কি অদ্ভুত বিচিত্র সেলুকাস আমাদের চারপাশ ও আমরা

ভাগ্যিস কাল রাতে প্রচন্ড গরম পড়েছিলো আর সাথে বিদ্যুৎহীন অবস্থা। না হলে আর কিছুক্ষন জেগে থাকা হতো আর জেগে থাকা হলেই গত রাতে পূর্ণতা পেতো ষোল আনার ঘর।

গত কয়েকদিন ধরেই নানান কাহিনী শুনতেছি। সাকিবের দেশে ফিরে আসা, লিটন সৌম্য হিন্দু কোটায় খেলা, তাসকিনের আযাযিত বাবা হওয়া আর সকালে এসে শোনলাম H2O মানে ধানমন্ডির কোন এক রেস্টুরেন্ট কিংবা উইশের বাংলা ভাবানুবাদ বা বঙ্গানুবাদ না বুঝতে পারা ।

আসলে এইসন কাহিনী অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। শুরু করি, মাশরাফি যখন বিয়ে করলো তখন এতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছিলো না আর আমাদের কিছু একটা শ্রেণির অতি শিক্ষিত! লোকজন ছিলো না। না হলে আজকে তার ও একই অবস্থা হতো। যাকগে সে কথা।

মুশি যখন বিয়ে করে বিয়ের ছবি সামাজিক মাধ্যমে দেয়ার পরই কমেন্ট গুলো ছিলো এরকম ‘মেয়ে এতো মোটা কেন’, ‘বেশি বয়স্ক লাগে’ ‘মনে ছেলে আর খালা’। বেচারা বিয়ের ছবি দিয়ে কি পাপটা না করেছিলো! কোথায় তাদের জন্য সবাই দোয়া করবে তা না উল্টো নিজেদের আযাযিত বক্তব্য প্রকাশ করতেছিলো। আচ্ছা মুশফিক কি কারো অপিনিয়ন চেয়েছিলো যে ‘ভাইলোক, বিয়া করাম, মেয়ে কিমুন, মানায় কি?’

সাকিব আল হাসানের স্ত্রী থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত চলছে তো চলছেই। এখন তো ট্যাগ লাইন হয়ে গেছে ‘সাকিবের বৌ পর্দা করে না।’ এর মধ্যে আপামর এই জাতির! মন বাসনা, মনকামনা পূরণ করে তামিম বিয়ে করলো। মেয়ে দেশি, দেখতে মানায় আবার পর্দাও করে। কিন্তু কিসের কি! যে লাউ সেই কদুই রয়ে গেলো যখন তামিম অফ ফর্মে ছিলো তখন রাত বিরাতে তামিমের বৌ কে ফোন দিয়ে যাচ্ছে তাই অবস্থা করে ফেললো ।

এদের সর্বশেষ সংযোজন হলো তাসকিনের বাবা হওয়া। একটা ছেলে নিজের যোগ্যতায় বিয়ে করেছে, বিয়ে করে বাচ্চা পয়দা করেছে তো বাকিদের কি সমস্যা? সমস্যা আছে, আরে তাসকিন বাচ্চা পয়াদা করে বাবা হয়ে গেলো অথচ আমরা কিছুই করতে পারলাম না ভাবা জাতিদের কাছে তো এই সমস্যা হবেই। এদের কমেন্টের অত্যাচারে বেচারা তাসকিনের বাচ্চার হওয়ার পুরো প্রসেসের সময়টা উল্লেখ করে আবার লিখতে হলো!

ভাবুন একবার এই দেশে বিয়ে করা, বোনের সাথে ছবি, বাবা হওয়ার অনুভূতি শেয়ার করলে এইসব শুনতে হয়!

এরা কারা?

আমিও ভাবতাম এই কথা। আসলেই এরা কারা ? মনে হয় আজ সকালে কিছুটা উত্তর পেয়েছি । এরা হলো এই যে ‘H2O’ এর মানে ‘রেস্টুরেন্ট’ ভাবা সমাজ।

একটা দেশের ‘মিস বাংলাদেশ’ নির্বাচন হচ্ছে অথচ কেউ কিছু জানেই না! আয়োজক দের কাছে জানতে চাইলে বলেন ‘নিজেদের টাকায় আয়োজন করেছি, কাওকে জানানোর দরকার নাই তো।’ বাহ! কি সুন্দর কথা, কি অদ্ভুত তাদের মনোভাব! যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বেড়িয়ে আসা একজন বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশ কে রিপ্রেজেন্ট করবে অথচ তাদের কথা জানানোর প্রয়োজনবোধ করেননি আয়োজক।

ভালো কথা জানালেন না, আমরাও জানলাম না। তো নিজেরাই খুঁজে নিয়ে আসছেন কেমন ‘মিস বাংলাদেশ’? পানির রাসায়নিক সংকেত কে ধানমন্ডির রেস্টুরেন্ট ভাবা কিংবা বার কয়েক দফা বুঝিয়ে দেয়ার পর ‘wish’ এর মানে বুঝতে না পারা। এরাই তো আমাদের দেশের খুঁজে খুঁজে আনা রত্ন!

বাদ দেন, অনেক কপচালাম। গত কাল দুটো অসম্ভব ভালো খবর ছিলো সেগুলো দিয়ে শেষ করি।

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর সেনাবাহিনীতে প্রথম নারী মেজর জেনারেল পেল বাংলাদেশ। সুসানে গীতি ১৯৮৫ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নারী চিকিৎসক হিসেবে ক্যাপ্টেন পদে যোগ দেন। তিনি ১৯৯৬ সালে প্রথম নারী হিসেবে হেমাটোলজিতে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ডা. সুসানে গীতি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন এবং বিভিন্ন সামরিক হাসপাতালে প্যাথলজি বিশেষজ্ঞের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত।

ভুটানের থিম্পুর চাংলিমিথাং স্টেডিয়ামে সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ মহিলা ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে পাকিস্তান কে স্বপ্না ৭টি, মার্জিয়া ৪টি, শিউলি আজিম ২টি গোল করেন। বাকি চার গোলদাতা আঁখি খাতুন, মিশরাত জাহান, তহুরা খাতুন ও কৃষ্ণা রানী। গুনে গুনে ১৭টা দিয়েছে । আহা! কয়েকদিন আগে দিয়েছিলো ১৪টা ।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্পিকার, সংসদ উপনেতা, সুপ্রিম কোর্টে বিচারক এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নারীরা দায়িত্ব পালন করে থাকে, ক্রিকেটে নারীরা এশিয়া কাপ জিতে, ফুটবলে বাচ্চা বাচ্চা মেয়েরা পাকিস্তানের মতো দল কে ১৪ টা, ১৭ টা ভবিষ্যতে আরো কত দিবে কে জানে কিন্তু তারপরেও এই দেশে H2O মানে রেস্টুরেন্ট ভাবার মতোও আছে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।