উমা: জীবনের লড়াই ও একটি জমকালো উৎসবের বেদনা

প্রত্যেক পরিচালকই সবসময় সৎভাবে, নিষ্ঠার সাথে ও প্রচুর পরিশ্রম করে ছবি তৈরী করেন এবং যখন সেই ছবি দেখার পর দর্শকদের মনকে স্পর্শ করে যার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা হয়ে ওঠে দুর্বোধ্য তখন আমার মতে সেই ছবিকে আর শুধু ‘ছবি’ বলা ঠিক নয় বরং বলা উচিৎ – ‘মাস্টারপিস’। হ্যাঁ, ‘উমা’ও ঠিক তেমনই একটা ছবি।

সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘জুলফিকার’ মোটামুটি লেগেছিল। তবে, সৃজিতের মানের একেবারেই নয়। তারপর খুবই খারাপ লেগেছিল ‘ইয়েতি অভিযান’। মনে মনে ভেবেছিলাম এত সব সুন্দর ছবি এর আগে উপহার দিয়েছেন এখন এই সব কি ছবি উনি দেখাচ্ছেন। খুব খুব রাগ হয়েছিল। এতটাই রাগ যে যখন ‘উমা’ ছবিটি এল, ফার্স্ট ডে শো সৃজিতের ছবি মিস করাতেও কোন আক্ষেপ হয়নি আমার। কিন্তু এখন এই মূহুর্তে খুব হচ্ছে। খুব আক্ষেপ যে কেন ফার্স্ট ডে শো মিস করলাম।

এই ছবিটি কানাডায় সেন্ট জর্জে নিকোল ওয়েলউডের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত। যিনি তাঁর ৭ বছরের ছেলে ইভান লেভেরসেজের জন্য ক্রিসমাস অক্টোবার মাসেই আয়োজন করেছিলেন। তাঁর ছেলের ব্রেন টিউমার ধরা পরে এবং ইভানের শেষ ইচ্ছেই ছিল যে শেষ বারের মতো ক্রিসমাস দেখার তাই তার মা নকল বরফ থেকে স্লেজগাড়ি, সান্তা ক্লজ সবই আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু, ছোট্ট ইভান ডিসেম্বরের শেষ অবধি বাঁচতে পারেনি। ছয় ডিসেম্বর, ২০১৫ সালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যায়।

যীশু সেনগুপ্ত (হিমাদ্রী সেন) , অঞ্জন দত্ত (ব্রহ্মানন্দ চক্রবর্তী) , রুদ্রনীল ঘোষ ( গোবিন্দ) , অনির্বাণ ভট্টাচার্য্য (মোহিতোষ সুর) – প্রত্যেকের অভিনয় আমার দুর্দান্ত লেগেছে। এমনকি একটা ছোট্ট দৃশ্যে মনোজের অভিনয়ও খুব খুব ভালো লাগে। সৃজিত  (ইন্দ্রনীল চৌধুরী) পরিচালনার পাশাপাশি এই ছবিতে অল্প হলেও চমৎকার অভিনয় করেছেন।

কিছু কিছু দৃশ্য এই ছবিতে ভুলতে পারব না। বিশেষ করে যখন হিমাদ্রী সুইটজারল্যান্ডের ডাক্তারের কাছ থেকে তার মেয়ের কঠিন অসুখের কথা জানতে পারে। যখন ব্রহ্মানন্দ হিমাদ্রীর কাছে একটা সুযোগ চায়। যখন গোবিন্দ বুঝিয়ে দেয় যে স্বপ্নের চেয়ে টাকা বড় নয়। যখন উমা মহিতোষকে প্রসাদ দিতে আসে।

উফ! কি অপূর্ব সব দৃশ্য। আর ছোট সারা সেনগুপ্ত ওই উমার চরিত্রে কি সুন্দর সাবলীল অভিনয় করেছে। একদিন ও ওর বাবার গর্বের কারণ হবে। নিশ্চিত খুব নাম করবে।

ছবিতে সুইটজারল্যান্ডের বেশ কিছু দৃশ্য দারুণভাবে ক্যামেরা বন্দী করা হয়েছে। অনুপম দার গানগুলো মন ছুঁয়ে যায় । ‘উড়ে যাক’, ‘হারিয়ে যাওয়ার গান’, ‘আলস্য’ বা ‘জাগো উমা’ প্রত্যেকটাই ভারি মিষ্টি গান। তবে আমার প্রিয় যে গানটি গায়ে কাঁটা দেয় ‘এসো বন্ধু’।

এই ছবি এক লড়াইয়ের গল্প বলে। লড়াই এক বাবার যে তার মেয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে চায়। এই লড়াই এক পরিচালকের যে শুটিং ছাড়াই তার পরিচালনায় এক মাস্টারপিস তৈরী করতে চায়। এই লড়াই আমি মনে করি পরিচালক সৃজিতের নিজের সঙ্গে যে – হ্যাঁ আমার গল্প বলা শেষ হয়ে যায়নি এখনো এবং আমি এখনও ভালো ছবি তৈরী করতে পারি।

এটা তীব্র বেদনামাখা এক উৎসবের গল্প। অনেক সমালোচক বলতেই পারেন যে ছবিটি দৈর্ঘ্য একটু বেশি। এই দৃশ্য, ওই দৃশ্য বাদ দেওয়া যেত। কিন্তু আমার কাছে এই ছবিটি শতভাগ আমার মনকে স্পর্শ করেছে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।