মুমতাজ: ৭০ দশকের সেরা

শাহরুখ খানের শৈশব তখনো পেরোয়নি। সিনেমার পোকা ছিলেন, পর্দায় যাকে ভাল লাগতো তাঁরই অনুকরণ করতেন। সবচেয়ে বেশি করতেন, সেকালের সবচেয়ে বড় সুপার হিরোইনের।

তাঁর নাম মুমতাজ। ৬০ ও ৭০ দশকের অবিসংবাদিত সেরা নায়িকা। মুমতাজ শব্দটির অর্থ হল ‘সেরা’। নামের স্বার্থকতা রেখেছিলেন মুমতাজ। তিনি সত্যি ছিলেন তাঁর সময়ের সেরা।

জন্ম ১৯৪৭ সালের ৩১ জুলাই। আফগান বংশদ্ভুত শুকনো ফল বিক্রেতা আব্দুল সালিম আসকারি ও শাদি হাবিব আঘার ঘরে যখন তাঁর জন্ম হয়, তখন ভারতবর্ষ স্বাধীনতা থেকে মাত্র ১৫ দিন দূরে দাঁড়িয়ে আছে। নি:সন্দেহে জন্মেই দেশের জন্য সৌভাগ্য বয়ে এনেছিলেন তিনি।

যদিও, নিজের শৈশবটা মোটেও আনন্দময় ছিল না তাঁর।  জন্মের মাত্র এক বছরের মাথায় বাবা-মা’র ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। মায়ের সাথে তিনি চলে আসেন নানাবাড়ি। বড় হান নানী আর খালাদের সাথে।

পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব ভাল ছিল না। তাই, শৈশব থেকেই আয়ের পথ খুঁজতে হয়েছিল মুমতাজকে। শুরু করে জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে, সিনেমায় এক্সট্রার কাজ করতেন।

মুমতাজকে ‍রুপালি দুনিয়ায় আনেন বড় বোন মাল্লিকা। তিনিও অভিনেত্রী ছিলেন। তবে, কুস্তিগির ও অভিনেতা সর্দার সিং রানধাওয়াকে বিয়ে করে তিনি বলিউডকে বিদায় জানান। এই মাল্লিকা-রানধাওয়ার ছেলে হলেন শাদ রানধাওয়া। তিনি একালে ‘ওহ লামহে’, ‘আওয়ারাপান, ‘আশিকি ২’, ‘এক ভিলেন’ কিংবা ‘হেট স্টোরি ৪’-এর মত সিনেমা করেছেন।

১৯৫২ সালে ‘সংস্কার’ সিনেমায় শিশু শিল্পী হিসেবে প্রথম দেখা যায় মুমতাজকে। এরপর ১৯৫৫ সালের ‘ইয়াসমিন’, ১৯৫৮ সালের ‘লাজওয়ান্তি’ ও ‘সোনে কি চিড়িয়া’ সিনেমায় শিশু শিল্পীর কাজ করেন তিনি। যৌবনে তাঁর প্রথম কাজ ও. পি রালহানের ‘গ্যাহরা দাগ’।

যদিও এরপরই ক্যারিয়ারের পথ থেকে সরে যেতে থাকেন। পেটের দায়ে ‘বি গ্রেড’ সিনেমাতেও নাম লেখাতে হয়। বোনের ভাসুর কুস্তিগীর দারা সিংয়ের বিপরীতে ১৬ টি সিনেমা করেছিলেন মুমতাজ। ‘ফওলাদ’, ‘টারজান কামস টু দিল্লী’ ‘সিকান্দার ই আজম’, ‘রাকা’ কিংবা ‘ডাকু মঙ্গল সিং’-এর কল্যানে মুমতাজের নামের সাথে জুড়ে গিয়েছিল ‘স্টান্ট ফিল্ম হিরোইন’-এর তকমা।

মুমতাজ ও দারা সিং

আড়ালে কেউ কেউ খোঁচা দিয়ে দারা সিংয়ের নায়িকা বলেও ডাকতো। কোনোক্রমে মূল ধারায় নাম লেখানোর সুযোগ খুঁজছিলেন মুমতাজ। সঠিক পথে, বলা ভাল সুন্দর পথে ফিরে আসেন ১৯৬৯ সালে।

সেবার রাজেশ খান্নার বিপরীতে মুমতাজ করেন ‘দো রাস্তে’।  সিনেমাটি আকাশ ছোঁয়া সাফল্য পায়। ব্লক বাস্টারের সাথে ইন্ডাস্ট্রি পায় নিজেদের প্রথম সুপার স্টার – রাজেশ খান্না। মুমতাজের খ্যাতিও আকাশ ছুঁয়ে যায়।

মুমতাজ ও রাজেশ খান্না

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। সামান্য একজন এক্সট্রা শিল্পী হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিতে আসা তরুনীটি তখন সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া নায়িকা। ফ্যাশন সেন্স, এক্সপ্রেশন, প্রতিভা, সৌন্দর্য্য – কি ছিল না তাঁর মাঝে।

মুমতাজ তাঁর ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি সফল ছিলেন রাজেশ খান্নার বিপরীতেই। দু’জন মিলে উপহার দিয়েছেন ১০ টি হিট সিনেমা। তবে, ইচ্ছা করেই ক্যারিয়ারটা খুব বেশি লম্বা করেননি মুমতাজ। ১৯৭৪ সালে তিনি বিয়ে করেন ব্যবসায়ী ময়ূর মাধভানিকে। ব্যস, টাটা বাই বাই বলে দেন বলিউডকে।

দেব আনন্দর সাথে মুমতাজ

বিয়ের পর নায়িকা হিসেবে তাঁর শেষ সিনেমা ‍মুক্তি পায় ১৯৭৭ সালে। ১৩ বছর পর অবশ্য মায়ের রোল নিয়ে ফিরেছিলেন ‘আন্ধিয়া’ সিনেমায়। বড় পর্দায় সেবারই শেষবারের মত দেখা যায় তাঁকে। এই সিনেমাটি অবশ্য বিখ্যাত আরেকটি কারণে। এই সিনেমাটি দিয়েই যে বলিউডে পা রেখেছিলেন টালিউডের কিংবদন্তি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।

সিনেমা থেকে দূরে থাকার একটা কারণ সম্ভবত ক্যান্সার। বয়স যখন ৫০ ছুঁই ছুঁই তখন শরীরে বাসা বেঁধেছিল স্তন ক্যান্সার। কেমো থেরাপি দিয়ে, ওজন কমিয়ে ক্যান্সারের বিষ দূর করেছেন।

এখনকার মুমতাজ

মুমতাজের বসবাস এখন লন্ডনে। এখনো মাঝে মাঝে নানা রকম অ্যাওয়ার্ড নাইটে হাজির হন তিনি। তার দুই মেয়ে নাতাশা ও তানিয়া। নাতাশা হলেন অভিনেতা ফারদিন খানের স্ত্রী। ফারদিন খান হলেন কিংবদন্তিতুল্য অভিনেতা ফিরোজ খানের ছেলে। ফিরোজ খানের বিপরীতে মুমতার মেলা (১৯৭১), অপরাধ (১৯৭২) কিংবা নাগিন (১৯৭৬)-এর মত সিনেমা করেছেন।

– ডেইলি ভাস্কর ও ফ্রি প্রেস জার্নাল অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।