মিঠুন-শ্রীদেবী প্রেম: আশির দশকের টক অব দ্য টাউন

সবকিছুর মায়া কাটিয়ে চিরতরে ওপারে চলে গেলেন বলিউডের ‘ড্রিমগার্ল’। কিভাবে মৃত্যু হয়েছে, তা নিয়ে রয়েছে নানা কল্পনা-জল্পনা। সম্প্রতি দুবাইয়ের এক হোটেলের বাথটাবে নিথর পড়ে ছিল তার দেহ। ‘পদ্মশ্রী’ পদকে ভূষিত এই অভিনেত্রীর মৃত্যুতে গোটা বলিপাড়া স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। আট থেকে আশি—কে চেনে না তাকে? তাকে বলা হয় বলিউডের প্রথম নারী সুপারস্টার। অমিতাভ, জিতেন্দ্র, ঋষি কিংবা অনিল কাপুরদের যুগেও যিনি স্বীয় প্রতিভা ও অভিনয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন বারবার। বলছি দেবীর কথা, ঝলমলে দুনিয়ার রূপের দেবী—‘শ্রীদেবী’।

শুরুটা হয়েছিল মূলত শিশুশিল্পী হিসেবে, ১৯৬৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘থুনাইভান’ ছবির মধ্যদিয়ে। এরপর শুধুই সামনে এগিয়ে যাওয়া, পেছনে তাকানোর দরকার পড়েনি। কয়েক বছর পরেই ১৯৭৮ সালে বলিউডে অভিষেক হয় ‘মালয়ালাম’ ‘তামিল’ ‘তেলুগু’ ও ‘কান্নাড়া’ সিনেমায় অভিনয় করা এই কিংবদন্তীর। প্রথম বলিউডি সিনেমার নাম—‘সোলভা সাওয়ান’।

দক্ষিণ ভারত থেকে মুম্বাইয়ের বড় পর্দায় পা রাখা এই লাস্যময়ীর পুরো জীবনে কতশত সাফল্য যে পায়ের কাছে এসে ধরা দিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। একটা সময় তো তার নামেই সিনেমা চলতো। পোস্টারের সবচেয়ে বড় মাথাটা নায়কের পরিবর্তে তারই থাকতো! তাকে ঘিরেই চিত্রনাট্য সাজানো হত। সিনেমা হলে ভক্তরা ভিড় জমাতো কেবল তাকে একনজর দেখার জন্যই।

তবে গোটা জীবনে অজস্র সাফল্যের পথ মাড়ালেও ব্যক্তিগত জীবনে বেশ কয়েকবার বিতর্কের মুখে পড়তে হয়েছিল এই ‘চিরসবুজ নায়িকা’কে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি—বাঙালি সুদর্শন যুবক মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে প্রেম ও বিয়ের গুঞ্জন। আসলে ‘মিঠুন-শ্রীদেবী’র প্রেম-পরিণয় কি কেবলই গুঞ্জন ছিল, নাকি ‘যত গর্জেছে, ঠিক ততটাই বর্ষেছে?’ চলুন, কিছুটা জানবার চেষ্টা করা যাক।

সময়টা ১৯৮৪ সাল। মুক্তি পায় রাকেশ রোশনের সিনেমা ‘জাগ ওঠা ইনসান’। এই সিনেমায় প্রধান তিনটি ভূমিকায় ছিলেন শ্রীদেবী, মিঠুন চক্রবর্তী এবং রাকেশ রোশান নিজে। রোমান্টিক ঘরানার এই সিনেমাটি দর্শক এবং সমালোচক—উভয় মহলেই ব্যাপক প্রশংসিত হয়। বি-টাউনের অন্দরমহলে কান পাতলে এখনো শোনা যায়, এই সিনেমার সেটেই নাকি তারা একে অপরকে মন দেওয়া-নেওয়ার পর্বটা সেরে ফেলেন।

ওই সময়ের সিনেমা ম্যাগাজিনগুলোতেও ব্যাপক সরগরম ছিল তাদের এই গুঞ্জন বিষয়ে। আসলে বলিউডের আশির দশকটাকে ‘দ্বিতীয় বিবাহ’ কিংবা ‘পরকীয়ার স্বর্ণযুগ’ বলা যেতে পারে। ধর্মেন্দ্র-হেমা মালিনী থেকে শুরু করে মিঠুন-শ্রীদেবী—আরও অনেকেই পরকীয়ায় জড়িয়েছেন। শোনা যায়, ১৯৮৫ সালে গোপনে তারা বিয়েটাও সেরে ফেলেন। যদিও তাদের দুজন ব্যাপারটি নিয়ে জনসমক্ষে কখনোই মুখ খুলতে রাজি হননি।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, তারা কিছু না বললেও হাটে হাঁড়ি ভেঙ্গে দিয়েছিল ওই সময়ের একটি জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম। তারা শ্রীদেবী ও মিঠুনের বিয়ের সনদপত্র ফাঁস করে দিয়েছিল। সনদপত্র প্রকাশ্যে আসার পর গুঞ্জন আর গুঞ্জন থাকলো না। তাদের রিলেশনের সামনে পাহাড়সম বাধা হয়ে দাঁড়ালো মিঠুনের স্ত্রী যোগিতা বালি।

‘রিয়েল লাইফ নাটকে’র এ দৃশ্যে বলা যায় বড়সড় একটা টুইস্ট আসে। সেটা হচ্ছে—চিত্রনাট্যে আবির্ভাব ঘটে বলিউডের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযোজক বনি কাপুরের। ১৯৮৪ সালে ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’ সিনেমার মধ্যদিয়ে শ্রীদেবী সঙ্গে পরিচয় হয় তার। বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও নায়িকার অসাধারণ রূপের ঝলকে হাবুডুবু খেতে লাগলেন প্রযোজক সাহেব। মনে মনে সংকল্প করলেন, যে করেই হোক শ্রীদেবীকে তার চাই।

শ্রীদেবীর মন যোগাতে ব্যস্ত হয় পড়েন তিনি। একের পর এক তার প্রডাকশন হাউজ থেকে শ্রীদেবীকে নায়িকা করে সিনেমা বানাতে থাকলেন, এবং শ্রীদেবীর মায়ের বিশাল অঙ্কের দেনা শোধ করে তার মন গলানোর চেষ্টা করলেন।

কিন্তু এই ‘বলিউড ডিভা’র ভালোবাসা অত ঠুনকো ছিল না। তিনি বাঙালিবাবু মিঠুনের প্রেমে এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, বনির আহবানে সাড়া দেওয়ার প্রযোজনবোধ মনে করেননি। তিনি চাইতেন মিঠুন তার প্রথম স্ত্রী যোগিতাকে ছেড়ে তার সঙ্গে সংসার করুক। অথচ মিঠুন নিজেও শ্রীদেবীকে অসম্ভব ভালবাসা সত্ত্বেও স্ত্রী যোগিতাকে ছেড়ে যেতে পারছিলেন না। কারণ যোগিতা তার দুঃসময়ের সাথী, এবং তা সন্তানের মা।

বনি কাপুর, শ্রীদেবী ও তাদের দুই মেয়ে

এদিকে শ্রীদেবী ইস্যুতে মিঠুন-বনির সম্পর্কটাও তিক্ততায় রূপ নেয়। বনি কাপুর শ্রীদেবীর প্রতি দুর্বল এমনটা জানতে পেরে মিঠুন কিছুটা দূরে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তাছাড়া মিঠুনের বৈবাহিক জীবনে শ্রীদেবীকে নিয়ে নানা সমস্যা তো আছেই। আস্তে আস্তে শ্রীদেবী আর মিঠুনের দুরত্ব বাড়তে থাকে, এবং ১৯৮৮ সালে বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এই জুটির সর্বশেষ সিনেমার নাম—‘গুরু’, যা রিলিজ হয়েছিল ১৯৮৯ সালে।

মিঠুন-শ্রীদেবী বিচ্ছেদের বেশ কয়েকটি কারণ থাকলেও মূল যে কারণটি, সেটা হচ্ছে—মিঠুনের স্ত্রী যোগিতা বালির সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। তিনি সংসার বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠছিলেন। শোনা যায়, একপর্যায়ে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন। এরপরই মিঠুন চক্রবর্তীর সম্বিৎ ফিরে আসে। তিনি শ্রীদেবীর সঙ্গে সকল পাট চুকিয়ে সুবোধ বালকের মতো প্যাভিলিয়নে ফিরে আসেন।

মিঠুনের পরিবার

বিচ্ছেদের বেশ কয়েক বছর পর ১৯৯৬ সালে শ্রীদেবী অনেকটা অভিমান করে, বাধ্য হয়ে গোপনে গাঁটছড়া বাঁধেন প্রথমে প্রত্যাখ্যান করা সেই পুরুষ—মানে বনি কাপুরের সঙ্গে। এরপর দুই দশকেরও অধিক সময় ধরে তার সঙ্গে সুখের সংসার করেন। তাদের ঘরে ‘জাহ্নবী’ ও ‘খুশি’ নামে দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।