সর্বকালের সবচেয়ে বেশি আয় করা সিনেমা

মানুষ সিনেমা কেন দেখে? সহজ ভাষায় উত্তর দিতে গেলে বলতে হয় বিনোদন পাবার জন্য।

এখন যদি প্রশ্ন করা হয় মানুষ সিনেমা তৈরী করে কেন তাহলে এটার উত্তরও হওয়া উচিত অন্যকে বিনোদন দেবার জন্য।

কিন্তু নির্মম হলেও সত্য যে বেশির ভাগ চিত্র নির্মাতারাই এই কারণে সিনেমা বানান না। অনেক পরিচালক সিনেমা বানায় নিজের আনন্দের জন্য, অনেকে হয়তো সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। তবে বেশির ভাগ পরিচালকেরাই সিনেমা বানায় ব্যবসার জন্য। যেহেতু ব্যবসার জন্য দর্শক প্রয়োজন তাই তাঁরা চেষ্টা করে সিনেমাটা যেন সবচেয়ে বেশি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। একারণে অন্যকে বিনোদন দেবার উদ্দেশ্য থাকলেও মুল উদ্দেশ্য থাকে টাকা অর্জন করা।

বিষয়টা অযৌক্তিকও নয়। একটা সিনেমার পেছনে লগ্নি থাকা অনেক টাকা। এই শিল্পকে জড়িয়ে আছে অনেক পেশাজীবি মানুষ। কাজেই যিনি কিংবা যারা টাকা লগ্নি করবেন তারা যদি প্রয়োজনীয় টাকা তুলে আনতে না পারে তাহলে পরের সিনেমা তৈরী করার মূলধন ফিরে পাওয়াটাই কষ্টকর হয়ে যাবে।

আমির খানের দঙ্গল ভারতের সবচেয়ে ব্যবসা সফল সিনেমা

এককালে সিনেমা থেকে টাকা আয় করার মূল খাত ছিল সিনেমা হলের টিকেট বিক্রি। মানুষ যত বেশি দেখবে, সিনেমা তত বেশী হিট হবে, টাকা উপার্জনও তত বেশী হবে। একারণে পরিচালক কিংবা প্রযোজকদের লক্ষ্য থাকতোযত বেশি সিনেমা হলে মুক্তি দেওয়া সম্ভব সেটা নিশ্চিত করা। এরপর যদি সেটা দর্শক প্রিয় হতো তাহলে বেশিদিন সিনেমা হলে চলতো।

বর্তমানেও এই ধারা প্রচলিত আছে। তবে এর সাথে সাথে আরো কিছু বাড়তি জিনিস যুক্ত হয়েছে। অনেক দিন ধরেই বলিউড সিনেমার অডিও গান একটা ভালো আয়ের খাত। একটা সিনেমার গানইঅনেক সময়ে এর পুরো লগ্নি উঠিয়ে আনতে সক্ষম। এছাড়া টিভি স্বত্ব, ডিভিডি স্বত্ব, বৈদেশিক আয় – এমন আরো কিছু খাত থেকেও বর্তমানে টাকা আয় হয়।

এই সব খাতকে মাথায় রেখেই আইএমডিবি থেকে ২০১৭ সালে বলিউডের সর্বকালের সবচেয়ে ব্যসাসফল সিনেমার তালিকা প্রকাশ করেছে। যেহেতু আমাদের উপমহাদেশে ভারতীয় সিনেমার একটু জনপ্রিয় সেজন্য প্রথমে ভারতের সর্বকালের সবচেয়ে ব্যবসা সফল দশটি সিনেমার তালিকাটা একটু দেখা যাক।

তিন খানের সিনেমা বরাবরই ব্যবসায়িক সাফল্যের শীর্ষে থাকে
  • ভারতের সর্বকালের সবচেয়ে ব্যবসাসফল দশটি সিনেমা (আইএমডিবির বিবেচনায়)
সিনেমা মুক্তির সাল

ভাষা

বাহুবলি ২ ২০১৭ তেলেগু
দাঙ্গাল ২০১৬ হিন্দি
পিকে ২০১৪ হিন্দি
বাহুবলি ১ ২০১৫ তেলেগু
বাজরাঙ্গি ভাইজান ২০১৫ হিন্দি
ধুম ৩ ২০১৩ হিন্দি
সুলতান ২০১৬ হিন্দি
কাবালি ২০১৬ তামিল
প্রেম রতন ধন পায়ো ২০১৫ হিন্দি
চেন্নাই এক্সপ্রেস ২০১৩ হিন্দি
  • সর্বকালের সেরা ব্যবসা সফল ১০ টি সিনেমা
সিনেমা মুক্তির বছর Original Gross
অ্যাভাটার ২০০৯ ২.৭৮৮ বিলিয়ন ডলার
টাইটানিক ১৯৯৭ ২.১৮৬ বিলিয়ন ডলার
স্টার ওয়ার্স: দ্য ফোর্স অ্যওকেন ২০১৫ ২.০৬৮ বিলিয়ন ডলার
জুরাসিক ওয়ার্ল্ড ২০১৫ ১.৬৭০ বিলিয়ন ডলার
দ্য অ্যাভেঞ্জার্স ২০১২ ১.৫১৯ বিলিয়ন ডলার
ফিউরিয়াস ৭ ২০১৫ ১.৫১৬ বিলিয়ন ডলার
অ্যাভেঞ্জার্স: এজ অব আলট্রন ২০১৫ ১.৪০৫ বিলিয়ন ডলার
হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ডেথলি হলোস পার্ট ২ ২০১১ ১.৩৪১ বিলিয়ন ডলার
ফ্রোজেন ২০১৩ ১.২৭৬ বিলিয়ন ডলার
আয়রন ম্যান ৩ ২০১৩ ১.২১৫ বিলিয়ন ডলার

এখানে একটা বিষয় লক্ষ্য করলে বুঝতে পারা যায় যে ব্যবসা সফল সিনেমাগুলোর মাঝে একমাত্র টাইটানিক বাদে সবগুলোই বিংশশতাব্দীর। এর কারণটাও অজানা নয়। বর্তমান বাজারে সবকিছুরই মূল্য বেড়েছে। টিকিটের দাম কিংবা স্বত্ব যাই বলা হোক না কেন সেটা উনবিংশ শতাব্দীর সাথে তুলনামূলক বিচারে অনেক বেশী।

উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় ১৯৮০ সালে যদি টিকেটের দাম থাকতো ৭০ টাকা তাহলে বর্তমানে সেই টিকেটের দাম হয়তো ৩০০ টাকা। তাহলে ২০১৮ সালে ১০ টা টিকেট কেনার জন্য যদি ৩০০০ টাকার প্রয়োজন হয় তাহলে সেই ১০ টা টিকেট বিক্রি করেই১৯৮০ সালে পাওয়া যেত মাত্র ৭০০ টাকা। কাজেই তুলনামূলক বিচারে আগের যুগের সিনেমাগুলো সবসময়েই পিছিয়েই যাবে।

সবচেয়ে বেশি সময় ধরে প্রেক্ষাগৃহে থাকার পরেও অবস্থান ১৭ নম্বরে ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’

এইকারণে তুলনাটা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য তুলনামূলক বিশ্লেষনের সময়ে চলচিত্র বিশ্লেষকেরা মূদ্রাস্ফীতি ব্যবহার করে থাকে।

  • মূদ্রাস্ফীতি কি?

একই পণ্য কিংবা সেবার মূল্য যখন সময়ের ব্যবধানের কারণে বেড়ে যায় তখন মূল্যস্ফীতি ঘটে।অর্থনীতিবিদরা এই বিষয়টা মাথায় রেখেই মূদ্রাস্ফীতি সূত্রের প্রবর্তন করেছেন।

এর মানে হচ্ছে ১৯৩০ সালে যে জিনিসটা ১০ টাকায় বিক্রি হতো সেই একই জিনিস ২০১৮ সালে নিশ্চয়ই একই টাকায় বিক্রি হবে না। একারণে সিনেমা বিশেষজ্ঞরা আর্থিক লাভ ক্ষতির হিসেব করার সময় এই মুদ্রাস্ফীতির বিষয়টা মাথায় রাখে।

এইসূত্র ব্যবহার করে ১৯৩০ সালে যে জিনিসটা ৫০ টাকায় বিক্রি হতো সেটা ২০১৮ সালে কত মূল্যের হতে পারে তার একটা ধারণা বের করা সম্ভব।

  • বলিউডের সর্বকালের সবচেয়ে সফল দশটি সিনেমা (মূদ্রাস্ফীতি মাথায় রেখে)
সিনেমা মুক্তির সাল ভাষা মূদ্রাস্ফীতির হারে আয়
দাঙ্গাল ২০১৬ হিন্দি ১৯৪৩ কোটি রুপি
বাহুবলি ২ ২০১৭ তেলেগু ১৭০৭ কোটি রুপি
শোলে ১৯৭৫ হিন্দি ১৬৬৯ কোটি রুপি
মুঘল-ই-আজম ১৯৬০ হিন্দি ১৩৫৮ কোটি রুপি
মাদার ইন্ডিয়া ১৯৫৭ হিন্দি ১৩২৭ কোটি রুপি
ববি ১৯৭৩ হিন্দি ১২০১ কোটি রুপি
হাম আপকে হ্যায় কউন ১৯৯৪ হিন্দি ১১৫৮ কোটি রুপি
কিসমত ১৯৪৩ হিন্দি ১১৫৪ কোটি রুপি
গঙ্গা যমুনা ১৯৬১ হিন্দি ১০৯৬ কোটি রুপি
রতন ১৯৪৪ হিন্দি ৯৯১ কোটি রুপি
  • সর্বকালের সেরা ব্যবসা সফল ১০ টি সিনেমা (মূদ্রাস্ফীতি মাথায় রেখে)

সিনেমা

মুক্তির সাল আয় মূদ্রাস্ফীতির হারে আয়
গন উইদ দ্য উইন্ড ১৯৩৯ ১৯৮,৬৭৬,৪৫৯ ডলার ১,৬৮৫,০৫২,২০০ ডলার
স্টার ওয়ার্স ১৯৭৭ ৪৬০,৯৯৮,০০৭ ডলার ১,৪৮৫,৫১৭,৪০০ ডলার
দ্য সাউন্ড অব মিউজিক ১৯৬৫ ১৫৮,৬৭১,৩৬৮ ডলার ১,১৮৭,৭৪৪,২০০ ডলার
ইটি: দ্য এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল ১৯৮২ ৪৩৫,১১০,৫৫৪ ডলার ১,১৮৩,০৬৫,২০০ ডলার
টাইটানিক ১৯৯৭ ৬৫৮,৭৬২,৩০২ ডলার ১,১২৯,৮৫৭,১০০ ডলার
দ্য টেন কমান্ডমেন্টস ১৯৫৬ ৬৫,৫০০,০০০ ডলার ১,০৯২,৫৪০,০০০ ডলার
জওস ১৯৭৬ ২৬০,০০০,০০০ ডলার ১,০৬৮,১৭৭,৩০০ ডলার
ডক্টর জিভাগো ১৯৬৫ ১১১,৭২১,৯১০ ডলার ১,০৩৫,২৮৯,৭০০ ডলার
দ্য এক্সরসিস্ট ১৯৭৩ ২৩২,৯০৬,১৪৫ ডলার ৯২২,৩৯৭,১০০ ডলার
স্নো হোয়াইট অ্যান্ড দ্য সেভেন ডোয়ার্ফস ১৯৩৭ ১৮৪,৯২৫,৪৮৬ ডলার

৯০৯,০৬০,০০০ ডলার

বলিউডের সিনেমার তালিকা লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে সেখানে গত কয়েক দশক ধরে রাজত্ব করতে থাকা তিন খানের মধ্যে দুই খানের সিনেমা থাকলেও শাহরুখ খানের কোন সিনেমা জায়গা পায়নি। যদিও শাহরুখ খানের ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ সিনেমাটা ভারতের সিনেমা হলে সবচেয়ে বেশীদিন যাবত প্রদর্শিত হবার রেকর্ড গড়েছে। তবুও শেষ পর্যন্ত ব্যবসা সফল সিনেমার তালিকায় এর অবস্থান ১৭ নম্বরে।

সবচেয়ে বেশি আয় করা প্রথম দুটো সিনেমাই জেমস ক্যামেরুনের

সর্বকালের সবচেয়ে সফল সিনেমা গুলোর মাঝে প্রথম দুটিই বিখ্যাত চলচিত্র পরিচালক জেমস ক্যামেরুনের। তবে মূদ্রাস্ফীতির পর দেখা যাচ্ছে সেখানে আরেক বিখ্যাত পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গের দুটো সিনেমা জায়গা পেয়ে গিয়েছে। সেগুলো হল ইটি: দ্য এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল, জওস।

মূদ্রাস্ফীতির বিবেচনায় সর্বকালের সবচেয়ে ব্যবসা সফল সিনেমা হল ‘গন উইদ দ্য উইন্ড’। মার্গারেট মিশেলের রচিত বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উপর নির্মিত সিনেমাটি ১৯৪০ সালে মুক্তি প্রাপ্ত।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।