হাবিব ওয়াহিদ: কিং অব ফিউশন

২০০৫ সাল, নবীন সংগীত পরিচালক হিসেবে তিনি বেশ আলোচিত, লোক গানের সাথে আধুনিক সংগীতের মিশ্রন ঘটিয়ে দারুন এক ধারা তৈরি করেছেন। প্রথম দুই অ্যালব্যামের সাফল্যের পর প্রকাশিত হলো বছরের অন্যতম ব্যবসাসফল অ্যালব্যাম ‘ময়না গো’। টেকনো আর ফোক মিউজিকের এমন ফিউশন বাংলাদেশিরা এর আগে কখনোই শোনেনি। তখন থেকে তাঁর নামের সাথে যোগ হয়ে গেল ‘কিং অব ফিউশন’ তকমা।

এই অ্যালব্যামেই সংগীত পরিচালক থেকে আবির্ভূত হলেন গায়ক রুপে, কণ্ঠে ধারণ করলেন ‘দিন গেলো তোমারো পথ চাহিয়া’ – এ যেন এক অন্য আবেদন। গায়ক হিসেবেও তিনি নিজেকে সুপরিচিত করলেন। এর ঠিক পরের বছর, বাংলা চলচ্চিত্রের গানের অবস্থা প্রায় ভগ্নদশা। এমন সময় কণ্ঠ দিলেন চলচ্চিত্রের গানে।

প্রথম গানেই বাজিমাৎ, বাংলা চলচ্চিত্রের গান আবার পৌঁছলো গুনগুন করে গাওয়া গ্রাম্য কিশোরের মুখ থেকে ব্যস্তময় শহরের কোনো এক দীর্ঘ ট্রাফিক জ্যামে। গানের নাম ‘ভালোবাসবো বাসবো রে’। সংগীত জগতে তিনি হয়ে ওঠেন অনন্য, তিনি আর কেউ নন, সংগীত পরিচালক থেকে গায়ক রুপে নিজেকে প্রতিষ্টিত করা জনপ্রিয় কন্ঠ তারকা ‘হাবিব ওয়াহিদ’।

বাবা বাংলা পপ গানের ধারক কিংবদন্তি ফেরদৌস ওয়াহিদ, ছোটবেলা থেকেই পেয়েছেন সংগীতের আবহ। লন্ডনের স্কুল অব অডিও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করতে গিয়েছিলেন, সেখানেই পরিচয় ঘটে প্রবাসী গায়ক কায়ার সাথে। সুর আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন, খুঁজছিলেন একজন গায়ককে।

কায়াকে পেয়ে শুরু করে দিলেন অ্যালব্যামের কাজ। লোকগানের সাথে পাশ্চ্যতের আধুনিক সুরের মিশ্রণ ঘটিয়ে গানগুলো লন্ডনে বেশ জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তীতে ‘কৃষ্ণ’ শিরোনামে বাংলাদেশে মুক্তি পায়। নতুন ধারার সাথে পরিচিত হয়ে দর্শকরাও লুফে নিলো, ব্যাপক সাড়া জাগায় অ্যালব্যামটি। এর ঠিক পরের বছর একই ধারার ‘মায়া’ অ্যালব্যামটি ব্যাপক সাড়া পায়।

‘ময়না গো’ অ্যালব্যামে বাবা ফেরদৌস ওয়াহিদকে দিয়ে গান করান, নিজেও গায়ক হিসেবে আবির্ভূত হন। ২০০৬ সালে প্রথম একক অ্যালব্যাম ‘শোনো’ বের হয়। এরপর বলছি তোমাকে, আহবান, স্বাধীনসহ একাধিক একক অ্যালব্যাম বের হয়।

বেশকিছু জনপ্রিয় মিক্সড অ্যালব্যামেও কাজ করেন। এছাড়া ‘পাঞ্জাবীওয়ালা’ সহ একাধিক অ্যালব্যামে সুরকারের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া গত দুই বছর ধরে কিছু একক গান ও বের করছেন, এর মধ্যে হারিয়ে ফেলা ভালোবাসা, মন ঘুমায় রে, ঘুম অন্যতম। উনি সাধারনত নিজের সুরেই গান করেন, পাশাপাশি অন্য কন্ঠশিল্পীদের গানেও সুর সৃষ্টি করেন। বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপের থিম সং করেছেন।

চলচ্চিত্রে প্রথম প্লেব্যাক করেন ২০০৬ সালে, ‘হৃদয়ের কথা’ সিনেমায় ‘ভালোবাসবো বাসবো রে’ গান দিয়ে। প্রথম গানেই অভূতপূর্ব সাড়া পাবার পর চলচ্চিত্রের গানে নিয়মিত হন। ‘আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা’, ‘চন্দ্রগ্রহণ’ – এই দুই চলচ্চিত্রে ‘পৃথিবীর যত সুখ’, ‘তোমারে দেখিলো পরান ভরিয়া’ গানগুলো বেশ জনপ্রিয়তার পর ‘আমার আছে জল’-এর চলো বৃষ্টিতে ভিজি, ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ সিনেমার দ্বিধা গানের মত দারুণ জনপ্রিয় গান।

প্রথম বারের মত পুরো ছবির সংগীত পরিচালনা করেন ‘এইতো প্রেম’ সিনেমার, সব গুলো গানই বেশ জনপ্রিয়তা পায়। এরপর বছরের সবচেয়ে সফল ‘প্রজাপতি’ সিনেমার অ্যালব্যামেও সংগীত পরিচালনা করেন। এছাড়া ওনার নিজের কণ্ঠে জনপ্রিয় গান গুলোর মধ্যে ভালোবাসা দেও ভালোবাসা নেও, এতদিন কোথায় ছিলে, মনের দুয়ার খুলে দিলাম, বেপরোয়া মনসহ আরো বেশকিছু জনপ্রিয় গান। এখনো চলচ্চিত্রের গানের সাথে সম্পৃক্ত আছেন, যদিও একটু অনিয়মিত। কলকাতার সিনেমার গানেও কাজ করেছেন, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলেও তিনি আলোচিত নাম।

বর্নিল ক্যারিয়ারে সংগীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন, গায়কীর জন্য মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার পেয়েছেন সর্বোচ্চ পাঁচবার, এছাড়া আরো বহু পুরস্কার পেয়েছেন। ন্যান্সি, নির্ঝর, জুলি, শিরিন, আরেফিন রুমিসহ বেশ কয়েকজন কন্ঠশিল্পীকে গানের জগতে পরিচয় করিয়ে দেন তিনিই।

হাবিবের জন্ম ১৯৭৯ সালের ১৫ অক্টোবর। সঙ্গীত জগতে নিজেকে বর্ণিল করলেও, ব্যক্তিজীবনে তিনি সমুজ্জ্বল হতে পারেননি। দু’টি বিয়ে করেছেন। দু’টিই রুপ নিয়েছে বিচ্ছেদে, রয়েছে একটি পুত্র সন্তান। জনপ্রিয় মডেল মোনালিসার সঙ্গে এক সময় সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন, আবার গুজব উঠেছিল তানজীন তিশার সঙ্গেও সম্পর্ক রয়েছে তাঁর।

একটা সময়ে যেমন একের পর এক জনপ্রিয় গানের জন্ম দিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই বিবেচনায় এখন অনেকটাই যেন হারিয়ে গেছেন হাবিব। তেমন জনপ্রিয় কোনো গান সাম্প্রতিক সময়ে তার নেই বললেই চলে। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাতেও পড়েছে ভাঁটা। ব্যক্তিগত জীবন ও কর্মজীবনে একদিন নিশ্চয়ই নিজেকে থিঁতু করবেন, এই আশা রাখি।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।