মুখার্জী দার বউ: ভালবাসায় গলদ, নাকি ইগোর লড়াই?

দূর থেকে আমরা কি আসলেই অন্যের সুখ কিংবা দুঃখ অনুভব করতে পারি?

ব্যাপারটা এতো সহজ না। সহজ হলে তো আজকের এই লেখা লিখতে হতো না কিংবা মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং নিয়ে সিনেমা, নাটক, গল্প, উপন্যাস এমনকি বাস্তব জীবনেও এতো ঝুট ঝামেলা থাকতো না। এসব নিয়ে শুরু হয় মান অভিমান যা গিয়ে শেষ হয় ঝগড়া/যুদ্ধে। তেমনি আমাদের বাঙালির ঘরের সবচেয়ে কমন একটা ইস্যু হলো বৌ শ্বাশুড়ির যুদ্ধ।

শাশুড়ি-বউমার গল্প মানেই সিরিয়াল হিট। বউমা-শাশুড়ির ঝগড়া মানেই ড্রইংরুম হট। ছেলেমেয়েকে স্কুলে ছাড়তে গিয়ে কিংবা দুপুরে অফিস ক্যান্টিনে শাশুড়িকে নিয়ে গসিপ করেন না এমন খুব কম জনই আছেন। আমার বউমা রূপে লক্ষ্মী গুণে অমায়িক – এরকম ক’জনই বা বলেন। কিংবা শাশুড়ি আমার মায়ের মতো..এই কথাও কি সকলে জোর গলায় বলতে পারেন? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পারেননা। কোথাও একটা গলদ থেকে যায়। গলদটা কি ভালোবাসায়, নাকি ইগোর লড়াই?

 

রোজই আমরা বলি সিরিয়ালে শাশুড়ি-বউমার লড়াই আর দেখা যাচ্ছেনা, কিন্তু তবু সেই সিরিয়াল গিলেই চলেছে আমাদের ড্রয়িং রুম। কেন দেখে আমাদের ড্রয়িং রুম, এর উত্তর কিন্তু আমাদের কাছে নেই অথবা আমরা খুঁজে দেখার সেই তাগিদটা অনুভব করিনি। তবে বদলেছে সময়। বদলেছে ভাবনা। শাশুড়ি-বউমার মনকষাকষি, ঝামেলা আর না বলা কথা নিয়ে এসেছে সিনেমা। নাম ‘মুখার্জী দার বউ’।

ছোট ছোট সম্পর্কের ভালোলাগার বা মান-অভিমান-দ্বন্দ্বের মুক্তোগুলোকে অসাধারণ যত্ন ও নিপুণতার সাথে বুনেছেন পরিচালক পৃথা চক্রবর্তী এবং কাহিনীকার সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়। নন্দিতা-শিবপ্রসাদের উইন্ডোজ প্রডাকশনের সিনেমা মানেই আটপৌরে জীবনের গল্পগুলোকে একটা নতুন চোখে দেখা বা নিজেদেরকেই আয়নায় নতুনভাবে চিনতে পারা। মুখার্জী দার বউ – উইন্ডোজের সেই ট্র্যাডিশন যে ধরে রাখতে পেরেছে তা বলাই বাহুল্য।

গল্পের শুরু কেন্দ্রীয় চরিত্র অদিতি’র (কনীনিকা ব্যানার্জী) শ্বশুরের মৃত্যুর পর। সম্পর্কের তিক্ততা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে অদিতির সাথে তার শ্বাশুড়ি শোভারানির (অনসূয়া মজুমদার)। অদিতি রাতে স্বামীর সঙ্গে নিমন্ত্রণ থেকে ফিরলে দেখেন শ্বাশুড়ি অজানা রাগের কারণে খাওয়া দাওয়া না করেই বসে আছেন।

ভয় লাগছে বলে প্রতি রাত্রে অদিতিকে নিজের কাছে শোওয়ানো, ছেলের ছোটবেলার ছবি খোঁজার নাম করে বৌমার আলমারী ঘাঁটা – কিংবা টিভির চ্যানেল চেঞ্জ করে নিজের পছন্দের সিরিয়াল দেখতে শুরু করা – অদিতির অনুমতির অপেক্ষা না করেই। এই সব ঘটনা শ্বাশুড়ি বৌমার তিক্ততা বাড়িয়েই চলে। দর্শকের স্বাভাবিক বোধ যেখানে আধুনিক অদিতিকে স্বামীর সাথে আলাদা করে শোভারানিকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোরই পথ দেখায় সেখানে সম্রাজ্ঞী বন্দোপাধ্যায় তাঁর গল্পে দেখালেন অন্য কিছু।

যার অপেক্ষা এতোদিনেও এতো সিরিয়াল নাটকেও কেউ সেভাবে দেখান নি। বৌ শ্বাশুড়ির যুদ্ধই শুধু দেখিয়ে গেছেন সবাই, কিন্তু তা থেকে উত্তরনের পথ কেউ দেখায় নি। সেই উত্তরনের পথ দেখালেন পৃথা চক্রবর্তী আর সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়। দেখালেন, ‘how to understand each other by putting yourself in others shoes.’

শেষে শুধু একটা কথা বলি শুধু মাত্র বৌ শ্বাশুড়ির সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, জীবনেরসব সম্পর্কের ক্ষেত্রেই যদি অন্য কে বুঝতে চান তবে তার জায়গায় নিজেকে ভাবুন। দেখবেন সমাধান চলে এসেছে। হিউম্যান সাইকোলজির হিসেবেই মানুষ নিজেদের মতো করে ভাবতে পছন্দ করে। যেখানে সে শুধু নিজেকেই দেখতে পায়, অন্য কে কদাচিৎ ধোঁয়াশা দেখা যায়। এবার না হয় অন্যের জায়গায় নিজেকে ভেবে দেখার সময় এসেছে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।