সবচেয়ে কৃপণ, সবচেয়ে ধনী: হায়দারাবাদের বিচিত্র এক শাসক

অবিভক্ত ভারতের হায়দারাবাদ নামক বিশাল রাজ্যের শেষ নিজাম ছিলেন তিনি। নিজাম অনেকটা নবাবের মত একটা ব্যাপার। নাম তাঁর মীর ওসমান আলী খান!

ধন্যাঢ্য এই ব্যক্তি ছিলেন বিচিত্র এক চরিত্র। তিনি সবচেয়ে সস্তা ব্র্যান্ডের সিগারেট খেতেন। গাঁটের পয়সা খরচ করে কিনতেন কম, তাঁর কাছে আসা অতিথিদের থেকেই চেয়ে খেতেন বেশি।

নিজের জামা কাপড় ছিঁড়লে নিজের হাতে সেলাই করতেন। ফলে, দর্জিও পয়সা পেত না। তাঁর ব্যবহৃত পুরনো পোশাক ‘অল্টার’ করে আবার পরতে হতো বাড়ির কিশোরদের। ছিঁড়ে বা ফেটে না গেলে নতুন জামা বা জুতো বাড়িতে ঢুকতো না।

তাঁর মতো কৃপণ মানুষ, তাঁর আশপাশের কেউ দেখেননি। রাস্তায় বেরিয়ে দোকানে খাবার খেয়ে দাম নিয়ে দোকানদারের সঙ্গে ঝগড়া করতেন। তাঁর আর্দালিদের কেউ কোনও দিন এক সিকি বকশিশ পেয়েছে বলে মনে করতে পারেন না।

অথচ ভাবতে পারেন, সেই মানুষটির টেবিলেই কিন্তু পেপার ওয়েট হয়ে শোভা পেত পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম হীরা, ১৮৫ ক্যারেটের জ্যাকব ডায়মন্ড। বর্তমানে যার দাম হাজার কোটি টাকারও বেশি।

পৃথিবীর সবচেয়ে দামি রোলস রয়েসের পঞ্চাশটিরও বেশি মডেল রাখা থাকতো তাঁর গ্যারেজে। তাঁর কাছে যত পরিমাণ মুক্তা ছিল, তাতে একটি অলিম্পিক সাইজের সুইমিংপুল ভর্তি হয়ে যেত।

এই মানুষটিই রানী এলিজাবেথের বিয়েতে অক্লেশে কয়েক কোটি টাকা দামের হীরার নেকলেস পাঠিয়ে দেন। সেটা আজও রানীর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় ‘নিজাম নেকলেস’ নামে বিখ্যাত। ব্রিটিশদের কাছ থেকে ‘স্যার’ উপাধিও পেয়েছিলেন তিনি।

২০০৮ সালের ফোর্বস ম্যাগাজিনের এক প্রচ্ছদে এই নিজামকে বিশ্বের সর্বকালের সেরা ধনীদের মধ্যে পঞ্চম স্থান দিয়েছে। তার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ২১০.৮ বিলিয়ন ডলার। টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে ১৯৩৭ সালে তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর সাথে মীর ওসমান আলী খান।

বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন-এর ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৭, সংখ্যার কভারে নিজামের ছবি ছাপা হয়।  নিচে ক্যাপশন ছিল, ‘দ্য রিচেস্ট ম্যান ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।’

১৯১১ সালে মীর ওসমান আলী ক্ষমতার মসনদে আরোহন করেন। এ সময় রাজকোষ প্রায় শূন্য হতে চলেছিল। সাম্রাজ্যের পূর্বতন নিজাম মীর ওসমান আলীর পিতার উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের জন্য রাজকোষের এই করুণ অবস্থার সৃষ্টি হয়।

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর সাথে মীর ওসমান আলী।

মীর ওসমান আলী ক্ষমতা গ্রহণের পরেই রাজ্যের আর্থিক অবস্থা ফিরতে থাকে। ছিলেন ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত। তাঁর ৩৭ বছরের শাসনামলে রাজকোষ ফুলে ফেঁপে ওঠে। তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণও ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। কিন্ত মৃত্যুর পর তার বিশাল সম্পদের কিছু অংশই খুঁজে পাওয়া যায় নাই।

এবার জেনে নিন , কৃপন হলেও এই মানুষটি, নিজাম মীর ওসমান আলী ভারতের জন্য কি কি করে গেছেন। সবার অপছন্দের নিজাম বাহাদুর ভারতের জন্য যেটা করে গেছেন, তা আজ পর্যন্ত কেউ করতে পারেননি। পারবেনও না।

তখন ১৯৬৫ সাল, ভারতকে তখন চোখ রাঙাচ্ছিল চীন। সঙ্গে পেয়েছে দোসর পাকিস্তানকে। দেশকে বহি:শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচাতে ভারত তৈরি করল জাতীয় নিরাপত্তা তহবিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং লাল বাহাদুর শাস্ত্রী হায়দারাবাদে গেলেন।

নিজামকে অনুরোধ করলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা তহবিলে নিজামকে কিছু দান করার জন্য। সব শুনলেন কৃপণ নিজাম। মিটি মিটি হাসতে হাসতে নিজের সেক্রেটারিকে ডাকলেন। একটা কাগজে উর্দুতে কী একটা লিখে দিলেন। সেক্রেটারি কাগজটা তুলে চমকে উঠেই নিজেকে সামলে নিলেন। ভারতের নিরাপত্তা তহবিলে নিজাম ওসমান আলী দিলেন ডোনেশন। চমকে গেল বিশ্ব!

সামান্যই দিলেন। মাত্র পাঁচ টন সোনা। এর সঙ্গে নগদে দিলেন ৭৫ লাখ ভারতীয় রুপি। ১৯৬৫ সালে নিজামের দেওয়া ৫০০০ কেজি সোনা এখনও পর্যন্ত ভারতের জাতীয় কোষাগারে দান হিসাবে দেওয়া সবচেয়ে বড় অর্থরাশি।

তাঁর তৈরি করা ওসমানিয়া ইউনিভার্সিটি আজ ভারতের অন্যতম বৃহৎ ইউনিভার্সিটি। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় হায়দরাবাদই ছিল একমাত্র স্টেট যাকে ব্রিটিশরা নিজস্ব কারেন্সি নোট ব্যবহার করার অনুমতি দেয়। নিজামের মুদ্রার নাম ছিল, ‘ওসমানিয়া সিক্কা’। নোটের নামে ছিল, ‘হায়দরাবাদি রুপি’।

ওসমানের সেই প্রিয় গাড়ী, আজো টিকে আছে।

এই নিজামের বিমানের শখও ছিল। তিনি ১৯৩০ সালে ‘হায়দারাবাদ অ্যারো ক্লাব’ এবং বেগমপেট এয়ারপোর্ট প্রতিষ্ঠা করেন। বলা হয়ে থাকে একই সাথে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও সবচেয়ে সঞ্চয়ী লোকটি হচ্ছেন তিনি!

বিশ্বের ধনীতম মানুষটির সম্পর্কে আরেকটি বিখ্যাত কাহিনী না বললেই নয়। ভারতীয় নিরাপত্তা তহবিলে পাঠানোর জন্য পাঁচ টন স্বর্ণমুদ্রায় ভর্তি ট্রাঙ্কগুলি যখন ভ্যানে লোড করা হচ্ছে।

কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ানো নিজাম ভুরু কুঁচকে তাঁর কর্মরত অফিসারদের বলেছিলেন, ‘আমি কিন্তু পাঁচ টন স্বর্ণমুদ্রাই শুধু দান করেছি। ট্রাঙ্ক গুলো নয়। তাই ওগুলো যেন আমার কাছে ফেরত আসে। খেয়াল রেখ!’

কিং কোঠি প্রাসাদ নামে একটি বিলাসবহুল বাসভবনে নিজাম তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছিলেন। অনুমান করা হয় যে, তার বিশাল সম্পদ লুকিয়ে রয়েছে কোথি প্রাসাদে। নিজাম তার এই প্রাসাদে জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন। সেই কোথি প্রাসাদের কোনো এক গুপ্ত কুঠুরিতেই সেই লুকানো সম্পদ রয়েছে বলে অনেকের বিশ্বাস।

কিং কোঠি প্যালেস: মীর ওসমান আলী খানের বাড়ি।

আজও অনেকেই নাকি কোঠি প্রাসাদে খুঁজে বেড়াচ্ছেন নিজামের সেই লুকানো সম্পদ। কেউ খুঁজতে যাবেন নাকি!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।