বরফের চেয়ে শীতল, আগুনের চেয়েও গরম!

তিনি ৯৬ থেকে ৯৭-তে গেলেন। মালিঙ্গার প্রথম বলেই সিঙ্গেল নিলেন, মুস্তাফিজের জন্য মালিঙ্গার পাঁচ-পাঁচটি বল ছেড়ে দিলেন! অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি আমরা। এটা কী করেছেন মুশফিক? নাম্বার ইলেভেনকে কেউ লাসিথ মালিঙ্গার সামনে এভাবে এক্সপোজ করে? তাও আবার ব্যাটসম্যান মুস্তাফিজ, মালিঙ্গাও আছেন টপ ফর্মে?

তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত নন। ড্রেসিং রুমের দিকে তাকিয়ে একটা ‘থাম্বস আপ’ দেখালেন। যেনো মনে হলো, ম্যানেজমেন্ট থেকে নিশ্চয় তিনি কোনো ইঙ্গিত পেয়েছেন। নইলে সিঙ্গেল নিতেন না হয়তো।

আব্বুকে বললাম, তামিম মনে হয় ব্যাটিং করবেন।

‘কীভাবে বলছিস?’

‘ওদের ব্যাটিং দেখে যে মনে হচ্ছে না, শেষ উইকেট ব্যাটিংয়ে!’

দ্বিতীয় ওভারেই ব্যাটিংয়ে নামতে হয়েছে তাঁকে, ১ রানে নেই ২ উইকেট। খানিক পর পরম নির্ভরতার সঙ্গী তামিমকেও দেখলেন ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে মাঠ ছাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভীষণ গরম। অপেক্ষাকৃত নবীন সঙ্গী, মিঠুনকে ওপাশে। সেখানে রয়ে সয়ে খেললেন প্রথম পৌনে একঘন্টা। তারপর বেরোলেন খোলস ছেড়ে। তাও মিঠুনের মতো আগ্রাসনই শেষ কথা মেনে নয়, রীতিমতো অঙ্ক কষে তারপর যেনো বড় শট খেলেছেন! যাকে কমেন্টেটররা ক্যালকুলেটেড রিস্ক বলেন।

২৮ ওভারের শেষ হওয়ার আগেই বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ের অর্ধেক হাওয়া। তবুও যেনো কোনো ভাবান্তর নেই তাঁর।

বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ের লেজ বেরিয়ে এসেছে। তারপরও কোনো তাড়াহুড়ো নেই। মেহেদী মিরাজকে সাথে নিয়ে ধীরে সুস্থে এগোতে থাকেন। তারপর মিরাজ তাঁকে ছেড়ে যান, অধিনায়কও তাঁকে রেখে আসেন, ছেড়ে যান রুবেলও। অপর প্রান্তে তারপরও তিনি কী শান্ত! অবিচল। প্রয়োজনে তিনি রক্ষণাত্মক, আবার সময় বুঝে, পরিস্থিতি বুঝে মারকুটে। তিনি বরফের চেয়েও শীতল, আগুনের চেয়েও গরম!

এই মুশফিক, মুশফিকের এমন ব্যাটিং আমরা আগে কখনো দেখিনি। কক্ষনো না। তিনি আবেগী, চমৎকার খেলতে খেলতে হুটহাট ভুল করে বসেন, চাপ সামলাতে সামলাতেই চাপে ভেঙে পড়ে। আগে তাঁকে কতো রুপে দেখেছি, কিন্তু এই রুপে, এমন ধীরস্থির, অটল, মহীরুহের মতো অবিচল রুপ তাঁর আগে কখনো দেখিনি। কক্ষনো না।

বাংলাদেশ ক্রিকেটেই এমন ইনিংস কখনো দেখেছি বলে যে মনে পড়ছে না। একা হাতে দলকে টেনে নিতে সাঙ্গাকারাকে দেখেছি, ইনজামামকে দেখেছি, ধোনিকে দেখেছি – কতো কতো জনকে দেখেছি। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটে কক্ষনো দেখিনি।

 

মুশফিক আমাদের অদেখাকে দেখিয়েছেন, কখনো না-পাওয়া এক স্বাদ দিয়েছেন। তাই সুনিশ্চয়তার সাথে, কোনো রকম অন্যতম-টন্যতম’র ধার না ধেরে আমি বলতে পারি- ১৫০ বলে ১১ চার আর ৪ ছয়ের সমন্বয়ে সাজানো এই ১৪৪ রানের ইনিংসটাই, বাংলাদেশ ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ইনিংস।

তামিম ইকবাল! তারপরও কী তাঁর নিবেদন নিয়ে প্রশ্ন উঠবে?

ক্রিকেটাররা বাংলাদেশ ক্রিকেটের সার্ভেন্ট সত্যি, তাঁরা বাংলাদেশের প্রতিনিধিও। এই বিশ্বভ্রক্ষ্মাণ্ডে, ক্রিকেট নামক খেলার মাধ্যমে তাঁরা এই দেশটাকে প্রতিনিধিত্ব করেন। সুতরাং তাঁদের নিবেদন ও দায়বদ্ধতার প্রতি আঙুল তোলা কিছুটা ইনজাস্টিস হয়ে যায় বোধহয়!

অন্তত বাংলাদেশ ক্রিকেটের পঞ্চ পাণ্ডবের জন্য তো অবশ্যই।

হ্যাটস অফ টু ইউ তামিম ইকবাল! হ্যাটস অফ টু ইউ মুশফিকুর রহিম! অভিনন্দন বাংলাদেশ।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।