অধিনায়কের মিউজিক্যাল চেয়ার, তামিম ও বাংলাদেশ ক্রিকেট

নিয়মিত অধিনায়ক ইনজুরিতে। সহ অধিনায়ক ছুটিতে। এ অবস্থায় দলের অধিনায়ক খুঁজে বের করা একটু মুশকিলই বটে। তবে সে মুশকিলের আসান করা কি খুব বেশি কঠিন? না।

এক্ষেত্রে আপনি দলের টেস্ট অধিনায়কের দিকে ঝুকতে পারেন যদি তিনি ওয়ানডে দলের নিয়মিত সদস্য হয়ে থাকেন। সেখানেও বিপত্তি। টেস্টের অধিনায়ক যে ছুটিতে থাকা সাকিব আল হাসান। তখন টেস্টের সহ অধিনায়কের দিকে ঝুকতে পারেন যদি তিনি ওয়ানডে দলের নিয়মিত সদস্য হয়ে থাকেন। তিনি মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ এবং তিনি অ্যাভেইলেবল।

গেল দেড় বছর একাধিকবারের ইনজুরিতে সাকিবের অনুপস্থিতিতে টেস্ট দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। এমনকি টি-টোয়েন্টির আসর নিদাহাস ট্রফিতেও প্রথম কয়েকটি ম্যাচের দায়িত্বে থাকেন তিনি। ইতোমধ্যে ঘরোয়া বিপিএলেও তার অধিনায়কত্ব বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। কিন্তু তাকে উপেক্ষা করা হলো। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মাশরাফির ইনজুরিতে ভারপ্রাপ্ত ওয়ানডে অধিনায়কের আসনে এখন তামিম ইকবাল।

সময়টা খুব খারাপ যাচ্ছে তামিমের। বিশ্বকাপে আশানুরূপ পারফরম্যান্স করতে পারেননি। তাই দেশে ফিরেই ব্যাট হাতে নেটে নেমে গিয়েছিলেন সবার আগে। সম্পূর্ণ মনযোগ শুধু ব্যাটিংয়ে। ঠিক এসময়ই বাড়তি দায়িত্ব জুটলো কাধে। তাও কিনা দলকে নেতৃত্ব দেয়ার মত গুরুদায়িত্ব। বড্ড ভুল সময়েই জুটলো বোধহয়। এমনিতে পারফর্ম করতে না পারার চাপ তার ওপর সদ্য বিশ্বকাপে আট নাম্বারে থেকে শেষ করা দলকে দ্রুত জয়ের রাস্তায় ফেরানোর মাধ্যমে বুস্ট আপ করার কঠিন চ্যালেঞ্জ।

তাও আবার দলের দু’জন ‘কোর’ ক্রিকেটার ছাড়া যাদের মধ্যে একজন কিনা সবশেষ বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা পারফর্মার। সেইসাথে দলের সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে না দু’জন নিয়মিত সদস্য লিটন, সাইফউদ্দিনকেও। এমন একটা সময়ে তামিমকে এত বড় দায়িত্ব দেয়া থেকে সহজেই বিরত থাকতে পারত বোর্ড। বাড়তি কোন দায়িত্ব না দিয়ে শুধু ব্যাটিংয়ে মনোযোগী হয়ে নিজের পড়তি ফর্মটাকে বাগিয়ে আনার সুযোগ দেয়া যেত।

এমন না যে তামিম ছাড়া অধিনায়কত্ব করার মত নির্ভরযোগ্য আর কেউ নেই। সাবেক অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম আছেন এ দলে। হ্যাঁ, তার অধিনায়কত্বে অসন্তুষ্ট হয়ে আপনি তাকে দায়িত্ব থেকে একবার অব্যাহতি দেয়ার পর আবার সে আসনে ফিরিয়ে না-ই আনতে পারেন। কিন্তু রিয়াদকে তো বিবেচনা করা যেত যিনি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বেশ কয়েকটি ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটেও যার নেতৃত্বগুণ দৃষ্টি কেড়েছে অনেকের। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো তিনি আপনার ভবিষ্যৎ টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক। তাকে উপেক্ষা করে এমন একজনের ওপর দলের দায়িত্ব দেয়াটা দৃষ্টিকটুই ঠেকলো যিনি কিনা নিজেই এখন নিজের ছায়া।

আর অধিনায়ক হিসেবে তামিম কতটা চাপ নিতে পারেন সেটাও একটা প্রশ্ন। বিশ্বকাপে ধারাবাহিক না হতে পারায় দর্শক মহলের সৃষ্ট চাপও তার খেলায় প্রভাব ফেলেছে। এমনকি প্রথম কয়েকটা ম্যাচ খারাপ করায় অতীত দু:স্মৃতি স্মরণ করে তিনি নিজের ওপর চাপ বাড়িয়েছেন। তাছাড়া সবশেষ বিপিএলে চাপমুক্ত থাকার জন্য কুমিল্লার অধিনায়কত্বের প্রস্তাব নাকোচ করে দিয়েছিলেন তিনি। তাই সবমিলিয়ে এবার একটা গোজামিলের দল নিয়ে ভালো করার চ্যালেঞ্জটা তার জন্য পাহাড়সমই যেহেতু নিজের ফর্মটা একটা বড় চিন্তার জায়গা।

তাছাড়া তামিম কি ভবিষ্যৎ অধিনায়ক হিসেবে বোর্ডের ভাবনায় আছেন? একদমই না বলতে গেলে। ২০১৪ সালে টি-টোয়েন্টি দলের সহ অধিনায়কত্বের পদ থেকে রিয়াদ সরে দাঁড়ালে সেখানে তামিমকে দায়িত্ব দেয়া হয়। ঠিক ওই সময় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজে চোটের কারণে খেলতে পারেননি অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। স্বাভাবিকভাবে তাতে দলের দায়িত্ব পড়ার কথা সহ অধিনায়ক তামিমের ওপর। কিন্তু বোর্ড তাকে পাশ কাটিয়ে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব তুলে দেয় মাশরাফির হাতে।

ভুলে গেলে চলবে না একসময় টেস্টেও মুশফিকুর রহিমের ডেপুটি হিসেবে ছিলেন এই তামিম ইকবাল। ২০১৭ সালে যখন মুশফিককে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্ব বর্তানোর কথা ছিল তামিমের ওপর। কিন্তু সেটা হয়নি। বরং মুশির সাথে তামিমকেও অব্যাহতি দিয়ে নতুন অধিনায়ক হিসেবে সাকিব ও সহ অধিনায়ক হিসেবে রিয়াদকে মনোনিত করা হয়।

তারপর ২০১৮ সালে ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে অধিনায়ক সাকিব চোটের কারণে খেলতে না পারায় দলের নেতৃত্ব দেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। অথচ সে দলের সহ অধিনায়ক ছিলেন তামিম ইকবাল নিজে।

এতেই স্পষ্ট অধিনায়কত্বের ক্ষেত্রে তামিমের ওপর বোর্ডের আস্থা কতটুকু ছিল বা তিনি ভবিষ্যত অধিনায়কের ভাবনায় কতটুকু আছেন। এমনকি ঘরোয়া ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ ও বিপিএলেও কোন দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্বে তিনি নেই বর্তমানে। এক্ষেত্রে আবারও বলতে হয় রিয়াদই হতে পারতেন ‘বেস্ট পসিবল চয়েজ’। অভিজ্ঞতার বিচারেই বলেন কিংবা দলের ভবিষ্যত কাণ্ডারী বিবেচনায়।

বর্তমানে সবচেয়ে জরুরী হল দলের জয়ের ধারায় ফেরা। সেজন্য তামিম ইকবালের ছন্দে ফেরাটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আগেই বলেছি এই সিরিজে এই দল নিয়ে ভালো করা কতটা চ্যালেঞ্জিং। এখন এই চ্যালেঞ্জের চাপ ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কের ছন্দে ফেরার পথে কাটা হয়ে না দাঁড়ালেই হয়। যদি দাঁড়ায় তবে যতটা না দায় তামিমের তার চেয়ে বেশি দায় নিতে হবে নীতিনির্ধারকদের। তামিম ইকবালের জন্য শুভকামনা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।