মিস্টার বাংলাদেশ: আমাদের ‘ডার্ক’ সুপারহিরো

কয়েক বছর আগে একটি টিভি সিরিজ আমি নিয়মিত দেখতাম, তার নাম ‘অ্যারো’। বখে যাওয়া মিলিওনিয়ার অলিভার কুইন মৃত্যুর পাঁচ বছর পর নিজের শহরে ফিরে এসেছে এক মুখোশ পরা আগন্তুকের বেশে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার সবুজ হুড পরে, ভয়েসকে মডুলেট করে তীর-ধনুক নিয়ে রুখে দাঁড়ানো উপভোগ করতাম।

‘ভিজিলান্টি’ ক্যারেকটারের অলিভারকে তাই বেশ লাগতো আমার কাছে। কিংবা এর আগের ক্রিস্টোফার নোলানের ব্যাটম্যানের কথা ভাবা যায়। ডার্ক সুপারহিরো থিম। নায়কের কোন সুপার ন্যাচারাল পাওয়ার নেই, আছে একবুক সাহস, আর অসাধারন রিফ্লেক্স এবং জানা আছে লড়াই করার কিছু কৌশল।

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মধুমিতা সিনেমাহলে প্রিমিয়ার শো’য় ‘মিস্টার বাংলাদেশ’ যখন দেখছিলাম তখন আমার এই ক্যারেক্টারগুলোর কথা মনে পড়ছিল। মনে হচ্ছিল আমরা বোধহয় একজন আমাদের ‘ডার্ক’ সুপারহিরো পেয়ে গেছি। যার বুকে আছে বাংলাদেশ, দেশপ্রেমের শক্তিতে যে সাধারন মানুষ হয়ে ওঠে ‘মিস্টার বাংলাদেশ’।

আমাদের দেশে ডার্ক থ্রিলার বানানোর কারিগর বোধহয় খুব কম। আরো রয়েছে যথাযথ চিত্রনাট্য লেখার লেখকের অভাব। সবমিলিয়ে এমন থিমের ওপর কাজ করা, কিংবা একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানিয়ে ফেলা বেশ কঠিন। সে কঠিন কাজটিই করেছেন খিজির হায়াত খান। তার প্রযোজনায় আবু আকতারুল ইমানের পরিচালনায় নির্মিত হয়েছে ‘মিস্টার বাংলাদেশ’। ‘জাগো’ নির্মাণ করে তিনি আলোচনায় এসেছিলেন, মোটামুটি দীর্ঘ বিরতির পর তিনি নায়ক হিসেবে এলেন ‘মিস্টার বাংলাদেশ’ নিয়ে।

ছবির মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে জঙ্গীবাদ ইস্যুকে নিয়ে। নায়কের জীবনে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা তাকে ‘ডার্ক’ সুপারহিরো হতে উদ্বুদ্ধ করে। স্পর্শকাতর এ বিষয় নিয়ে কাজ করতে হলে বেশকিছু দিক মাথায় রাখতে হয়, গল্পের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দিতে হয়, সবশেষে দর্শকের জন্য টুইস্টের দরকার হয়। ছবিটিতে সীমিত সামর্থ্যের মাঝেও তা দেয়ার চেষ্টা করেছেন নির্মাতা।

ছবির গানগুলো শ্রুতিমধুর ছিল। বিশেষ করে কুমার বিশ্বজিৎ’র কণ্ঠে ‘তুমি যে আমার’ গানে নায়ক খিজির হায়াত খান ও নায়িকা শানারেই দেবী শানু বেশ রোমান্টিক ছিলেন। একটি গানের মাধ্যমে সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বিবৃত হয়েছে। গানটি তাই সিনেমার গল্পে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে।

জঙ্গীবাদ ইস্যু নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রে ইস্যুটাকে আরেকটু গভীরভাবে তুলে ধরার সুযোগ ছিল। কিছু কিছু দৃশ্য আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। তরুণ প্রজন্মকে কিভাবে বিপথগামী করা হচ্ছে তা কিছুটা হলেও দেখিয়েছেন নির্মাতা। গল্পে একটা গতি ছিল, তবে আরো জমাট করার সুযোগ ছিলই। কোন ছবিই শতভাগ তৃপ্ত করতে পারেনা, একেকজনের দৃষ্টিভঙ্গি একেকরকম। তাই বলা চলে নির্মাতার দিক হতে তিনি যা বলতে চেয়েছেন তা বলতে পেরেছেন।

অভিনেতা হিসেবে খিজির হায়াত খান ভালো করেছেন। তার গেটআপগুলো ভাল ছিল। তবে তার একটি রোলের ব্যাপ্তি কম মনে হয়েছে, যা নিয়ে বেশ ভালো কাজ করা যেত। ওভারঅল তিনি চরিত্রের জন্য মানানসই।

শানারেই দেবী শানু ছিলেন প্রথম লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার। প্রায় এক যুগের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি চলচ্চিত্রে এসেছেন। তার অভিনয়ে তাই কোন জড়তা ছিল না, সাবলিল অভিনয় করেছেন তিনি। নায়কের সাথে তার রসায়ন ভালো ছিল। বড়পর্দায় শানুকে দেখা ছিল অন্যতম পাওয়া।

তবে সব আলো কেড়ে নিয়েছেন একজন। তিনি শাহরিয়ার ফেরদৌস সজিব। নেতিবাচক চরিত্রে তার সাবলিল অভিনয়, প্রয়োজনীয় অভিব্যক্তি তাকেই চলচ্চিত্রটির সেরা অভিনয় শিল্পীরূপে তুলে ধরেছে। তাকে নিয়মিত চলচ্চিত্রে দেখা যাবে বলে আশা করছি।

ছবিতে একজন বিদেশীনি ছিলেন। ম্যারিয়ন স্বনামে অভিনয় করেছেন, তার কণ্ঠে বাংলা শোনা বেশ তৃপ্তির ছিল। দর্শক তার চরিত্রকে লুফে নেবে নিশ্চিত। অন্যান্য চরিত্রে ইউটিউবার শামিম সরকার, টাইগার রবি, সোলায়মান সুখন, ওয়াহিদসহ অন্যরা যার যার মতো কাজ করেছেন। তবে সোলায়মান সুখনের চরিত্রটি সম্ভবত মানানসই ছিল না।

পরিচালক আবু আকতারুল ইমানের এটি প্রথম চলচ্চিত্র। তিনি প্রথম কাজ হিসেবে খুব যে খারাপ করেছেন তা বলা যাবেনা, তবে চিত্রনাট্যে আরেকটু যত্নবান হওয়া যেত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন থিম নিয়ে কাজ করা হচ্ছে এটাই বেশ সুখের বিষয়। কাজ করতে করতে আরো ভালো কিছু উপহার দেবেন এ জাতীয় ছবির নির্মাতারা এমনটাই আশা করছি।

এ জাতীয় ছবিকে উৎসাহ দেয়ার জন্য, খিজির হায়াত খানসহ পুরো ইউনিটের কষ্টকে স্বার্থক করার জন্য ছবিটি আমাদের সিনেমাহলে গিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবেই না তারা এমন ছবি নিয়মিত বানাতে চাইবেন, দর্শকের চাহিদা টের পাবেন।

পরিশেষে বলা চলে এ ছবিটি সম্পূর্ণ বাংলাদেশি, মেইড ইন বাংলাদেশ। বাংলাদেশের কলা-কুশলীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে নির্মিত হয়েছে আমাদের প্রথম ‘ডার্ক’ সুপারহিরো চলচ্চিত্র ‘মিস্টার বাংলাদেশ’। খুব সহজেই ছবিটির সিক্যুয়েল হতে পারে। প্রযোজক খিজির হায়াত খান বিষয়টা ভেবে দেখতে পারেন। অন্য কোন সামাজিক ইস্যু নিয়ে ‘মিস্টার বাংলাদেশ’ ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে মিশনে। আমরাও গর্ব করে বলতে পারব, তোমাদের আছে ‘ব্যাটম্যান’ আমাদের আছে ‘মিস্টার বাংলাদেশ’।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।