ক্ষুদে বিস্ময় থেকে আধুনিক সময়ের মোহাম্মদ রফি

জীবনে অনেক রং, অনেক রং বদল। কখনো রোদ কিংবা ছায়াও নেমে আসে জীবনে। এর মাঝেও একাগ্রতা, পরিশ্রমে নিজেকে নিয়ে যেতে হয় উচ্চশিখরে, তেমনই একজন তিনি।

১৯৭৭ সাল। ভারতের ফরিদাবাদ শহর। মাত্র চার বছর বয়সী এক ছেলে বাবার সঙ্গে স্টেজে গেয়ে উঠলেন, কণ্ঠে মোহাম্মদ রফির সেই বিখ্যাত গান ‘ক্যায়া হুয়া তেরা ওয়াদা’। চার বছর বয়সী সেই শিশুর সেই অসাধারণ প্রতিভায় দর্শকরা বিস্মিত হয়েছিলেন।

এরপর মোটে ১৯ বছর বয়সে পাড়ি জমান মুম্বাই শহরে। এত ব্যস্ততা ও যান্ত্রিক শহরে কি আর অতি সহজে সুযোগ মিলে। অবশেষে যেই মোহাম্মদ রফির গান গেয়ে ছোটবেলায় দর্শকদের মাত করেছিলেন, সেই মোহাম্মদ রফির বিখ্যাত গানের সংকলন ‘রফি কি ইয়াদে’ দিয়ে দর্শকদের সামনে আসেন। গানগুলোও আলোচিত হল।

এরপর সুযোগ পেলেন বলিউডে। নব্বইয়ের শেষের দিকে যেই ছেলের হিন্দি সিনেমার সঙ্গীতে অভিষেক ঘটেছিল। তাঁর পরের দশকে তিনি সংগীত জগতে রাজত্ব করেছিলেন। মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার, কুমার শানু, উদিত নারায়নের পর দর্শকরা পেলো সংগীতের আরেক রাজপুত্রকে। যার গানে অপূর্ব এক মাদকতা সৃষ্টি করে। তিনি বলিউডের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় গায়ক সনু নিগম।

বাবা আগাম কুমার স্থানীয় শহরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাইতেন। বাবার সাথেই পথ চলা। ছোটবেলা থেকেই স্টেজে গান গাইতেন। ১৯ বছর বয়সে মুম্বাই শহরে এসে সংগীতের তালিমের নেন ওস্তাদ গোলাম খানের কাছে। টি সিরিজের কর্ণধার গুলশান কুমারের টি-সিরিজের ব্যানারে প্রথম বের করেন মোহাম্মদ রফির গানের সংকলন। পপ ধারার সংগীতে নিজেকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। একের পর এক অ্যালবাম সফল হতে লাগলো। হিন্দি গানের ইতিহাসে অন্যতম সফলতম অ্যালবাম ‘দিওয়ানা’ সনু নিগমের সৃষ্টি।

পপ সংগীতে নিজেকে পরিক্ষীত করার মাঝেই ডাক পান বলিউডে। প্রথম প্লে-ব্যাক ‘জনম’ সিনেমায়। যদিও সেটা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি। এরপর ‘বেওয়াফা সানাম’ ছবিতে গান গাইলেও আলোচনায় আসেন বর্ডার সিনেমার সেই বিখ্যাত গান ‘সন্দেসে আতে হে’ দিয়ে। এরপর এগিয়ে চলা, উপহার দিতে থাকেন একের পর এক জনপ্রিয় গান।

রোমান্টিক ধারার গানে হয়ে উঠেন অনন্য। একটা প্রজন্ম তাঁর গান শুনেই বড় হতে লাগলো। কন্ঠে বেঁধেছেন ইশক বিনা ‘সুরুজ হুয়া’, সাথিয়া, ‘কাল হো না হো’ থেকে ‘ম্যায় হু না’, ‘দো পাল’, ‘পিউ বলে’, ‘কাভি আলবিদা না ক্যাহনা’, ‘ইন লামহো কে’, ‘আভি মুঝ মে কাহি ‘, ‘ভগবান কাহা হু তুম’ এর মত সহ বহু শ্রোতাপ্রিয় গান।

সংগীতের দুই স্বর্ণগায়িকা অলকা ইয়াগনিক ও শ্রেয়া ঘোষালের সঙ্গে জুটি গড়ে তুলেছিলেন। সেই সময়ে প্রায় প্রতিটা ছবি মানেই সনু নিগমের গান। ব্যস্ততার শহরে তিনি নিজেও হয়ে যান ব্যস্ত। এক যুগের ও সময়ের বেশি জনপ্রিয় গান উপহার দেয়ার পর বলিউডে ধীরে ধীরে অনিয়মিত হয়ে পড়েন। শুধু হিন্দি গান নয়, বাংলা, তামিল, কন্নড় সহ বহু ভাষায় তিনি গান গেয়েছেন, পেয়েছেন বেশ জনপ্রিয়তাও।

বাংলাদেশে বের হয়েছিল তাঁর সফল অ্যালবাম। শুধু গান নয়,অভিনয় ও উপস্থাপনায় ও মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন। বেতাব, জানি দুশমন, লাভ ইন নেপালসহ একাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন। উপস্থাপনায় হাতেখড়ি বিখ্যাত রিয়েলিটি শো ‘সা রে গা মা পা’র আয়োজনে। বিভিন্ন সংগীত প্রতিভা অন্বেষণে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

বর্ণিল ক্যারিয়ারে ‘কাল হো না হো’ গানের জন্য পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। তিনবার বার ফিল্মফেয়ারসহ পেয়েছেন আরো বেসরকারি পুরস্কার। বিভিন্ন দেশের নামী কনসার্টে গান গেয়েছেন। উত্তর আমেরিকার বিখ্যাত শো ‘দ্য ইনক্রেডিবল’ এ অংশগ্রহণ করেন। জার্মানি ও কানাডাতে প্রথম ভারতীয় শিল্পী হিসেবে এককভাবে সংগীত পরিবেশন করেন।

ক্রিকেট নিয়ে অনুপ্রেরণামূলক গান গেয়েছিলেন ২০১১ সালের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। মাইকেল জ্যাকসনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে একটি গানে কন্ঠ দেন যা ‘দ্য বিট অব আওয়ার হার্টস’ নামক বিশ্বের ১৮টি গানের সংকলনে স্থান পায়। সনু নিগম ব্রিটনি স্পিয়ার্সের সাথে ‘আই ওয়ানা গো’ গানটিতেও কাজ করেন।

ব্যক্তিজীবনে ২০০২ সালে বাঙালি মেয়ে মধুরিমা নিগম কে বিয়ে করেন। সংসারে রয়েছে একটি পুত্র সন্তান। যুক্ত আছেন বিভিন্ন সমাজ সচেতন কাজেও। ‘আধুনিক মোহাম্মদ রফি’ খ্যাত এই গায়কের জন্ম ১৯৭৩ সালের ৩০ জুলাই।

যদিও এখন আর আগের মত সুদিন নেই সনু নিগমের। অনেকদিন হল হিন্দি সিনেমার পর্দায় আর ভেসে আসে না তাঁর গান। এমন সময় টুইটারে ধর্মীয় এক বিরূপ মন্তব্যের কারণে রোষাণলে পড়েন। বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দেন টুইটার অ্যাকাউন্ট। হয়তো সব সংকট কাটিয়ে একদিন ফিরে আসবেন তাঁর এই প্রিয় ময়দানে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।