বলিউডে প্রত্যাখ্যাত, লাতিন আমেরিকায় বাজিমাৎ

সুযোগের একটা দরজা বন্ধ হয়ে গেলে নাকি আরেকটা খুলে যায়। অনেকটা প্রবাদের মতই এই কথাটা অনেক বলতে বলতে ক্লিশে হয়ে গেছে। তবে, প্রভাকর শরনের জীবনের সাথে এই কথাটা খুব ভালভাবেই মানিয়ে যায়।

বিহারে জন্ম নেওয়া প্রভাকরের এরই মধ্যে অভিষেক হয়ে গেছে লাতিন আমেরিকার বিনোদন জগতে। কোস্টারিকান সিনেমা ‘এনরেদাদোস: লা কনফিউশন’ সিনেমার সুবাদে তিনি লাতিন আমেরিকায় রীতিমত হটকেটে পরিণত হয়েছেন।

শরনই হলেন প্রথম ভারতীয় যিনি কোনো লাতিন আমেরিকান সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করলেন। আর এই সিনেমাটি ছিল ২০১৭ সালে দেশটির সবচেয়ে হিট সিনেমাগুলোর একটি।

বিহারের মতিহারিতে জন্ম নেওয়া শরনের জীবনের গল্পটা কোনো বলিউডি সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। তাঁর ক্যারিয়ার শুরু হয় বলিউডে ঢোকার স্বপ্ন নিয়ে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়েছেন, তবে কোনো লাভ হয়নি। বলিউডে তার জায়গা মেলেনি।

মনের দু:খ নিয়ে তিনি সবে ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখান থেকে যান কোস্টারিকায়। সেখানে গিয়ে তার প্রেম হয় এক কোস্টারিকানা নারীর সাথে। বিয়ে করে সেখানেই স্থায়ী হয়ে যান।

তবে, দুর্ভাগ্য যেন তার পিছু ছাড়ছিল না। ব্যবসা করার চেষ্টা করেছিলেন। সফল হতে পারেননি। তবে, মনের মধ্যে বড় অভিনেতা হওয়ার স্বপ্নটা টিকে ছিল। যদিও, সেই স্বপ্নকে ২০১০ সালে প্রায় জলাঞ্জলি দিয়ে ফেলতে হয়েছিল। কারণ, বনিবনা না হওয়ায় স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে আলাদা হয়ে যান।

তখন শরনের জীবনে রীতিমত ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। ভারতে ফিরে আসেন। আবারো ২০১৪ সালে ফেরেন কোস্টারিকায়। নিজের জীবনটা নিয়ন্ত্রনে আনার চেষ্টা। সেখানেই নিজের ‘বলিউড অভিষেক’-এর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।

তখনই শরনের জীবনে আসেন তেরেসা রদ্রিগেজ কার্দেস। তিনি একজন শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী, তার নিজের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে। শরনের জীবনে অনেকটা মেন্টর হয়ে আসেন তিনি। শরন বলেন, ‘ও আমার স্বপ্নটাকে নিজের মনে করেছে। আমার সিনেমার জন্য দেড় লাখ মিলিয়ন ডলার যোগাড় করতে আমাকে সাহায্য করেছে।’

বাকিটা ইতিহাস। স্প্যানিশ ভাষায় ‘এনরেদাদোস: লা কনফিউশন’ মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথেই করে বাজিমাৎ।

ভারতে নিয়োজিত কোস্টারিকান রাষ্ট্রদূত ম্যারিয়েলা ক্রুজও সিনেমাটি পছন্দ করেছেন। বলেছেন, ‘আমি খুবই গর্বিত যে, এমন একটা প্ল্যাটফরমে আমার দেশের সৌন্দর্য্য ফুটে উঠেছে। এটা শুধু কোস্টারিকায় নয়, সমগ্র লাতিন আমেরিকাতেই বলিউড স্টাইলে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র।’

আক্ষরিক অর্থেই শরনের সিনেমাটিতে আছে বলিউডে সিনেমার সকল মশলাই। সেখানে আছে অ্যাকশন দৃশ্য, অনন্য সব স্টান্ট আর নাচের দৃশ্য।

কোস্টারিকায় ভাল ব্যবসার পর নির্মাতারা এবার সিনেমাটিতে লাতিন আমেরিকার অনান্য দেশে এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও মুক্তি দিতে চান। ইংরেজি, হিন্দী এমনকি ভোজপুরি ভাষাতেও সিনেমাটির ডাবিং করা হয়েছে। সিনেমাটির ভারতীয় ভার্সনের নাম ‘এক চোর, দো মাস্তিখোর’। এর বাদে ডিস্ট্রিবিউটরদের সুবাদে সিনেমাটি কোস্টারিকা ছাড়াও পানামা, নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস, গুয়াতেমালও ও স্যান সালভাদোরে মুক্তি পেয়েছে।

সিনেমাটিতে শরন ছাড়াও শীর্ষ চরিত্রে আছেন সাবেক বিশ্ব রেসলিং চ্যাম্পিয়ন ও হলিউড অভিনেতা স্কট স্টেইনার। অক্ষয় কুমারের সিনেমা ‘খিলাড়ি ৭৮৬’ সিনেমার পরিচালক আশিষ মোহন শুরুতে সিনেমাটির পরিচালক ছিলেন। তিনি মাঝপথে শরনের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে চলে যান। বাকিটা সময় শরন নিজেই পরিচালনার কাজ করেন।

প্রভাকরের স্কুলিং হয় এখন ঝাড়খণ্ডের অন্তর্গত ভুরকুন্ডা ও রামনগরে। রোহটাক গিয়েছিলেন কলেজে পড়তে। এরপর উচ্চশিক্ষা নেন কোস্টারিকাতেই। স্বপ্ন বড় থাকলে কি না হয়। সত্যি, প্রভাকর শরনের গল্পটা রূপকথাকেও হার মানায়!

– বিয়িং ইন্ডিয়ান অবলম্বনে 

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।