মুশফিক মোস্টট্রিট

মুশফিকুর রহিম নামটা মনে পড়লে দুটো ইমেজ মাথায় আসে।

১.

২০১৪ এশিয়া কাপে ভারতের বিপক্ষে দুর্দান্ত ব্যাটিং করছেন মুশফিক। বরুন অ্যারন নামের এক পেসারকে নিয়ে খুব আলোচনা হচ্ছিলো ভারতীয় মিডিয়ায়; ১৫০ কি:মি: গতিতে বল করে। কিন্তু ম্যাচে এরনের বোলিংয়ের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণই দেখা যাচ্ছিলো না, আলগা ডেলিভারি দিচ্ছিলো প্রচুর; লং লেগ রিজন দিয়ে মুশফিক তাকে একটা ছক্কা মারেন। ক্ষুব্ধ অ্যরন সেই ওভারেই আনস্পোর্টিং এক বিমার মারে যেটা মুশফিকের পাজরে গিয়ে আঘাত হানে; সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ফিজিওর শুশ্রুষায় পুনরায় যখন ব্যাটিং করতে উঠে দাঁড়ায়, ধারাভাষ্যে থাকা সুনীল গাভাস্কার মন্তব্য করেন, ‘রিমেম্বার হি ইজ আ টাইগার!’

২.

নিউজিল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট চলছে; বাতাসে বল এলোমেলো সুইং করছে। টিম সাউদির বাউন্সার মাথায় লেগে সে পিচের উপরই হুমড়ি খেয়ে পড়ে; স্ট্রেচারে করে মাঠের বাইরে, সেখান থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ফেসবুকে মানুষজনের স্ট্যাটাস পড়ে শংকা বাড়তে থাকে; বাঁচবে তো মুশফিক?

এই দুটো ইমেজ মাথায় থাকার কারণ কী হতে পারে, ভেবেছি, কিন্তু সন্তোষজনক উত্তর পাইনি। কেন পাইনি সে বিষয়েও কথা হবে আশা করছি।

আমার লেখা পড়তে গিয়ে সিংহভাগ পাঠক অভিযোগ করে, এক লাইনে যা বোঝানো যায়, আমি সেটা বলতে ১১ লাইন খরচ করি, যে কারণে কিছুদূর পড়ার পর আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ২০০০ সালের পূর্বে মানুষের এভারেজ কনসেনট্রেশন ব্যাপ্তি ছিলো ১২ সেকেন্ড, ২০১৬ তে শুনেছি সেটা নেমে ৮ সেকেন্ডে এসে দাঁড়িয়েছে; ৮ সেকেন্ড পরেই মানুষ এক বিষয় থেকে অন্যদিকে মনোযোগ সরিয়ে ফেলে নিজের অজান্তেই।

তবু আমি ১১ লাইনে প্রকাশ করা নীতিতেই অবিচল। কোনো স্টেটমেন্ট ব্যাখ্যা করতে গেলে তার ব্যাকগ্রাউন্ড, ডেভেলপমেন্ট, অনুসিদ্ধান্ত, কারণ বা রিজনিং প্রভৃতি শর্তগুলো পূরণ করা বাঞ্ছনীয় মনে করি।

মুশফিক প্রসঙ্গে উপরোক্ত ভূমিকা দেয়ার উদ্দেশ্য আছে। ছেলেবেলায় রাসেল নামে সমবয়সী এক বন্ধু ছিলো আমার, একটু বড়ো হবার পর সে বিকেএসপিতে ভর্তি হয় হকি বিভাগে; বিকেএসপিতে মুশফিক তার রুমমেট বা হলমেট ছিলো। তার মুখে মুশফিকের প্রশংসা শুনতাম বিস্তর, ‘আমরা অংক না পারলে মুশফিকের কাছে যাইতাম। রাতে লাইট নিভাইয়া সিগারেট খাইতাম, সিগারেটের গন্ধ একদমই সহ্য করতে পারতো না মুশফিক; আমাদের বকতো, এইটা নিয়া ওরে প্রায়ই পঁচাইতাম’।

আমার পরিচালিত ক্রিকেট টিমে ২০১৬ এর দিকে ইন্দিরা রোড ক্রিকেট একাডেমিতে কোচিং করা ‘সোহাগ’ নামের এক ক্রিকেটার খেলতে আসে কিছুদিনের জন্য। টিমের নিয়মানুসারে ওর পরিবর্তিত নাম রাখা হয় মহিউদদ্দিন। মুশফিকের ব্যক্তিগত নেট ব্যাটিংয়ে নিয়মিত যে বোলারটিকে দেখা যাবে তার নাম মহিউদ্দিন। ওর সূত্রে মুশফিকের ব্যাটিং সম্বন্ধে নানা গল্প শুনি আরেক ক্রিকেটার লগনের মুখে, যে ওর সাথে একই একাডেমিতে প্র্যাকটিস করে।

ক্রিকেটার মুশফিককে বোঝার চাইতেও ব্যক্তি মুশফিককে বুঝতে চাওয়াটা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ, যা তার ক্রিকেটিয় সত্তাটিকে এক্সপোজ করতে পারে।

– ২০১৩ জিম্বাবুইয়ে সিরিজে হারার পর হুট করেই সে অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা দেয়। বিসিবির হস্তক্ষেপে সেটা অবশ্য কার্যকর হয়নি তখন।

– মুশফিক প্রসঙ্গে একবার কোনো এক কোচ বলেছিলেন (সম্ভবত শেন জার্গেনসন)- মুশফিক কিপিংয়ে একটা ক্যাচ ছাড়লে মানসিকভাবে খুবই ভেঙ্গে পড়ে। তার ফলে আরও ভুল করতে থাকে।

– জিম্বাবুয়ের সাথে কোনো এক ম্যাচে রানিংয়ের সময় বোলার চাতারা সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলো; তার প্রেক্ষিতে তাকে ব্যাট দিয়ে যেভাবে মারার ভঙ্গি করেছিলো, ইউটিউবে সেই ভিডিও এখনো পাওয়া যায়।

– ২০১৬ এর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের কাছে ২ রানে হারা সেই ম্যাচটা সহজে ভোলা যাবে না হয়তোবা। সেই বিশ্বকাপেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচের বেশিরভাগ সময় নিয়ন্ত্রণ করেও হেরে যায় ভারত। ভারতের হারা নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করে টুইটার লিখেছিলেন মুশফিক। এ নিয়ে যথেষ্ট সমালোচিতও হন।

– ২০১৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ থেকে সাকিবের বিশ্রাম নেয়াটা বিরাট বিতর্কের জন্ম দেয়। সাংবাদিকরা মুশফিককে প্রশ্ন করে- আপনারও কি বিশ্রামের প্রয়োজন আছে? সে উত্তর দেয়- এখনো অত বড়ো প্লেয়ার হয়ে যাইনি যে, বিশ্রাম লাগবে। অনেকেই সেটাকে সাকিবের প্রতি খোঁচা দেয়া হিসেবে ইন্টারপ্রেট করে, সোস্যাল মিডিয়ায় প্রচুর লেখালিখি হয়। ওই মন্তব্যের পর সাকিব-মুশফিকের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কিছুটা অবনতি হয়েছে বলে কোনো কোনো ক্রিকেট দর্শককে মন্তব্য করতে দেখি।

– নিদাহাস ট্রফিতে শ্রীলংকার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে ২১৫ চেজ করা ম্যাচ জয়ে মুশফিকের অবদান সবচাইতে বেশি। সবই ঠিক ছিলো; ম্যাচ জেতার সাথে সাথেই মুশফিক নাগিন ড্যান্স দিয়ে ফেলে, যা সমগ্র টুর্নামেন্টজুড়েই বাংলাদেশ দলের পিছুপিছু ঘুরতে থাকে। জানা যায়, বোলার নাজমুল অপুর সিগনেচার সেলিব্রেশন (নাগিন মোড) নিয়ে শ্রীলংকার কয়েকজন খেলোয়াড় বাংলাদেশ সফরে উপহাস করেছিলো; মুশফিক সেটাই পেব্যাক করেছে। নাগিনের পক্ষে-বিপক্ষে সুশীল-কুশীল দ্বিধা-বিভক্তি তৈরি হয়েছিলো।

– ২০১৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে প্রথম টেস্টে টস জিতে ফিল্ডিং নেয়ায় সমালোচিত হতে হয় তাকে। পরের টেস্টেও টস জিতে ফিল্ডিং নেয়াতে যখন সাংবাদিকরা প্রশ্ন করে সে উত্তর দেয়- টসে জেতাটাই ভুল হয়েছে আসলে। দলের বোলারদের মানসিকতা নিয়ে কড়া মন্তব্য করে, অধিনায়ক হয়ে বাউন্ডারিতে কেন ফিল্ডিং করছে, এর জবাবে বলে কোচ বলেছে আমি দলের সবচাইতে বাজে ফিল্ডার; তাই আমাকে বাউন্ডারিতে ফিল্ডিং করতে বলা হয়েছে।

– সাঙ্গাকারা টেস্টে কিপিং ছাড়ার পর সে উদাহরণ হয়ে উঠে। অনেকেই কলরব তোলে মুশফিকের কিপিং ছেড়ে দিয়ে ব্যাটিংয়ে আরো উপরে উঠে আসা উচিত। সেই সাথে কিপার হিসেবেও সে খুবই সাধারণ মানের, এটাও প্রায় ৮ বছর কিপিং করার পর ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ব্যাপারটা তার ইগোকে আহত করে; নিজেকে সে এভাবে উপস্থাপন করে- আমি আগে কিপার, পরে ব্যাটসম্যান। সমর্থক-সাংবাদিক বনাম কিপার মুশফিক, এক অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত চলতে থাকে, তার প্রভাব পড়ে কিপিংয়েও। ম্যাচের ক্রুশাল মুহূর্তে ক্যাচ ছাড়া, বা স্ট্যাম্পিং মিস করার ঘটনার সংখ্যা বাড়তে থাকে। বিসিবি একসময় তাকে কিপিং ছাড়তে বাধ্য করে। কিন্তু জেদ তার কমেনি, ওয়ানডেতে সে এখনো কিপিং চালিয়ে যাচ্ছে, এবং সর্বশেষ কয়েক ওয়ানডে সিরিজ লক্ষ্য করলে দেখবেন, অসাধারণ সব ক্যাচ নিচ্ছে উইকেটের পেছনে। চোখ বন্ধ করে ওয়ানডে ম্যাচগুলো মনে করুন, মুশফিকের কিপিংয়ে চোখ জুম করুন।

– কোনো এক বছরের প্রিমিয়ার লিগ দলবদলের সময় মুশফিক আগের দলের চাইতে ১০-১২ লাখ টাকা বেশি পারিশ্রমিকে অন্য দলে যোগ দেয়। তার বক্তব্যের সারমর্ম ছিলো- আমরা যে পর্যায়ে আছি এখন, তাতে সব দলেই ফ্যাসিলিটি প্রায় একইরকম থাকে। ফলে টাকাটা মূল পার্থক্য গড়ে দেয়। সেই আসরেই মাশরাফি পুরনো দলেই থেকে যায় একই পারিশ্রমিকে। তার বক্তব্যের সারমর্ম ছিলো- দল একটা ফ্যামিলির মতো, শুধু টাকার কারণে দল বদল করাটা পছন্দ করি না। (বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা, সম্পূর্ণ স্মৃতিনির্ভরতা থেকে লিখছি। বক্তব্যের বাক্য এদিক-সেদিক হতে পারে। কিন্তু ভাবার্থ এরকমটাই ছিলো)। মুশফিকের সেই স্টেটমেন্ট নিয়েও সমালোচনা হয়েছিলো।

– ২০১৪ এর এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩২৭ করেও বাংলাদেশ হেরে যায় আফ্রিদির এলোপাতাড়ি হিটিংয়ের কারণে। তবে আলআমিনের বলে আফ্রিদি একবার ক্যাচ দিয়েও বেঁচে যায়। ক্যাচ মিস করা ফিল্ডারটির নাম মুশফিকুর রহিম!

– বিপিএলের কোনো এক আসরে মোহাম্মদ শহীদের বলে মিড উইকেট দিয়ে ছক্কা হাঁকানোর পর বোলারকে যেভাবে শাসাচ্ছিলো ব্যাট দেখিয়ে, ফেসবুকে সেই ছবিটাও ভাইরাল হয়েছিলো।

– কোনো এক কোরবানীর ঈদে ফেসবুকে কোরবানির ছবি পোস্ট করেছিলো সে। এ নিয়েও যথেষ্ট সমালোচিত হতে হয়েছিলো তাকে।

– তাসকিনের বাচ্চাকে দেখতে স্ত্রী-সন্তানসহ হাসপাতালে গিয়ে তাসকিনের সাথে যেভাবে ছবি তুলেছে, ছবিটা দেখলেই বোঝা যায় ফ্যামিলি মেম্বার হিসেবে মুশফিক কতটা সরলপ্রাণ।

– গার্নেট নামে আমার এক বন্ধু বর্তমানে সেনাবাহিনীতে ক্যাপ্টেন হিসেবে কাজ করছে। প্রাইমারি থেকে এসএসসি পর্যন্ত একসাথে একই স্কুলে পড়াশোনা করেছি আমরা। মুশফিক-মাহমুদুল্লাহ এর স্ত্রীরা তার আপন চাচাতো বোন। গার্নেটের বিয়েতে মানিকগঞ্জেও গিয়েছিলো মুশফিক। আমার যাওয়া হয়নি, তবে স্থানীয় বন্ধুদের মুখে মুশফিকের আচার-ব্যবহারের প্রশংসাই শুনেছি।

– মুশফিক এসএসসি এবং এইচএসসিতে ভালো ফলাফল করে জাহাঙ্গীরনগর ভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করেছে। শাহরিয়ার নাফিস, জহুরুল ইসলাম ঢাকা ভার্সিটিতে পড়াশোনা করতো। একাডেমিক প্রসঙ্গটা আনার সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। ক্রিকেট খেলাটা যে পুরোটাই মেন্টাল টাফনেস এবং মেন্টাল হেলথ এর সাথে জড়িত, এই বিষয়গুলো অনুধাবন ও ধারণ করতে হলে শিক্ষাগত যোগ্যতা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবেই। মুস্তাফিজ বা রুবেলকে এই তত্ত্বগুলো বোঝানো হয়তোবা সম্ভবই হবে না, কিন্তু মুশফিক শোনামাত্রই এর পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার জন্য আন্ডারস্ট্যান্ডিং উন্নত করতে এ বিষয়ে পড়তে চাইবে। খেলাধুলা আর পড়াশুনা একসাথে হয় না, এই কথাটা শুধুমাত্র বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের বেলায়ই প্রযোজ্য হতে দেখি (তবে সাঈদ আনোয়ার, ইমরান খানসহ পুরনো অনেক ক্রিকেটারই এই দলে পড়বে না।

মন্তব্যটা এখনকার খেলোয়াড়দের প্রেক্ষিতে করেছি); অন্য দলের খেলোয়াড়রা উচ্চশিক্ষিত না হলেও কম-বেশি শিক্ষিত। এক্ষেত্রে অবশ্য যদি-কিন্তু সংক্রান্ত মধ্যবিত্তীয় হিসাব-নিকাশ আছে অনেকগুলো। ক্রিকেটারদের ক্যারিয়ার ৩৫-৩৬ এই শেষ হয়ে যায়, জাতীয় দলে খেলে মাত্র ১৪-১৫ জন, প্রিমিয়ার লীগে খেলে বড়োজোর ২০০ জন; এই তীব্র কম্পিটিটিভ ক্রিকেটে উপার্জন করার জায়গা বানানোর চাইতে চোখ-মুখ বন্ধ করে কোচিং-স্কুল-কলেজে সময় দিলে চাকরির বাজারে এডভান্টেজ পাওয়া যাবে। যে কারণে, অল্প ব্যতিক্রম বাদে পেশাদার ক্রিকেটারদের বেশিরভাগেরই পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড শিক্ষা-দীক্ষায় সমৃদ্ধ নই। ক্লিনিকাল সাইকোলজির মতো করে স্পোর্টস সাইকোলজির সাথে ক্রিকেটারদের মানসিকভাবে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক এবং শিক্ষাগত অনগ্রসরতা একটা উল্লেখযোগ্য বাধা। আশরাফুলের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার ছবি প্রথম আলো পত্রিকায় এসেছিলো। আমি মনে করি, ক্রিকেটারদের পড়াশোনাকে কম গুরুত্ব দিলেও চলবে এই মেসেজ প্রমোট করার ক্ষেত্রে সেই ছবিটার একটা বড়ো দায় আছে। রেজাল্ট আর ইমপ্যাক্ট দুটো পৃথক জিনিস। রেজাল্ট তাৎক্ষণিক বোঝা যায়, ইমপ্যাক্ট আবিষ্কার করে নিতে হয় দীর্ঘদিন পরে।

ব্যক্তি মুশফিককে বোঝার ক্ষেত্রে এতগুলো কেইস উল্লেখ করলাম। এবার তার চরিত্রকে প্রতিকৃতায়িত করা যাবে। চিরায়ত ‘গুডি বয়’ রা যেমন হয়, মুশফিক অনেকটাই সেরকম, যার জীবন চলে রুটিন মেনে। কিন্তু বয়স বাড়ার পর প্র্যাকটিকাল জগতের সাথে মানিয়ে নিতে গিয়ে এইসমস্ত গুডি বয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খাবি খায়, কারণ তারা কখনো তর্ক করেনি, সোজা পথে হেঁটেছে- পিছলে পড়ার ব্যথা পায়নি। একটু স্বাধীনতা পেলেই, এইসব গুডিবয়ের বড়ো অংশই তালগোল পাকিয়ে ফেলে, উচ্ছন্নে চলে যায়। ভার্সিটিতে হলে উঠার পর বহু ছেলেই যে পুরোপুরি বদলে যায়, এর প্রধান কারণও কিন্তু হঠাৎ পাওয়া স্বাধীনতাজনিত বিভ্রান্তি। তারা না শিখে দায়িত্ব নিতে, না পারে জটিলতা মোকাবেলা করতে।

মুশফিকের ক্রিকেটার হওয়াটাই তাই বিরল ব্যতিক্রম। তার জীবনের যে ধারাপাত তাতে তার জন্য পারফেক্টতম ক্যারিয়ার হতো বিসিএস ক্যাডার। ঠিক কোন চিন্তাধারা থেকে তার বাবা তাকে বিকেএসপিতে দিয়েছিলেন এটাও বেশ ইন্টারেস্টিং কেইস হতে পারে। সাবেক ক্রিকেটার দুর্জয়ের বাবা মরহুম সাঈদুর রহমান আমার মায়ের সরাসরি শিক্ষক ছিলেন, আমার বাবার সাথেও রাজনীতিসূত্রে পরিচয় ছিলো, তার মা আমার সরাসরি শিক্ষিকা ছিলেন, যিনি ক্লাস নিতে এলে শুধু ছেলের খেলার গল্প করতেন। আম্মুর মুখে শুনেছি, সাঈদুর রহমান স্যার দুর্জয় ভাইকে যখন বিকেএসপিতে ভর্তি করিয়ে দেয়, তারপরে কলেজে তার সহকর্মীদের কাছে গল্প বলতেন- ছেলে ছোটটা খুবই দুষ্টু, পড়াশোনায় মন নাই, তাই দিলাম খেলাধুলা করতে’ (দুর্জয়ের মামা গোলাম সারওয়ার টিপু বাংলাদেশ ফুটবল অঙ্গনে নমস্য ব্যক্তিত্ব)। শেখ ফরিদ নামে এক সিনিয়র বিকেএসপিতে ভর্তি হয়েছিলো, তারও পড়াশোনায় মন ছিলো না।

বয়সভিত্তিক দলের নিয়মিত মুখ নাদিফ চৌধুরী আমার চাইতে এক ব্যাচ সিনিয়র ছিলো; সিক্স থেকে সেভেনে উঠার সময় তাকেও বিকেএসপিতে দিয়ে দেয়। তার বাবা ক্রীড়া অনুরাগী এটা যেমন সত্য, তেমনি পড়াশোনাতেও তার পিছিয়ে থাকা ততদিনে পরিষ্কার হয়ে গেছে। এমনকি লেখার শুরুতে রাসেল নামের যে বন্ধুর গল্প বললাম, সেও বার কয়েক পরীক্ষায় ফেল করার পর তার বড়ো ভাই, যে বিকেএসপিতে টেনিস কোচ ছিলো, তাকে হকিতে ভর্তি করে দেয়।

আমাদের শৈশব-কৈশোরে বিকেএসপি তাই পড়াশোনায় অনাগ্রহী চঞ্চল প্রকৃতির তরুণদের জন্যই আদর্শ জায়গা হয়ে উঠেছিলো। সেই সময়ে পড়াশোনায় মেধাবী গুডিবয় ইমেজের মুশফিক কেন ও কীভাবে বিকেএসপিতে গেলো এটা একটা আগ্রহজাগানিয়া ব্যাপার। কারো একজনের মুখে শুনেছিলাম, তার বাবা যৌবনে স্পোর্টসম্যান ছিলেন।

মুশফিকের ক্ষেত্রে মূল ইস্যুটা হয়েছে মেন্টাল স্ট্রেন্থ বনাম থ্রিডি ইফেক্টের সংঘাত। (থ্রিডি= ডিটারমিনেশন, ডেডিকেশন, ডেসপারেটনেস)।

মেন্টাল স্ট্রেন্থের অধীনে পড়ে আবেগ নিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য, সাহসিকতা, নেতৃত্ব, সহিষ্ণুতা প্রভৃতি যোগ্যতা।

গুডি বয়দের মেন্টাল স্ট্রেন্থ কম না হয়ে উপায় থাকে না, কারণ তারা সামাজিকভাবে সেভাবেই প্রতিপালিত হয়। মুশফিক কত বছর বয়সে বিকেএসপিতে ভর্তি হয়েছে জানা নেই আমার। আমাদের সময়ে ক্লাস সেভেন আর এসএসসির পরে ভর্তি হওয়া যেতো শুনেছিলাম। যেটাই হোক, খুব অল্প বয়সেই তাকে বাড়ি ছাড়তে হয়েছে, নতুন জায়গায় নিজ দায়িত্বে সবকিছু ম্যানেজ করতে হয়েছে, ১৭-১৮ বছর বয়সেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বড়ো দুনিয়ার সাথে পরিচয় ঘটে গেছে।

গুডি বয়দের যেভাবে বাবা-মা কড়া শাসনে মানুষ করতে চায়, সে তো তার আগেই নিজের পৃথিবীতে নেমে গেছে; তবু তার মেন্টাল স্ট্রেন্থ কম বলার যুক্তি কী? যুক্তি দিয়ে এটা মেলানো যাবে না বলেই শুরুতে এতোগুলো কেইস দিয়েছি। যে কোনো সিরিজের শুরুর দিকের ম্যাচগুলোতে সে বরাবরই ভালো খেলে, দল বিপদে পড়লেও সে ঠাণ্ডা মাথায় ম্যাচ বের করে আনতে পারে, কিন্তু সিরিজ নির্ধারণী কোনো ম্যাচ, কিংবা সেমিফাইনাল বা ফাইনাল ম্যাচগুলোতে সে খারাপ হয়, এবং প্রতিটি আউটই অত্যন্ত দৃষ্টিকটু লাগে। এটা কি নিতান্তই কাকতালীয়? কিংবা লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যানদের নিয়ে ব্যাট করার ক্ষেত্রে পৃথিবীর জঘন্যতম ব্যাটসম্যান সম্ভবত মুশফিক। সে ওভারেই শুরুতেই লোয়ার অর্ডারের ব্যাটসম্যানকে স্ট্রাইক দিয়ে তাকে বোলারের সামনে এক্সপোজ করে দেয়। কেন সে এমনটা করে ম্যাচের পর ম্যাচ; লোয়ার অর্ডার যে টিকতে পারবে না এটা কি সে বোঝে না, তবু এমন করার ক্ষেত্রে তার ব্যাখ্যা কী হতে পারে? তার কি ক্রিকেট সেন্স এতোটাই নিম্নস্তরের?

তা যে নয়, তা ব্যাখ্যা করার জন্য আমি তার দীর্ঘদিনের ব্যাটিং ডাটা পর্যালোচনা করে অনুমানের ভিত্তিতে তার ভালো খেলার একটা প্যাটার্ন আবিষ্কার করেছি, যে কারণে অন্য কারো ব্যাপারে প্রেডিক্ট করতে না পারলেও মুশফিকের ক্ষেত্রে সবসময়ই প্রেডিক্ট করতে পারি এবং একুইরেসি ৮৯% এর বেশি। সেই প্যাটার্ন প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। তার আগে বোঝার চেষ্টা করি, মেন্টাল স্ট্রেন্থ কম হওয়া সত্ত্বেও সে কীভাবে নিজেকে এক্সিলেন্সের চূড়ায় উঠাতে পারলো?

মানুষের একটা কমন প্রবণতা আছে, যে কারো সাথে ঘনিষ্ঠ হলেই জিজ্ঞেস করবে, ভাই/আপু, আমার কী কী দুর্বলতা আছে মনে করেন? কিংবা বিজনেস জগতে প্রচলিত SWOT Analysis (Strength, Weakness, Opportunity, Threat) নামক কাঁঠালের আমসত্ত্বের বদৌলতে যে কোনোকিছুর স্ট্রেন্থ এর পাশাপাশি উইকনেস খুঁজে বের করাও আমাদের ক্রিটিক্যাল এনালাইসিস ক্ষমতার জিহাদী দায়িত্ব মনে করি অনেকসময়। ফলে স্ট্রেন্থও ম্যাক্সিমাইজ হয় না, উইকনেসেও আহামরি পরিবর্তন আসে না।

কোনো মানুষেরই দুর্বলতা আছে; কাজেই দুর্বলতা নিয়ে বিচলিত হওয়া অর্থহীন যদি স্ট্রেন্থ ম্যাক্সিমাইজ করা নিয়ে উদ্যম কাজ না করে। ধরা যাক, কারো স্ট্রেন্থ হলো, সে সুন্দরভাবে অর্গানাইজ করতে পারে, দুর্বলতা হলো শোনার প্রবণতা কম। প্রশ্ন হলো, পৃথিবীতে যদি অর্গানাইজারের বেস্ট ইলেভেন গঠন করা হয় সেখানে কি সে স্থান পাবে? যদি উত্তর নিশ্চিতভাবেই ‘না’ হয় তাহলে কীভাবে বেস্ট ইলেভেনে স্থান পাওয়া যায় সেই একশন প্ল্যান বানিয়ে একনাগাড়ে সেখানেই সময় দিতে থাকুক; সেই পথে যদি ‘শোনার প্রবণতা কম’ কোনো বাধা হয় এমনিতেই দূর হয়ে যাবে, বাধা না হলে থাকুকই নাহয় দুর্বলতা হিসেবে। শয়তান হওয়ার চাইতে মানুষ থাকাই কি ভালো নয়?

মুশফিকের ক্ষেত্রে ঠিক এই ঘটনাটাই ঘটেছে। সে থ্রিডি ইফেক্ট (ডিটারমিনেশন, ডেডিকেশন, ডেসপারেটনেস) কে নিজের স্ট্রেন্থ পয়েন্ট হিসেবে সনাক্ত করতে পেরেছে, তারপর উক্ত পয়েন্টে গ্লোবালি বেস্ট ইলেভেনে ঢুকতে নিজেকে আরো শাণিত করেছে দিনে দিনে। কীভাবে হলো এটা? ওই যে অল্প বয়সে ঘর ছাড়া, নিজের দায়িত্ব নিজে নেয়া। ফলে স্ট্রেন্থকে ম্যাক্সিমাইজ করে উইকনেসের বাধার উপরে উন্নীত করতে পেরেছে। ২০১২ এর আগে মুশফিক খুব বেশি ছক্কা মারতে পারতো না, এখন তার চাইতে ক্লিন হিটার কয়জন আছে? চার তো অহরহই মারে, ছক্কাও মারতে পারে লং অফ, লং অন, ফাইন লেগ, মিড উইকেট অঞ্চল দিয়ে। মিরাজের চাইতেও রিস্টে কম পাওয়ার তার, তবু টাইমিং দিয়েই যে ৭৫-৮০ মিটার পার করে ফেলা যায় এটা বুঝে সে টাইমিংয়ের উপরেই সকল মনোযোগ বিনিয়োগ করেছে।

বিশ্বকাপে যদি খেলতে পারে, নিশ্চিত দেখবেন, বড়ো কোনো এক বা একাধিক দলের বিপক্ষে সে ম্যাচ জিতিয়ে দিয়েছে, কিন্তু ডিসাইডিং কোনো ম্যাচ, বা ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে সে পারবে না। ২০১২ এর এশিয়া কাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে জেতার ক্ষেত্রে তার মারা ৩টা ছক্কার বিশাল অবদান আছে, কিন্তু ভারতের বিপক্ষে বড়ো কোনো ম্যাচে সে আর সহসা ভালো করতে পারবে না, কারণ টি২০ এর সেই ২ রানের হার তার মধ্যে মেন্টাল ব্লক তৈরি করেছে- একে বলে হন্টেড; মেন্টাল স্ট্রেন্থ কম হওয়ায় ব্লকনেসটা কাটাতে পারছে না। মাহমুদুল্লাহ কি বৈশিষ্ট্যগতভাবে তার কাছাকাছি? রসগোল্লা আর চমচম দুটোই মিষ্টি, কিন্তু তারা কি সমগোত্রীয়?

বর্তমান টিমে যে ৫ জন সিনিয়র খেলছে, এদের অবসরক্রম নিয়ে আমার একটা প্রেডিকশন আছে। মাশরাফি যেহেতু বয়সে সবচাইতে সিনিয়র, সেইসাথে ইনজুরিজর্জরিত অবস্থা, মিলিয়ে সে সর্বপ্রথম অবসর নেবে। এরপরে সাকিব। তামিম সর্বশেষ কয়েকবছরে দারুণ ফিটনেস সচেতন হওয়ায় সে সাকিব যাওয়ার পরেও খেলবে কিছুদিন। মাহমুদউল্লাহ মাঠ থেকে অবসর নেয়ার সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা কম; সে ফর্ম হারিয়ে বাদ পড়বে, সেভাবেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হবে হয়তোবা।

মুশফিক অবসর নেবে সবার শেষে, এমনকি রুবেলও তার আগে অবসরে যাবে বা বাদ পড়বে। ২০২৩ বিশ্বকাপের পরেও তাকে দলে দেখার প্রবল সম্ভাবনা দেখি। সেটা ওই থ্রিডি ইফেক্টের কারণেই।

এবং এ ব্যাপারে আমি অনেকখানি কনফিডেন্ট হওয়ায় আরো একটা প্রেডিকশন খুব অবলীলায় করতে পারি। অবসরে যাওয়ার আগে ভারতকে হারানো কোনো একটা ম্যাচে মুশফিক ম্যান অব দ্য ম্যাচ হবেই। তার মানসিক গড়ন বিশ্লেষণ করে এমনটাই মনে হয়েছে।

কিছু খেলোয়াড় থাকে যারা স্লো স্টার্টার। ইনিংসের শুরুর দিকে মারাত্মক শেকি থাকে, তখন লেগবিফোর অথবা বোল্ড হবে; কয়েক বল খেলে ফেললে তাদের আউট করতে বোলারের শরত-বসন্ত এক হয়ে যায়। রিকি পন্টিং-ইনজামাম উল হক, ক্যারিয়ারজুড়েই এই প্রেডিক্টেবল শেকিনেসের মধ্য দিয়ে গেছে। মুশফিককে স্লো স্টার্টার বা শেকি বলা যায় না, তবে তার খেলার প্যাটার্নটা অনেকখানিই প্রেডিক্ট করা যায়।

ইনিংসের প্রথম ১১ বলে সে যদি ৩টা সিঙ্গেল, ১টা ডাবল নেয় কিংবা ৪টা সিঙ্গেল নেয়; সেই ম্যাচে সে ৩৭+ রান করবেই। কিন্তু ওই ১১ বলের মধ্যে সে যদি একাধিক বাউন্ডারি মারে সেই ইনিংসে ২৯ পেরুনোর সম্ভাবনা খুবই কম।

ইনিংসের ১১ থেকে ২৩ বল এর মধ্যে সে যদি স্পিনার পায়, ওই সময়ে সে ২বার স্লগ সুইপ অথবা ১ বার রিভার্স সুইপ চেষ্টা করবে। যদি প্রথম ১১ বলে ২টা বাউন্ডারি থাকে, তার স্লগ সুইপ মিসটাইমড হবে। ৫টা সিঙ্গেলস হলে স্লগ সুইপ প্রথমটা মিস হবে, কিন্তু পরেরটা কানেক্টেড হবে।

কিন্তু প্রথম ১৯ বল খেলার সময় যদি পেস অ্যাটাক থাকে এবং প্রথম ৩টা বল ডিফেন্ড করতে পারে, পরবর্তী ১১ বলের মধ্যে সে ১টা ডাবল এবং অন্তত ১টা বাউন্ডারি মারবে। তার মানে সে ৪১+ রান করবে, কিন্তু পেস বোলিং থাকা অবস্থায় প্রথম ৫টা বলের ২টাতে যদি বিট হয়, বা প্যাডে লাগে, পরবর্তী ২৩ বলের মধ্যে সে কট বিহাইন্ড হবে, অথবা স্কয়ার কাট করতে গিয়ে পয়েন্টে ক্যাচ দিবে, কিংবা ফ্লিক করতে গিয়ে শর্ট মিডউইকেটে সফট ডিসমিসাল হবে।

সাধারণ সুইপ সে খুব বেশি করে না, কিন্তু কাউ কর্নার দিয়ে স্লগ সুইপ করবেই। এটা প্রায় সব অধিনায়কই জানে, যারা বোকার মতো কাউ কর্নারে ফিল্ডার রেখে তার স্কোরিং জোন বন্ধ করতে যায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুশফিক তখন অন্য শটগুলো চেষ্টা করে রান বের করে। কিন্তু যারা তার স্লগসুইপ খেলার সুযোগটা অবারিত থাকে, সেই ট্র্যাপে কাজ হয় প্রায় সময়ই, তবে পার্ট টাইমারদের বল খেলতে তার মধ্যে এক ধরনের ব্লকনেস কাজ করে। সে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

পার্ট টাইমারকে মেরে রান বাড়াবো, নাকি বলের মেরিট বুঝে স্ট্রাইক রোটেট করে খেলবো, এই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে গিয়েই সে আউট হয় বেশিরভাগ সময়। বাংলাদেশের কোন ব্যাটসম্যান পার্ট টাইমারদের বলে সর্বাধিকবার আউট হয়েছে, এরকম কোনো পরিসংখ্যান ঘাঁটলে আশরাফুল আর মুশফিকের মধ্যে ফাইট হবে, কিন্তু নিশ্চিত জানি মুশফিকই জিতে যাবে। মেন্টাল ব্লক ফ্যাক্টরের প্রতি আস্থা আছে বলেই এতোটা কনফিডেন্টলি বলতে পারছি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাকে স্লগ সুইপ খেলতে দেখলেই সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, এটা কি সে জানে না? খুব ভালোমতোই জানে, তবু থ্রিডি ইফেক্টের কারণে এটা সে করবেই; স্লগ সুইপে তার চাইতে কেউ পারফেক্ট হতে পারে না, এটা প্রমাণ করার প্রচণ্ড জেদ কাজ করে। এখান থেকে তাকে কেউ সরাতে পারবে না, এমনকি সে স্বয়ংও নয়। মাথার ভেতরে অটোসাজেশন প্রক্রিয়া এভাবেই কাজ করে। তার বহু ইনিংসেই আপনি কাভার ড্রাইভ নাও দেখতে পারেন, একটাও স্ট্রেইট ড্রাইভ নাও থাকতে পারে, কিন্তু ২৯+ রান করেছে অথচ স্লগ সুইপ খেলেনে এমন ইনিংস একটাও দেখানো সম্ভব নয় বোধহয়।

স্পিন বলে চাইলেই সে লং অন, লং অফ এ পুশ করে সিঙ্গেল বের করতে পারে, কিংবা ইনসাইড আউট খেলতে পারে কাভারের ওপর দিয়ে; কিন্তু কোনো কারণে সেই তরিকা তাকে টানে না। ৯টা-৫টা অফিস করা মানুষের জীবনে বিনোদনের উৎস যেমন সপ্তাহান্তের ছুটিতে পরিবার নিয়ে দুপুরে মুরগীর মাংস দিয়ে ভাত খাওয়া, মুশফিকের লিনিয়ার বা একরৈখিক থট প্রসেসে স্লগ সুইপটাই তার একমাত্র এডভেঞ্চার কিংবা বিনোদন।

তবু বিগত কয়েক বছরে সে স্কুপ করা আয়ত্ত করেছে, রিভার্স সুইপ আয়ত্ত করেছে, হুক বা পুল কখনোই তার শক্তিমত্তার জায়গা ছিলো না, সচরাচর খেলেও না সেগুলো। তার স্কোরিং শট যথেষ্ট সমৃদ্ধ- ফ্লিক, কাট, ড্রাইভ, রিভার্স+ স্লগ সুইপ, ওভার দ্য টপ। গ্যাপে বল প্লেস করে সিঙ্গেলসকে ডাবলস এ কনভার্ট করায় সে অদ্বিতীয়; একারণেই সাকিবের সাথে তার পার্টনারশিপগুলো এতো দুর্দান্ত হয়, দুজনই রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে দুর্দান্ত, যা মিরাজ ছাড়া আর কোনো ব্যাটসম্যানের মধ্যে একদমই লক্ষ্য করা যায় না।

বাংলাদেশের ম্যাচগুলো পর্যালোচনা করলে দেখবেন প্রতি ৩ ম্যাচে গড়ে দুইটা রান আউট। ভারত, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সাউথ আফ্রিকা- এই ৫টি দলের সাথের ম্যাচগুলো বিবেচনায় নিলে রান আউট পারসেন্টেজ আরো বেশি হবে। এবং রান আউটগুলো ডিরেক্ট থ্রো জাতীয় শার্প ফিল্ডিংয়ে নয়, পার্টনারদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝিতে ২ জন একই প্রান্তে চলে এসেছে অথবা একজন ক্রিজের অর্ধেক পেরিয়ে যাওয়ার পর আর ফিরতে পারেনি। পাকিস্তানকে বাদ রাখলে টেস্ট খেলুড়ে দেশের মধ্যে রান আউটের দিক থেকে বাংলাদেশ শীর্ষে থাকবে।

কেন এতো রান আউট। এমনকি একসাথে প্রায় ১৬ বছর খেলার পরও সাকিব-মুশফিক জুটিতেও ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউটের ঘটনা ঘটে। ব্যাপারটা নিয়ে ভেবেছেন কখনো? ব্যাটসম্যানদের মধ্যে কানেক্টিভিটি নেই। সাঙ্গাকারা-জয়াবর্ধনে যখন একসাথে ব্যাটিং করতো, তাদের রানিংগুলো আবার দেখবেন নতুন করে। তাদের কেউ একজন কল করলেই দৌড় দিয়ে দিতো, এবং কোনটা স্ট্রাইকারের কল, কোনটা ননস্ট্রাইকারের কল- এ ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে অদ্ভুত অতুলনীয় এক জেন্টলম্যান এগ্রিমেন্ট ছিলো তাদের।

ধরা যাক সাঙ্গাকারা কল দিয়েছে রানের জন্য, সেটা হয়তোবা রান না, তবু জয়াবর্ধনে দৌড় দিবে, কারণ এখানে নেগোশিয়েটের অপশনই নেই; যদি রান নাও হয়, আউট হতে হবে। একে বলে কানেক্টিভিটি; সাঙ্গাকারা-জয়াবর্ধনেও হয়তোবা রান আউটের মাধ্যমে নিজেদের জুটি ভেঙ্গেছে, কিন্তু কানেক্টিভিটি রুলস ভঙ্গ করেনি। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা শট খেলার পর দুজনই দেখে বল কোথায় যাচ্ছে, তারপর ফিল্ডারের অবস্থান বুঝে হুটহাট সিদ্ধান্ত বদলিয়ে ফেলে; একারণে চিকি সিঙ্গেল বাংলাদেশের ইনিংসে নেই বললেই চলে। কিন্তু কানেক্টিভিটি থিওরি বোঝাবে কে?

মুশফিকের সম্পর্কে লিখতে গিয়ে রানআউট প্রসঙ্গ এলো কেন? কারণ, অন্য যে কোনো ব্যাটসম্যানের তুলনায় মুশফিকের রান আউট হওয়ার প্রবণতা কম। সে কানেক্টিভিটি নিয়ে ভাবিত না হলেও রানিংয়ের মৌলিক কিছু নীতি অনুসরণ করে।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে ৪ জন কোচকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করি আমি। গর্ডন গ্রিনিজ, ডেভ হোয়াটমোর, রিচার্ড ম্যাকিন্স, এবং জেমি সিডন্স। শেষোক্ত নামটি নিয়ে অনেকেরই আপত্তি থাকতে পারে, কিন্তু তামিমকে ফ্রি লাইসেন্স দেয়া, সাকিবের ক্রিকেট সেন্স প্রখর করার ক্ষেত্রে এই কোচের প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে। জুনায়েদ সিদ্দিকী, রকিবুল টাইপ মিডিওকর প্লেয়ারদের নিয়ে কিছুটা বাড়াবাড়ি থাকলেও সামগ্রীকভাবে তাকে আমি গুরুত্বপূর্ণই বলবো। মুশফিক সম্বন্ধে এই ভদ্রলোকের একটা দুর্দান্ত কমপ্লিমেন্ট আছে। সে বলেছিলো- ‘মুশফিক বাংলাদেশের সবচাইতে ভারসেটাইল ব্যাটসম্যান যে ১ থেকে ৬ নম্বর পর্যন্ত যে কোনো পজিশনেই ব্যাট করতে পারে।’

আমি এই কমপ্লিমেন্ট শতভাগ সমর্থন করি। ৬ নম্বরে খেলার ইচ্ছাটা আরো বছর পাঁচেক আগে বিসর্জন দিলে নিশ্চিতভাবেই আরো বেটার ব্যাটিং এভারেজের একজন মুশফিককে পেতাম আমরা। তার যা খেলার ধরন, টেস্টে ৪ আর ওয়ানডেতে ৩ নম্বর হওয়া উচিত তার পারফেক্ট ব্যাটিং পজিশন। কিন্তু ব্যক্তিগত হীনম্মন্যতাবোধ আর অব্যাখ্যাত কিছু সংস্কারের কারণেই লোয়ার মিডল অর্ডারে ব্যাট করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছে বরাবর। এখন যে ২ ফরম্যাটেই ৪ নম্বরে ব্যাটিং করছে, আমার ধারণা এটাও তার নিজের পছন্দে নয়, টিম ম্যানেজমেন্ট অথবা বোর্ড সভাপতির হস্তক্ষেপে।

তবে ওয়ানডের ব্যাটিং পজিশন নিয়ে আমি নিজেও কিছুটা সংশয়াপন্ন, কারণ ২০১১ বিশ্বকাপেও তাকে ৪ এ ব্যাট করানো হয়েছে, ২০১২-১৩ সালেও, কিন্তু হাতুরুসিংহ কোচ হওয়ার পর মাহমুদুল্লাহকে ৬ থেকে ৪ এ আর মুশফিককে ৪ থেকে ৬ এ পাঠিয়ে দিয়েছিলো। তাতে মাহমুদুল্লাহ এর ক্যারিয়ার পুনর্জীবন লাভ করেছে, কিন্তু আবারো কেন ব্যাটিং পজিশনে বদল এসেছে এটা ধোঁয়াশাপূর্ণ লাগে।

বর্তমান বিশ্বক্রিকেটের দলগুলোর ব্যাটিং নিয়ে পর্যালোচনা করলে বাংলাদেশের একমাত্র মুশফিককেই দেখি যে প্রতিটি দলেই মিডল অর্ডারে ব্যাটসম্যান হিসেবে নির্দ্বিধায় সুযোগ পেয়ে যাবে। তামিম ভারত বাদে বাকিগুলোতে পাবে; সাকিব ইংল্যান্ডে সুযোগ পাবে না মঈন আলীর কারণে, আর ভারতে খেলতে হবে ৭ নম্বরে; বাকিগুলোতে সুযোগ পাবে।

তবু ব্যাটসম্যান মুশফিক কেন বিকশিত হতে এতোটা বিলম্বিত হলো? ইংল্যান্ড সফরে সে সুযোগ পায় স্পেশালাইজড ব্যাটসম্যান হিসেবেই। প্রস্তুতি ম্যাচে সাসেক্সের বিপক্ষে ৬৫ আর নর্দাম্পটনশায়ারের বিপক্ষে ১১৫ করে ব্রিটিশ মিডিয়ার সুনজরও আদায় করতে সমর্থ হয়েছিলো। সেই ব্রিটিশ মিডিয়া যারা টেস্টে বাংলাদেশের লজ্জাজনক পারফরম্যান্সে ক্ষুব্ধ হয়ে সরাসরি নিউজ করেছিলো- বাংলাদেশকে লর্ডস মাঠের আশপাশেও ঢুকতে দেয়া উচিত হয়নি। প্রথম ইনিংসে মাত্র ২ জন ব্যাটসম্যান ডাবল ফিগারে পৌঁছাতে সমর্থ হয়েছিলো; মুশফিক ছিলো তাদের একজন।

তবুও মুশফিকের বিলম্বিত বিকাশের ক্ষেত্রে প্রধান কারণ মনে হয়, পাইলটকে বাদ দিয়ে তাকে মুল কিপার হিসেবে খেলানো শুরু করা। পাইলট অবশ্যই আহামরি কোনো ব্যাটসম্যান ছিলো না, বাদ সে পড়তোই; কিন্তু মুশফিকের তখন বয়স খুবই কম, তার ধ্যানজ্ঞান একটাই- দলে জায়গা ধরে রাখতে হবে। জেনুইন ব্যাটসম্যান হিসেবেই সে টিকে যেতে পারে এই বিশ্বাসই হয়তোবা ছিলো না; উইকেটকিপিংটাই মাথায় এসেছে টিকে থাকার অবলম্বন হিসেবে। এবং মুশফিক হলো সেই ধরনের মানুষ, যাদের মাথায় একবার কিছু ঢুকে পড়লে সেটা মুছে ফেলতে অন্যদের দম বেরিয়ে যাওয়ার দশা হয়। মেন্টাল ব্লক কাটানো এদের পক্ষে যথেষ্ট কঠিন।

আরো ৬ বছর ক্যারিয়ার লম্বা হবে ধরে নিয়ে মুশফিক তার ক্যারিয়ারের তৃতীয় অধ্যায়টা নতুনভাবে লিখতেই পারে। সে তিন নম্বরে উঠে আসুক। লিটনের মতো তার ব্যাটিং দৃষ্টিনন্দন নয়, তামিমের মতো এলিগ্যান্স কম, তার ব্যাটিং একদম পারফেক্ট কপিবুক ক্রিকেট, তবু সক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের নিউক্লিয়াস হওয়ার জন্য সে-ই সম্ভবত যোগ্যতম ব্যক্তি। তামিম অনেকদিন ধরেই এককভাবে ব্যাটিংয়ের ভার বহন করছে, সেটা নিয়ে তামিমের সাথে একটা হেলদি কম্পিটিশন যদি হয়েই যায়, তাতে দলের জন্যই ভালো। একারণেই মুশফিক শুনলে দুটো শব্দ মাথায় আসে ঘুরেফিরে- মোস্ট ফিট আর মোস্ট ট্রিট।

টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান মুশফিক; ট্রিপল সেঞ্চুরি যদি কেউ করে কোনোদিন সেটাও মুশফিক হবারই সম্ভাবনা বেশি। (তাকে শুধু বলতে হবে, তোমার কি ট্রিপল সেঞ্চুরি করার যোগ্যতা আছে?) সেটা যদি নাও হয়, টেস্টে অন্তত পাঁচটা ডাবল সেঞ্চুরি না করে অবসরে গেলে থ্রিডি ইফেক্ট শেষ পর্যন্ত আগডুম-বাগডুম ছাড়া কিছুই না। ওয়াসিম আকরাম যদি ২৫৭ করে, জেসন গিলেস্পি যদি ২০১ করে, মুশফিক একটামাত্র ফিনফিনে ২০০ নিয়ে বসে থাকলে চলবে?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।