মহিন্দর অমরনাথের মত আমাদের ‘বাঞ্চ অব জোকার্স’ বলার কেউ নেই!

কিছু বলার ভাষা নেই।  অভিযোগ তোলারও রুচি নাই। নির্বাচকদের দল নির্বাচন প্রক্রিয়া দেখে আমার চূড়ান্ত আক্কেলগুড়ুম হলো এবার।

স্বাগতিক দল হিসেবে সিরিজের মাঝপথে দলে পরিবর্তন আনার একটা রেওয়াজ আছে। অ্যাশেজে প্রত্যেক টেস্টের আগে নতুন দল দেয় ইংল্যান্ড। ভারত কিংবা অন্যান্য দলও ওয়ানডে বা টেস্ট সিরিজে নিজেদের মাটিতে একটা বা দু’টো ম্যাচ করে দল ঘোষণা করে। কিন্তু, সামান্য একটা ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজে বারবার দলে পরিবর্তন আনাটা খুবই দৃষ্টিকটু ব্যাপার।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচকরা প্রথম দুই ম্যাচের জন্য একটা দল ঘোষণা করেন। যদিও প্রথম ম্যাচ খেলার পরেই নতুন একজনকে ওই দলে ঢুকানো হয়। আজ পরের দুই ম্যাচের জন্য নতুন করে আবার দল ঘোষণা করলেন প্রধান নির্বাচক। যেহেতু পরবর্তী দুই ম্যাচের জন্য এ দল তাহলে বাংলাদেশ যদি ফাইনালে ওঠে তখন আরো একবার দল ঘোষণা করা হবে। বাংলাদেশ ফাইনালে গেলে এ সিরিজে তাদের খেলা ম্যাচ সংখ্যা হবে পাঁচ। আর পাঁচ ম্যাচ খেলার এ সিরিজে দল পরিবর্তন করার সংখ্যাটা হবে চার।

বিষয়টা কী হাস্যকর ঠেকছে না!

এসব অবশ্য সবারই এতদিনে গা-সওয়া হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তাদের যে দল নির্বাচনের নিকৃষ্ট প্রক্রিয়া তা কোনভাবেই মানার মত নয়। নির্বাচকদের কাছে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা হলেন টিস্যুর মত। টিস্যুর মত বললেও ভুল হবে। কারণ টিস্যু ব্যবহার করে তবেই ফেলে দেয়া হয়। আচ্ছা পৃথিবীতে এমন কোন জিনিস আছে যা ব্যবহার না করেই ছুড়ে ফেলা হয়? যদি থাকে তাহলে সে জিনিসটার সাথে আমাদের ক্রিকেটারদের তুলনা করা যায়।

চলতি ত্রিদেশীয় সিরিজে প্রথম যে দল ঘোষণা করা হয় তাতে নতুন মুখ ছিলেন তিনজন। তাইজুল ইসলাম, মেহেদি হাসান ও ইয়াসিন আরাফাত মিশু। টি-টোয়েন্টিতে তাইজুল নতুন মুখ হলেও বাংলাদেশের হয়ে বাকি দুই সংস্করণে ইতোমধ্যে অনেক ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। কিন্তু মেহেদি ও মিশু ছিলেন একেবারেই আনকোরা।

এটাই ছিল প্রথমবারের মত বাংলাদেশ দলে তাদের ডাক পাওয়া। যদিও এ দু’জনের কেউ-ই কোন ম্যাচ খেলতে পারেননি। গত দুই ম্যাচে মিশু সীমানাদড়ির বাইরে দিয়ে শুধু পানি টেনেছেন আর মেহেদি ব্যাট, গ্লাভস ও হ্যালমেট নিয়ে সাজঘর থেকে মাঠে এবং মাঠ থেকে সাজঘরে ছুটোছুটি করেছেন। ব্যস তাদের কাজ শেষ। এইতো কিছুক্ষণ আগে সুন্দর করে তাদের ছেটে ফেলা হলো সিরিজে দ্বিতীয়বারের মত ঘোষিত দল থেকে। শুনলাম মিশুর নাকি চোটে পড়েছে। মানলাম। কিন্তু কোন ম্যাচ না খেলিয়েও কিসের ভিত্তিতে মেহেদিকে ছেটে ফেলা হলো তা কেউ জানেন কি? আমরা কেন, স্বয়ং প্রধান নির্বাচকও এর সদুত্তর দিতে পারবেন না নিশ্চিত থাকুন।

ত্রিদেশীয় সিরিজে প্রথম দুই ম্যাচের জন্য দল ঘোষণা করা হলেও দ্বিতীয় ম্যাচেই দলে যোগ করা হয় আবু হায়দার রনিকে। তার অন্তর্ভুক্তিতে মনে হয়েছিল যে আফগানিস্তানের বিপক্ষে হয়ত একজন বাড়তি পেসারের চাহিদা অনুভব করেছে টিম ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু সাইডবেঞ্চে তো মিশু ছিলেন। পেসার লাগলে তাকেই তো নামানো যায়। হতে পারে একজন বাঁহাতি পেসার চাওয়া হচ্ছিলো ম্যানেজমেন্ট থেকে যে ভাবনায় রনিকে দলে ফিরিয়ে আনা। আদতে তেমন কিছুই না। কারণ সে ম্যাচে একাদশে সুযোগই পাননি রনি। আসলে পানি, ব্যাট, গ্লাভস, হেলমেট মাঠে আনা নেয়ার দায়িত্বটা মেহেদি ও মিশুর সাথে ভাগাভাগি করার জন্যই তাকে নেয়া। আর হ্যাঁ, রনিও জায়গা পাননি পরবর্তী দুই ম্যাচের জন্য ঘোষিত বাংলাদেশ দলে।

আজ ঘোষিত নতুন দলে নতুন মুখ দুটি। আমিনুল ইসলাম বিপ্লব ও নাইম শেখ। পুরনোদের মধ্যে ফিরেছেন আরো তিনজন – রুবেল হোসেন, নাজমুল হাসান শান্ত ও শফিউল ইসলাম। মনে হচ্ছে দলে অতিরিক্ত পেসারের চাহিদা পড়েছে। সেক্ষেত্রে দুই একজন পেসার দলে নেয়া যেতেই পারে। কিন্তু এমন কাউকে বাদ দিয়ে নয় যে নিজেকে প্রমাণ করারই কোন সুযোগ পাননি। যদি বাংলাদেশ ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে যায় তখন নিশ্চিতভাবে নতুন করে ঘোষিত দলেও এখান থেকে এমন কয়েকজন বাদ পড়বেন যারা এক ম্যাচও খেলার সুযোগ পাননি।

এই হলো আমাদের ক্রিকেট দল নির্বাচন প্রক্রিয়া। এরূপ নির্বাচন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেটের বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়ে গেছে। খেলোয়াড় দলে নেয়া এবং কোন ম্যাচ না খেলিয়ে ছুড়ে ফেলার অভ্যাসটা আমাদের নির্বাচক প্যানেলের পুরনো অভ্যাস। সবশেষ শ্রীলঙ্কা সিরিজে যা ঘটেছে তাসকিন আহমেদ ও ফরহাদ রেজার ক্ষেত্রে। তার আগে যা বিশ্বকাপে ঘটেছে আবু জায়েদ রাহির ক্ষেত্রে। তারও আগে ঘটেছে ইয়াসির আলী রাব্বির ক্ষেত্রে।

আসলে বাংলাদেশের দল নির্বাচন প্রক্রিয়ার কোনো ক্রাইটেরিয়া নেই। নির্বাচকরা যখন যাকে মনে ধরে দলে নেন। আবার মুহূর্তেই দল থেকে বাদ দিয়ে দেন। এসব নিয়ে এতদিন কম সমালোচনা হয়নি। কম লেখালেখিও হয়নি। তাতে কোন লাভও হয়নি। সবকিছু আগের মতই রয়ে গেছে। বরং দিনকে দিন তা খারাপ থেকে বেশি খারাপের দিকে এগুচ্ছে। দলে নিয়ে কোন ম্যাচ না খেলিয়েই দল থেকে বাদ দেয়া খেলোয়াড়দের সংখ্যাটাও সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে শুধু বেড়েই চলেছে। এতে করে অনেক বাদ পড়া ক্রিকেটার মানসিকভাবে বিপর্যস্তও হয়ে পড়ছেন।

বিসিবি’র কয়েকটি প্রধান লক্ষ্যের একটি হলো তিন সংস্করণের জন্য আলাদা আলাদা দল গঠন করা। কিন্তু মিনহাজুল আবেদীন ও হাবিবুল বাশারের সমন্বয়ে গঠিত দুই সদস্যের নির্বাচক প্যানেলের দ্বারা এ লক্ষ্য কোনকালেই বাস্তবায়ন হবার নয়। ঘুণে ধরা এই দল নির্বাচন প্রক্রিয়া বর্তমানে যেভাবে চলছে তাতে দীর্ঘমেয়াদি কোন পরিকল্পনা যে কোনদিনই বাস্তবে রূপ নেবে না তা আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না নিশ্চয়ই।

চাইলে কিছু টাফ কল নেওয়া যেত। মুশফিকের টি-টোয়েন্টিতে যে ফর্ম, তাতে তাকে বসিয়ে রাখাটা এই সময় মোটেও অন্যায় কিছু নয়। নির্বাচকরা সেই সৎসাহসটা দেখাতে পারেননি।

গেল বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) পারফরম্যান্সের কথা মাথায় রেখে রনি তালুকদারের একটা সুযোগ প্রাপ্য টি-টোয়েন্টিতে। সেটা হচ্ছে না। নাজমুল হোসেন শান্ত আবারো সুযোগ পেলেন। তাহলে বিপিএলের দরকারটা আসলে কি!

অন্যদিকে দলে আসে বিপ্লবের মূল পরিচয় ব্যাটিং অলরাউন্ডার। লেগ স্পিন বোলিংটা নাকি পার্টটাইমারদের থেকে একটু ভাল। কিন্তু, সমস্যা হল তার লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে স্ট্রাইক রেট মাত্র ৬৬! এই ব্যাটিং দিয়ে টি-টোয়েন্টি চলবে তো?

ভারতের কিংবদন্তিতুল্য ক্রিকেটার মহিন্দর অমরনাথ একবার নাকি ভারতের নির্বাচকদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন – ‘বাঞ্চ অব জোকার্স’। আমাদের সেটা বলারও কেউ নেই!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।