্জন করছে’- এই কথার ইমপ্যাক্ট আপনি কীভাবে হালকাভাবে দেখবেন? শাকিব খান টিভি অনুষ্ঠানে এসে ১ ঘণ্টা ধরে ধর্ষণবিরোধী বক্তব্য দিক, দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো বিষয়ে কথা বলুক, দর্শক ভুলে যাবে, মনে করবে জ্ঞান দিচ্ছে। কিন্তু সিনেমায় দুই দৃশ্য মিলিয়েও ১ মিনিটের কম স্থায়ী ওই সংলাপগুলো দর্শকদের সরাসরি সংযুক্ত করবে।

কিংবা সে যখন মেয়েদের পিরিয়ড নিয়ে কথা বলে এটা একটা সিগনিফিক্যান্স বহন করে। কিছুটা প্রিভিলেজড গোষ্ঠী হয়তবা শাকিব খানের সিনেমা দেখে না, তার ফিটনেস-এক্টিং স্কিল নিয়ে হাসাহাসি করে, তবে গত ১ যুগ ধরে সে যে বিনোদন জগতের বৃহত্তম সেলিব্রিটি এটা যদি কেউ অগ্রাহ্য করতে চায় তার সামাজিক মিথস্ক্রিয়া সংক্রান্ত বোঝাপড়ায় গ্যাপ রয়েছে।

তাই এই সিনেমায় শাকিব খান ব্যতীত অন্য কোনো নায়ক নিলে তা সর্বব্যাপীতা অর্জন করতে ব্যর্থ হতো নি:সন্দেহে। যে কোনো ধর্ষণের সংবাদ প্রকাশিত হলেই সোস্যাল মিডিয়ায় ২ ধরনের অবস্থান দেখা যায়: ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাক কেন দায়ী নয় এবং যারা দায়ি করে তারা যে গণ্ডমূর্খ সেসব ক্লিশে আলোচনারই চর্বিত চর্বন, অথবা প্রতিটি পুরুষই যে পটেনশিয়াল ধর্ষক অথবা সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় হচ্ছে ঘুরিয়ে-পেচিয়ে সেসব আলাপই বারবার হয়।

অনেক লেখালিখির কারণে ধর্ষক গ্রেফতার হয়, রাস্তায় ২-৫ দিন সমাবেশ হয়, কিন্তু বৃহৎ কমিউনিটির কাছে সেসব পৌঁছায় না। কিন্তু এমন একটা সিনেমা যেখানে প্রধান চরিত্রই ধর্ষিত হয়েছে, সে কোনো সাধারণ মেয়ে নয়, একজন জনপ্রিয় আরজে, অর্থাৎ লাখো ভক্ত থাকা একজন সেলিব্রিটিও ধর্ষিত হতে পারে এবং ক্ষমতাবানদের সামনে একইরকম অসহায়ত্ব-বিপন্নতার মুখোমুখি হতে পারে – সমগ্র ব্যাপারটার মধ্যেই সাধারণ দর্শকের ঢুকে পড়ার উপকরণ রয়েছে। ধর্ষণ ইস্যুতে এই সিনেমাকে আমি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচাইতে সিগনিফিক্যান্ট কন্ট্রিবিউশন গণ্য করি।

এটা পারসেপশন তৈরিতে যেভাবে অবদান রাখার যোগ্য, ১০০ টা সেমিনার বা লেখালিখি সে তুলনায় অনেক পিছিয়ে। তার মানে এই নয়, এর কারণে দেশে ধর্ষণ বন্ধ হবে বা কমে যাবে, কিন্তু চিন্তায় অনগ্রসর গোষ্ঠীদের একটি অংশ একবারের জন্য হলেও বোধ করবে মেয়েদের সম্মান করা উচিত, ছেলেদের সঙ্গে হেসে কথা বললেই সেই মেয়েটা খারাপ চরিত্রের নয়।

একারণে নবাব এলএলবি সিনেমার চাইতে সোস্যাল ডকুমেন্টারি অনেকখানি বেশি। এটি নিয়ে আরো হাইপ উঠা উচিত, এবং সেই হাইপকে আমি সর্বোতভাবে সমর্থন করি।

এবার ফিল্মিয় দৃষ্টিকোণে বিশ্লেষণ করা যাক।

কোর্টরুম ড্রামা বলিউডে যথেষ্ট প্রচলিত হলেও বাংলাদেশে এই ঘরানা পরিচিতি পায়নি এখনো। এখানকার প্রায় সকল কমার্শিয়াল সিনেমাতেই পুলিশ স্টেশন আর কোর্ট থাকলেও সেখানকার কার্যক্রম খুবই সীমিত।

নবাব এলএলবি-এর মূখ্য চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিচালক ভারতের তিনটি সিনেমা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। শাকিব খান= অক্ষয় কুমার+ অমিতাভ বচ্চন (জলি এলএলবি ২, পিঙ্ক), স্পর্শিয়া= তাপসী পানু (পিঙ্ক), শহীদুজ্জামান সেলিম= বোমান ইরানী+ অক্ষয় খান্না (জলি এলএলবি ২, সেকশন ৩৭৫), শবনম পারভীন= সৌরভ শুক্লা (জলি এলএলবি)। তার মানে কি নবাব এলএলবি নকল?

চরিত্রের মধ্যে সাদৃশ্য থাকলেই তাকে নকল বলা যায় কিনা এই আলোচনার পূর্বে প্রশ্ন করা উচিত বাংলা সিনেমার মধ্যে কয়টা নিজস্ব কাহিনী? রাজ্জাকের পূর্বে নায়করাজ উপাধি বসিয়েছেন; তার নায়ককালীন জনপ্রিয় ১৫টা সিনেমা নিন স্যাম্পল নিন, সেখানে আটটার বেশি পাবেন উত্তম কুমার এবং সমসাময়িক সিনেমার হুবুহু কপি। সালমান শাহকে ঘিরে যেসব মিথ তার মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম সিনেমাটাই তো আমির খান এর সিন টু সিন কপি।

বাংলাদেশী কমার্শিয়াল সিনেমা আজীবনই ধার করা গল্পে চলাচল করেছে, বরং মেকিং বা এক্সিকিউশন কেমন হচ্ছে সেটাই গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

সেদিক থেকে বিচার করলে উল্লিখিত তিনটা সিনেমার কোনোটার সঙ্গেই নবাব এলএলবি’র সরাসরি সাদৃশ্য নেই। জলি এলএলবি এর প্রথম অংশে অক্ষয় কুমার হতাশ এবং এলোমেলো থাকে, এখানে শাকিব খানও তাই। এটুকু বাদ দিলে দুই এলএলবি এর মিশন সম্পূর্ণ আলাদা।

পিংক সিনেমায় তাপসী পানু একজন স্বাধীনচেতা নারী থাকে, যাকে আরো ২ বান্ধবী সহ ৩ ধনীর দুলাল ধর্ষণ চেষ্টা চালায়, কিন্তু সফল হয় না ধর্ষণে। অমিতাভ বচ্চন জেরার এক পর্যায়ে তাকে জিজ্ঞেস করে- ‘Are you virgin’? সে যখন জানায় বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে যৌনতার পূর্বাভিজ্ঞতা রয়েছে, তার প্রশ্ন ছিল- ‘Did he pay you’? এই গল্প থেকে স্পর্শিয়ার চরিত্রের একটি অংশ অ্যাডাপ্ট করা হয়েছে, বিশেষত তার ভার্জিনিটি হারানো অংশটা। এর বাইরে পিংক এর পানু এবং এখানকার স্পর্শিয়া সম্পূর্ণ আলাদা ব্যক্তিত্ব। তাদের জীবনের স্ট্রাগল, সাকসেস সবকিছুই আলাদা।

এখানে স্পর্শিয়া নিজের বিয়ের কার্ড নিজেই বিলি করে, বোন আর মাকে দেখাশোনা করে (যদিও ২০২০ এর মানদণ্ডে একজন মেয়ে নিজের বিয়ের কার্ড দেয়াটাকে ব্যতিক্রমী বলা যায় না কোনোক্রমেই। গত এক দশক বা তারও বেশি সময় আগে থেকেই মেয়েদের সামাজিক কর্মযজ্ঞ ধারণায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। প্রমীলা ফুটবল বা ক্রিকেটের পাশে বিয়ের কার্ড বিতরণ নিতান্তই সাধারণ আচার, তবে সিনেমার টার্গেট মার্কেট অনুসারে এটা হয়তোবা মানানসই। তবু গার্মেন্টস এ নারীশ্রমিকের বিকাশ দেখেও টার্গেট মার্কেটে এটা খুব বড়ো বার্তা হওয়ার সুযোগ কম। এই সেট আপটা একটু বেখাপ্পা হয়ে গেল)।

অন্যদিকে সেকশন ৩৭৫ পুরোপুরি কাউন্টার ন্যারেটিভ নির্ভর স্টোরিলাইন। ধর্ষণ আইনের অপব্যবহার করে নারীরা চাইলে যে প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করতে পারে, এই আইনের সংশোধন পরিবর্তন প্রয়োজন—সেই বার্তাটিই দেয়া হয়েছে এই সিনেমায়। তবু আলোচনায় এই সিনেমার রেফারেন্স এসেছে সম্ভবত ধর্ষণ মামলা করাকালীন পুলিশী অভিজ্ঞতা দৃশ্যায়নে সাদৃশ্যের ভিত্তিতে।

তবে তামিল বা তেলুগু কোনো সিনেমার কাহিনী অনুকরণ কিনা বলতে পারবো না, কারণ দেখা হয়নি। অনলাইনে নবাব এলএলবি এর সমালোচনায় উল্লিখিত সিনেমা ৩টির প্রসঙ্গ বেশি আসায় ওগুলোর আলোকেই বললাম নকলহীনতার বিষয়টি। গল্পটি একান্তই দেশীয় পরিমণ্ডলের; স্পর্শিয়াকে কখনোই মনে হয়নি দক্ষিণ ভারতের কোনো মেয়ে হয়ে কথা বলছে। অ্যাডাপ্টেশন যদি হয়েও থাকে তার লোকালাইজেশন বা স্থানীয়করণ অতি উৎকৃষ্ট হয়েছে এক্ষেত্রে।

সিনেমার স্টোরিলাইনকেন্দ্রিক মূল ভঙ্গুরতা আদতে শাকিব খানের চরিত্র নির্মাণে। সিনেমার মূল চরিত্র স্পর্শিয়া; তাকে কয়জনে চেনে? শাকিবকে ছাপিয়েও সে মূখ্যচরিত্র, একটি নায়িকা ডমিন্যান্ট সিনেমায় অভিনয় করবে সমকালীন সবচেয়ে বড়ো সুপারস্টার, এবং সেই নায়িকাও নবীন একজন আর্টিস্ট – এটা সুপারস্টারের ইমেজের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

যে কারণে তার চরিত্রের ব্যাপ্তি বাড়াতে জলি এলএলবি এর অক্ষয়ের প্রথমাংশ অনুসরণ করতে হয়েছে, ব্ল্যাক কমেডির চিত্রায়ণে প্রচুর সময় গেছে; এতে গল্প ঝুলে পড়লেও শাকিব ভক্তদের টাকাতেই যেহেতু সিনেমার লাভ-ক্ষতি নির্ধারতি হবে, ওটুকু কম্প্রোমাইজ করতেই হবে আসলে।

পরের অংশে পিংক এর অমিতাভ বচ্চনকে দরকার পড়েছে। কিন্তু অমিতাভ তো ৭৮ বছরের প্রৌঢ়, কমার্শিয়াল সিনেমার ১ নম্বর নায়ককে তার আদলে ডেভেলপ করা যায় না। তার জন্য আইটেম সং লাগবে, সাধারণ গান থাকতে হবে – সুতরাং তার একজন নায়িকা চাই। শুধুমাত্র সেই কমার্শিয়াল ডিমান্ড থেকে মাহিয়া মাহীকে অন্তর্ভুক্ত করা। নইলে ক্রিটিকাল পয়েন্ট অব ভিউ থেকে, মাহিয়া মাহি এই সিনেমার কমার্শিয়াল ম্যাটেরিয়ালের বাইরে কিছু নয়; নইলে শাকিব খানের চাইতে স্পর্শিয়া প্রধান চরিত্র হয়ে উঠতো আরো বেশিসংখ্যক দর্শকের কাছে।

জলি এলএলবি এর বিচারক চরিত্রে সৌরভ শুক্লা যেমন কমিকাল রিলিফ দিয়েছে, এখানে সৌরভের নারী সংস্করণ হয়ে উঠেছে শবনম পারভীন। দুটো চরিত্রই সিম্বলিক।

বাংলা সিনেমায় ধর্ষণ রসায়নেও কিছু অলিখিত নিয়মের চর্চা হয়। যেমন ভিলেন কখনো পরিবারের কাউকে ধর্ষণ করে না, সম্পত্তির লোভে বড়ো ভাই বা ছোট ভাইয়ের স্ত্রীকে হত্যা করবে, ধর্ষণ নয়। ২-১টা সিনেমায় দেবর ভাবীকে ধর্ষণের চেষ্টা করলেও সামগ্রীক প্রবণতা কম। শ্বশুর বা ভাসুর কর্তৃক ধর্ষণের ঘটনাগুলো আসে না, আর ইনসেস্ট সম্ভবত সেন্সর বোর্ড কর্তৃকই নিষিদ্ধ। সম্ভবত পারিবারিক মূল্যবোধ এবং দেশিয় সামাজিক অনুশাসন রক্ষার একটি দায় থাকে।

এখানে প্রথমবারের মতো স্বামীর বড়ো ভাই কর্তৃক নিয়মিত ধর্ষণের ব্যাপারটিও স্থান পেয়েছে, এবং ধর্ষকের আপনজন ধর্ষিত হলে তার প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে সেই ব্যাপারটিও সামনে এসেছে। সাক্ষ্য প্রমাণ দিয়ে ধর্ষককে কোর্ট শাস্তি দিত কিনা সেই সিদ্ধান্তের পূর্বেই শ্রদ্ধার-ভালোবাসার বড়ো ভাই নিজের স্ত্রীকে ধর্ষণ করেছে, এটা যে কীরকম প্রচণ্ড ইমোশনাল বার্স্ট আউট ঘটায়, দেশি সিনেমায় এটি সম্ভবত সর্বপ্রথম দেখানো হলো।  বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এটাই যথেষ্ট সাহসী কাজ।

কোর্ট ড্রামাগুলোতে শেষে কী হয় তা দর্শক সিনেমা দেখার পূর্বেই জানে, তবু দেখার সময় প্রতিটি মুহূর্তে সে অপেক্ষায় থাকে কখন ভিক্টিমের চূড়ান্ত বিজয় আসবে। এখানেও সেরকমটাই ঘটেছে।

তবে, কোর্ট ড্রামার মূল অংশ যে যুক্তি পাল্টা যুক্তির লড়াই,এই সিনেমায় সেটা খুব প্রকটভাবে মিসিং; এই অংশটাতে পরিচালক আরেকটু মনোযোগ দিতে পারতেন। কমেডিতে ফুটেজ কিছুটা কমিয়ে উকিলের আরো কিছু তেলেসমাতি আনা যেত, তাতে টার্গেট মার্কেট আরেকটু হিরোয়িক ফ্লেভার পেতে পারতো।

নেওয়াজ বাশার চরিত্রের অভিনেতাকে ইতোপূর্বে বাংলা নাটকে দেখেছি, সাধারণত রাজশাহী-চাপাইগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলাটাই তার সিগনেচার ছিল এতোদিন। এখানে নিজেকে যেভাবে উপস্থাপন করেছে, মাদকাসক্ত এবং লম্পট বিত্তশালী হিসেবে অপরূপ মানিয়ে গেছে।

শহীদুজ্জামান সেলিমের চরিত্রটা যেভাবে বর্ণিত সেই অনুসারে তার বুদ্ধির খেল বা দুষ্ট পরিকল্পনা খুবই কম। এই চরিত্রটির নির্মাণত্রুটি গুরুতর। সে এন্টিহিরো, ভিলেন নয়, বৈষয়িক তবে অমানবিক নয়। এরকম জটিল মনস্তত্ত্বের চরিত্রের যে ব্যাপ্তি-গভীরতা দাবি করে, পরিচালক তা ধরতে পেরেছেন, অন্তত আমার মনে হয়নি।

স্পর্শিয়ার ফিয়্যান্সে হিসেবে আশিষ চরিত্রে রূপদানকারী অভিনেতার আচরণ-বিচরণ মানানসই। স্পর্শিয়ার চরিত্রটাও আদতে পরিপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠতে পারেনি। এরকম একজন জনপ্রিয় আরজে এর ধর্ষণপূর্ব জীবনের কিছু ফুটেজ থাকা উচিত ছিল।

তবে, স্টার কাস্ট করলে পরিচালকদের আসলে অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা মেনেই কাজ করতে হয়। সিনেমার বাজেটের অর্ধেক বা কাছাকাছি খরচ হয়েছে যে সুপারস্টারকে কাস্ট করতে তার জন্য সর্বোচ্চ ফুটেজ না রেখে উপায় থাকে না। যেজন্য কমেডি সঙ্গী হিসেবে দুই সাগরেদ, বাড়িওয়ালার চরিত্রগুলো অন্তত ১০-১২ মিনিট অতিরিক্ত সময় নিয়ে ফেলেছে, যা স্টোরিটেলিংয়ের মান বিঘ্নিত করেছে।

বাড়তি ফুটেজ নীতিতে অবশ্যই একমত। তবে এই যে অতিরিক্ত ১৫ মিনিট এটা কোর্টরুম অংশেই দেয়া যেত, সেখানে শাকিব খানের আরো কিছু বুদ্ধিদীপ্ততা আসতে পারতো, সেলিমের সঙ্গে ভিন্ন কোনো পয়েন্ট থেকে কনফ্লিক্ট বাঁধতে পারতো। পরিচালক সম্ভবত সেই পরিশ্রমটা করতে চাননি। পড়াশোনায় অনাগ্রহ তো এদেশের যে কোনো সেক্টরেই প্রধানতম সমস্যা।

তবে, ক্রিটিকের সময় এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে, এফডিসি প্রোডাক্টের ঐতিহ্যগত গুণগত মান কেমন হয়ে থাকে। শেষাংশে যে নেওয়াজ বাশার মাহিয়া মাহিকে কোর্ট থেকে তুলে নিয়ে আটকে রাখেনি, এবং শাকিব খান গোলাগুলি করেনি এটাই তো বিরাট পরিবর্তন।

স্পর্শিয়ার বাচনভঙ্গি দুর্দান্ত মিলে গেছে চরিত্রের সঙ্গে। আরজে বা টিভি অনুষ্ঠানের সঞ্চালকদের বাচনভঙ্গির সঙ্গে তুলনা করলেই স্পষ্ট হয়। তবে তার ভোকাল টোনের সঙ্গে আমি জয়া আহসানের ভোকালের মিল পেয়েছি। অন্যান্য সিনেমায় এই মিল থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে তার জন্য উপকার হতে পারে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেছি আজিমুল বাশার নামার ক্যামিও চরিত্রে অভিনয়কারীকে। চালচলন-ভাবভঙ্গী এত বেশি ন্যাচারাল, মনে হয়েছে আশপাশে এরকম মানুষ তো প্রতিনিয়তই দেখি। নেওয়াজ বাশারের স্ত্রীর চরিত্রের ব্যাপ্তি ছোট হলেও সে যে শেষ পর্যন্ত খুবই গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করবে, উপমহাদেশীয় সিনেমা দেখার অভ্যস্ততা সম্পন্ন যে কোনো দর্শকই হয়তো সেটা আঁচ করতে পারবেন শুরুতে; তবে তাকে দিয়ে সামাজিক পরিমণ্ডলে ভীষণ অনুল্লেখিত এক আঁধারকে আলোতে আনা হবে এটা বোধহয় ভাবার ক্ষেত্রে কঠিন ছিল।

সিনেমার পছন্দনীয় অংশ বললে অন্তিম অংশের র‌্যাপ গানটা। লিরিক আর গায়কীটা চমৎকার ছিল, পরিচালক একে সিনেমার মাঝে ক্লাইম্যাক্স অংশে ব্যবহার করলে উপযোগিতা বাড়তো।

সর্বশেষ সিনেমার মার্কেটিং পলিসি বিষয়ে বলি। ২ অংশে মুক্তি দেয়ার আইডিয়াটা ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেছি আমি। নইলে এতদিনে টরেন্টে এই সিনেমার পাইরেটেড লিংক নিশ্চিতভাবেই সহজলভ্য হয়ে যেত। এদেশের মানুষ গড়ে মূল্যবোধ সূচকে যে তলানীতে অবস্থান করে, তারা এটাই ডিজার্ভ করে। একটা সিনেমা কোটি টাকার বিনিয়োগ। প্রযোজকের লোকসান করার এখতিয়ার আপনার থাকতে পারে না। পরিচালক আর অভিনেতার গ্রেফতার হওয়া ব্যাপারটা মার্কেটিং গিমিক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। হলেও কিছু না, না হলেও তা সিনেমার মূল কনটেন্ট ফ্যাক্টরে প্রভাব রাখে না।

আমি কেন দেখেছিলাম এই সিনেমা? সুনির্দিষ্ট কারণ নেই। বহু আজগুবি কাজেই সময় খরচ করি যেগুলো স্বাভাবিক দৃষ্টিতে অপচয় গণ্য হয়। আমি মানুষ বুঝতে চাই। যেহেতু ভৌগলিক বাংলাদেশের সীমারেখায় শারীরিকভাবে বন্দি হয়ে পড়েছি, এখানকার বিভিন্ন ক্লাস্টারের মানুষের রুচি আর সামাজিক মনস্তত্ত্ব বোঝার অভিপ্রায়ে আপাত লেইম মনে হওয়া কাজগুলোতে ডুবে গিয়েও ভেসে উঠি।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।