মুশফিক ডাবল সেঞ্চুরি করেন, খান সাহেবের কেরামতি বাড়ে!

ইমরুলের গল্প বলেছিলাম কয়েকদিন আগে। সেই যে, খেলার আগের দিন হেলাফেলায় বলেকয়ে পরদিন ঠিকই সেঞ্চুরি করে ফেললেন। আজকে আরও অবিশ্বাস্য গল্প শোনাই।

বিকেলে সাকিবকে ছাড়িয়ে মুশফিক রেকর্ড গড়ার পরই একটি ফোন পেলাম। নরম্যালি তার ফোন ধরেই একটু ফাজলামো-টাজলামো করি। আজকে তিনিই আগে বলে উঠলেন, ‘কি, বলছিলাম না!’ কি বলেছিলেন, সত্যিই ভুলে গিয়েছিলাম। তিনি বলার পর মনে পড়ল।

ফোনের অপরপ্রান্তে ছিলেন তামিম ইকবাল। জিম্বাবুয়ে সিরিজ শুরুর আগে একদিন তার সঙ্গে কথায় কথায় বলছিলাম, ‘বড় একটা মিস করে ফেললেন। জিম্বাবুয়ে সিরিজটা খেলতে পারলে অন্তত ২টা সেঞ্চুরি করতে পারতেন।’সে একটু আক্ষেপ-টাক্ষেপ করল। পরে বলল, ‘তবে, একটা জিনিস লিখে রাখেন খাতা-কলমে, এই সিরিজে একটা রেকর্ড হবে। সাকিবের রেকর্ড ভেঙে মুশফিক আবার হাইয়েস্ট ইনিংসের রেকর্ড গড়বে।’

আমি খাতা-কলমে বা মনে, কোথাও লিখিনি। ভুলে গিয়েছিলাম। তার টিপ্পনিতে আবার মনে পড়ল।

বাংলাদেশ দলে মুশফিককে যদি কেউ সবচেয়ে ভালো বোঝেন, সেটি তামিম। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে একসঙ্গে খেলেছেন, সেসময় দুজনে রুমমেটও ছিলেন। আমার মনে হয়, শুধু দলে নয়, বাংলাদেশ ক্রিকেটে বা গোটা বাংলাদেশে, সব মিলিয়েই ক্রিকেটার মুশফিকের সবচেয়ে গুণমুগ্ধদের শুরুর দিকে থাকবেন তামিম।

তবে এই কারণেই তামিম রেকর্ডের কথা আগাম বুঝে ফেলেছেন, এটা ভাবার কারণ নেই। কালকে যখন ৩ উইকেট হারিয়ে দল ধুঁকছে শুরুতে, প্রেসবক্সে আড্ডা দিতে এসে তামিম বলে গিয়েছিলেন, মুমিনুল-মুশফিক দুজনই সেঞ্চুরি করবে। ওই আর কী, ঝড়ে বক মরে, খান সাহেবের কেরামতি বাড়ে!

মুশফিকের ইনিংসটি নিয়ে একটু বলি। আমার মতে, এই মুশফিকের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। জানি, প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে, বোলিং দুর্বল, ঘরের মাঠে খেলা। এর চেয়ে অনেক শক্ত প্রতিপক্ষ, অনেক ভালো বোলিং আক্রমণ, অনেক কঠিন কন্ডিশন ও পরিস্থিতিতে অনেক ভালো ইনিংস মুশির আছে। তার পরও, এই ইনিংসটি টেস্ট ব্যাটসম্যান মুশিকে আরও পরিণত করবে। আরও সমৃদ্ধ করবে। আরও বিশ্বাস জোগাবে নিজের সামর্থ্য নিয়ে। মূল কারণ, যেভাবে খেলেছেন মুশি।

প্রথমত, নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং পেরেছেন। অনেক সহজাত প্রবৃত্তিকে দমিয়ে রেখেছিলেন। যেমন, প্রিয় সুইপ শট কম খেলেছেন এই ইনিংসে। জোর করে বা বানিয়ে শট খেলার চেষ্টা কম করেছেন। ৫১ পারসেন্ট রান করেছেন অফ সাইডে, ৪৯ পারসেন্ট লেগ সাইডে। প্রায় সমান! সিঙ্গেল নিয়েছেন ৯৯ টি।

ইনিংসটি গড়েছেন প্রায় সুনিপুণভাবে। রিল্যাক্সড মুহূর্ত এসেছে খুবই কম। যখন যেটা দরকার, ঠিক সেটাই গড়েছেন। আজকে সকালের কথাই ধরুণ। ১১১ রান নিয়ে শুরু করেছিলেন, অনায়াসেই চটকদার শটের পথে ছুটতে পারতেন। কিন্তু মুশি প্রথম ঘণ্টায় করেছেন ৪ রান, প্রথম বাউন্ডারির আগে রান করেছিলেন ৫৫ বলে ৮! টেস্ট ক্রিকেটের চিরায়ত প্রথা, ‘প্রথম ঘণ্টা প্রতিপক্ষকে দাও, পরের পুরো দিন নিজের করে নাও।’

দ্বিতীয়ত, তার ওভারঅল ডিসিপ্লিন, যতটা কম্প্যাক্ট ব্যাট করেছেন। উইকেট খুব ভয়ঙ্কর নয়, বোলারদের জন্য অনেক বেশি সহায়তা ছিল না। তবে যথেষ্ট প্রাণ ছিল উইকেটে, কিছু না কিছু করেই। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, আনইভেন বাউন্স ছিল। উইকেটে আনইভেন বাউন্স থাকলে অনেক কিছু্‌ কন্ট্রোলে থাকে না। কিন্তু মুশির ৫৮৯ মিনিট ও ৪২১ বলের ইনিংসে কন্ট্রোলের হার ৮৯ শতাংশ। এই রেট প্রায় অবিশ্বাস্য।

সব মিলিয়ে আমি মনে করি, মুশির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ডিসিপ্লিনড ইনিংস এটি। মুশি আজকের পর জানতে পারবেন, নিজের অনেক সহজাত শটের সঙ্গে আপোস করে, এত বল ছেড়ে, এত ডিসিপ্লিন থেকেও এত বড়, এমন ম্যারাথন ইনিংস খেলা যায়। এই বিশ্বাসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মুশির ব্যাটসম্যানশিপ আরও সমৃদ্ধ হবে।

ওপরের ছবিটি অবশ্য অনেকের কাছে বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে। এই ছবি গতকাল মুমিনুলের সেঞ্চুরির পর। মুমিনুল যখন ফিফটি করলেন, উদযাপন করা বা সামান্য ব্যাট তোলাও ছিল না। মুশফিক আরেকপ্রান্ত থেকে ব্যাট উঁচিয়ে, তালি দিয়ে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। মুমিনুলের সেঞ্চুরির পরও মুশফিকের উচ্ছ্বাসই ছিল বেশি।

এসব নতুন নয় একদমই। বরাবরই কোনো ব্যাটসম্যান মাইলফলক ছুঁলে ও উইকেটে মুশি থাকলে, আমি আগে তাকাই মুশির দিকে। সতীর্থের অর্জনে বরাবরই তার উচ্ছ্বাসই দেখা গেছে বেশি। ওয়েলিংটনে সাকিবের ডাবল সেঞ্চুরির মুহূর্তটাও মনে আছে, মুশির সে কী উল্লাস! অনেক বড় গুণ এটি। সতীর্থদের অর্জন এভাবে উপভোগ করেন যিনি, তার ক্যারিয়ারে উদযাপনের মূহূর্ত আরও বেশি আসুক, এটাই চাওয়া।

– ফেসবুক ওয়াল থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।