মোনেম মুন্না ‘দ্য কিং ব্যাক’

‘মুন্নার মতো ফুটবলার এই দেশে ( বাংলাদেশ) জন্মেছে। তোমরা কেন পারবে না ভাই ?’

ব্রাদার্স ইউনিয়নে খেলার সময় টিম মিটিংয়ে ভারতীয় কোচ সৈয়দ নঈমুদ্দিনের মুখে কথাটি শুনেছি বহুবার। ভারতীয় দ্রোণাচার্য এই কোচ যেন অলক্ষ্যে মুন্নাকে পাশে বসিয়েই আমাদের সঙ্গে কথা বলতেন। উস্তাদের অধীনেই ১৯৯১ সালে ইস্টবেঙ্গলের জার্সিতে কলকাতা জয় করেছিলেন মুন্না ভাই।

সেই থেকেই মুন্নার প্রতি ভারতীয় জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও কোচের অগাধ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। মুন্নার নাম বলতে গিয়ে বর্ষীয়ান কোচের ভারি চোয়ালটা ঝুলে পড়তে দেখতাম আরও সামনে।

 

ভালোবেসে মুন্নাকে ‘দ্য কিং ব্যাক’ নামে বুকে আসন পেতে দিয়ে ছিলেন দেশের ফুটবল প্রেমীরা। বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ককে বোঝাতে ওই–ই তো যথেষ্ট! কিডনির জটিল রোগে ১৫ বছর আগে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেও এখনো সুরভী ছড়িয়ে যাওয়া একটি নাম মোনেম মুন্না। দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ফুটবলারের বিশেষ একটি জার্সি নিলামে উঠেছে ক’দিন আগে।

১৯৮৯ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশ লাল দলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ছিলেন মুন্না। সেই টুর্নামেন্টে পরে খেলা তাঁর ‘২’ নাম্বার জার্সিটিই নিলামে তোলা হয়। জার্সি বিক্রির পুরো অর্থ প্রদান করা হচ্ছে করোনায় অসহায় হয়ে পড়া মানুষদের সহযোগিতায়।

 

১৯৮৬ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপিয়েছেন মুন্না। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৯৫ সালে মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত চার জাতি ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতে বাংলাদেশ। ক্লাব ফুটবলে তিনি ছিলেন আবাহনী লিমিটেডের ঘরের ছেলে। ক্যারিয়ারের শুরুতে ১৩ নম্বর জার্সিতে খেললেও পরবর্তি সময়ে মুন্নার পরিচয় বহন করেছে ‘২’।

এটাই ছিল তাঁর সিগনেচার নাম্বার। বর্তমান প্রজন্মের কাছে হয়তো গুরুত্বহীন এই জার্সির আবেদন। সেজন্যই হয়তো মুন্নাকে নিয়ে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান বা মুশফিকুর রহিমের ব্যাট বিক্রির মতো উন্মাদনা নেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

নিলামে ওঠা সেই জার্সি

ইউরোপিয়ান ফুটবলে বুঁদ হয়ে থাকা দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে সাবেক ফুটবলার মুন্না অচেনাই থাকার কথা। তাদেরই বা দোষ কি! বিশ্ব ফুটবলের সঙ্গে যে বড্ড বেমানান দেশের ফুটবলের রুগ্ন চেহারাটা।

মুন্নার ফুটবল শৈলী বুঝানোর জন্য বাংলাদেশের সাবেক জার্মান কোচ অটো ফিস্টারের একটি মন্তব্যই যথেষ্ট, ‘মুন্না ওয়াজ মিসটেকেইনলি বর্ন ইন বাংলাদেশ।’ বাংলাদেশকে প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতানো ফিস্টার বর্তমানে আছেন সুইজারল্যান্ডে। ১৯৯৮ সালে সৌদি আরব ও ২০০৬ সালে টোগোর বিশ্বকাপ দলের কোচ ছিলেন। এর আগে সেনেগাল , আইভরিকোস্ট ও পরবর্তীতে সামলেছেন ক্যামেরুনের মতো বিশ্বমানের দলের দায়িত্ব।

ইস্ট বেঙ্গলে বাংলাদেশের তিন ফুটবলার (ওপর থেকে) – শেখ মোহাম্মদ আসলাম, মোনেম মুন্না ও রিজভি করিম রুমি।

ফুটবলের কত রথী মহারথীকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে তাঁর। তবু এই জার্মানের কাছে ফুটবলের তৃতীয় বিশ্বের বাংলাদেশের এক রক্ষণ সেনার মেধার কি কদর! আমার কাছে থেকে যেই শুনলেন নিলামে উঠবে মুন্নার বিখ্যাত দুই নাম্বার জার্সি, কণ্ঠে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো, ‘মুন্না মনে রাখার মতো একজন খেলোয়াড় ও নেতা। এই জন্যই তাঁর মতো একজন নায়কের জার্সি নিলামে উঠেছে। এটাই প্রমাণ করে সে কতটা জনপ্রিয় ছিল।’

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।