পুরস্কার নেবেন না ঠিক আছে, কিন্তু এমন আত্মঘাতী কথা কেন মোশাররফ ভাই?

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েও তা প্রত্যাখ্যান করেছেন মোশাররফ করিম। করতেই পারেন, অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ এর পেছনে শক্ত যুক্তি আছে তাঁর। যে চরিত্রটির কারণে ‘সেরা অভিনেতা কৌতুক চরিত্রে’ তিনি মনোনীত হয়েছেন, সেই চরিত্রটি নাকি কৌতুক চরিত্র নয়। এমন হলে পুরোপুরি ভুল বিচার হয়েছে। ক্যাটাগরিই ঠিক করতে পারেননি বিজ্ঞ বিচারকরা।

কোনটা কৌতুক চরিত্র, সেটা ঠিক করতে না পারলে পুরো পুরস্কার প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে। সে হিসেবে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে বলিষ্ঠ ভূমিকাই রেখেছেন দীর্ঘদিন ধরে আমাদের হাসির খোরাক দিয়ে যাওয়া প্রিয় মোশাররফ ভাই। কিন্তু ফেসবুকে তাঁর দেয়া পোস্টের একটি লাইনে চোখ আটকে গেছে। যেটা দেখে মনে হয়েছে, ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছেন তিনি। এবং এর সঙ্গে একমত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

তিনি তাঁর পোস্টের এক পর্যায়ে লিখেছেন, ‘মফিজুর চরিত্রটি কোনো কৌতুক চরিত্র নয়। এটি প্রধান চরিত্রগুলির একটি।” অর্থাৎ মোশাররফ করিম মনে করেন, কৌতুক চরিত্র কখনও প্রধান চরিত্র হতে পারে না। তাঁর এই কথায় মনে হয়েছে, এসব চরিত্র নাটক-সিনেমার সামান্যতম অংশ মাত্র। অথচ তিনি আজ মোশাররফ করিম হয়েছেন এই কমেডি দিয়েই। তাই খুব অবাক হয়েছি তাঁর এমন ভাবনা দেখে। আসলেই কি কৌতুক চরিত্র প্রধান চরিত্র হতে পারে না?

ভাই, আপনার কাছে জানতে ইচ্ছা করছে প্রধান চরিত্রটা তাহলে কী, এটা কেমন হয়। দুই-চার বছর থিয়েটার করার সুবাদে জেনেছি, নাটক-সিনেমায় নায়ক বলে কিছু নেই, এমন কিছু হয় না। কেন্দ্রীয় চরিত্রটাই প্রধান চরিত্র। সে চরিত্রটি নায়কেরও হতে পারে আবার খলনায়কেরও হতে পারে। অর্থাৎ, মূল বা কেন্দ্রীয় চরিত্র মানেই নায়ক নন।

প্রধান চরিত্রও যে কমেডিয়ান ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেতে পারেন, এতোদিন মঞ্চ করেও সেটা বুঝতে পারলেন না প্রিয় মোশাররফ ভাই! অবাক লাগছে। জিম ক্যারি, এডি মার্ফি, অ্যাডাম স্যান্ডলার, স্টিভ ক্যারেল, রোয়ান অ্যাটকিনসন কিংবা বেন স্টিলারদের নিশ্চয়ই দেখেছেন আপনি। তাঁরা যেসব সিনেমায় কাজ করেন, প্রধান চরিত্রে তাঁদেরকেই দেখা যায়। আর সেটাও কৌতুক অভিনেতা হিসেবে। এঁদের দেখেও আপনার এমন ভুল ধারণাটা কেন যায়নি, সেটা ভেবে বিস্মিত হচ্ছি।

মফিজুর চরিত্রটি কোনো কৌতুক চরিত্র নয়। এটি প্রধান চরিত্রগুলির একটি।’ আপনার এই কথাটা যদি ধরতে যাই, তাহলে বলতে হয়; এতোদিন আপনি কোনো কাজই করেননি। কারণ টিভি নাটকে আপনার বেশিরভাগ চরিত্র কৌতুক রসে ভরপুর, পুরোদস্তর কমেডিয়ান ছিলেন আপনি। তার মানে আপনি প্রধান চরিত্রে অভিনয়ই করেননি। করলেও পরিমাণে খুবই অল্প।

নায়ক বা প্রধান চরিত্র যে ভরপুর কৌতুক করতে পারেন, আপনিই তো সেটার বড় প্রমাণ। চঞ্চল চৌধুরী, জাহিদ হাসানরাও তেমনই। আপনি নাটকে প্রধান চরিত্র বা নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, কিন্তু মানুষকে হাসানোর প্রধান কাজটিও আপনি করেছেন; এমন শতশত নাটকে আপনাকে দেখা গেছে। আপনার বলা কথাটা দেখে মনে হচ্ছে, নিজের বিপক্ষেই কথা বলে ফেলেছেন আপনি। সবশেষে বলতে হচ্ছে, নাটকে অভিনয় করা নিজের বেশিরভাগ চরিত্রকে খাটো করেছেন আপনি।

কৌতুক অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া অভিনয় জগতের সবচেয়ে কঠিন কাজ। কারণ মানুষকে হাসানোর চেয়ে কঠিন কিছু দুনিয়ায় নেই। নায়ক বা প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেও সেই কাজটা আপনি দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন। এতোদিন পরে এসে আপনার এই ভাবনা কোত্থেকে এলো, ঠিক বুঝতে পারছি না।

যে কারণে আপনি নায়ক হতে পেরেছেন, সেই কারণটাকেই আপনি তুচ্ছ বানিয়ে ফেলেছেন এই একটি কথা দিয়ে। এরপরও আপনার পেছনে দেখছি শতশত মানুষ দৌড়াচ্ছে এবং আপনাকে সমর্থন দিয়ে বলে যাচ্ছে, ‘ঠিক করেছেন মোশাররফ ভাই। নিজের মান বাঁচিয়েছেন পুরস্কার না নিয়ে।’ অথচ তারা জানেই না, আপনি নিজের বিরুদ্ধে কতো বড় কথা বলে ফেলেছেন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।