মীনাক্ষী শেষাদ্রী: একটি ভুলে যাওয়া অধ্যায়

বিত্তবান ব্যবসায়ী শেখর প্রেমে পড়ে সাধারণ ঘরের মেয়ে দামিনীর। বিয়েও হয় তাঁদের। শেখরের ছোট ভাই বাড়ির কাজের মেয়েকে ধর্ষণ করে, যা দেখে ফেলে দামিনী। বাড়ির সবার বিপক্ষে গিয়ে সাধারণ এক নারীর পাশে দাঁড়ায় দামিনী। এই অসীম সাহসিকতায় সঙ্গী পান উকিল গোবিন্দকে – যে ব্যক্তি জীবনে একজন পোড় খাওয়া মানুষ।

এমনই এক নারীকেন্দ্রিক গল্প নিয়ে রাজকুমার সন্তোষির বিখ্যাত সিনেমা ‘দামিনী’। তাতে, নাম ভূমিকায় অভিনয় করে সেই সময় সিনেমাজগতে সাড়া জাগিয়ে দেন বলিউডে আশির দশকের শেষভাগের অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা মীনাক্ষী শেষাদ্রী।

মীনাক্ষীর ক্যারিয়ার অবশ্য সিনেমা দিয়ে শুরু হয়নি। খুব কম লোকই জানেন যে, ১৯৮১ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে মিস ইন্ডিয়া খেতাব অর্জন করেছিলেন তিনি। একই বছরে, মীনাক্ষী জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত মিস ইন্টারন্যাশনালের মুকুটও পেয়েছিলেন।

১৯৮৩ সালে মুক্তি পাওয়া প্রথম সিনেমা ‘পেইন্টার বাবু’ ফ্লপ হয়েছিল। রাজিব গোস্বামীর বিপরীতে কাজ করার পর ফ্লপ হয়ে আশাহত হয়েছিলেন মিনাক্ষী, সিনেমা ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবেন। যদিও, দ্বিতীয় সিনেমা ‘হিরো’ দিয়েই বাজিমাৎ। সুভাষ ঘাইয়ের এই ছবিতেই অভিষেক ঘটেছিল জ্যাকি শ্রফের। এই সিনেমার সাফল্যের পর একের পর এক সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হতে থাকেন, এর মধ্যে ১৯৮৫ সালেই মুক্তি পায় নয়টি সিনেমা।

সেই বছরের সবচেয়ে সফল সিনেমা ‘বেওফায়াই’। এই ছবিতে রাজেশ খান্না ও রজনীকান্তের বিপরীতে অভিনয় করেন। একই সাথে অনিল কাপুরের বিপরীতে ‘মেরি জাঙ’ ক্যারিয়ারের অন্যতম হিট ছবি। এছাড়া তারকাবহুল ‘আন্ধি তুফান’ তো রয়েছেই।

১৯৮৬ সালে অভিনয় করেন ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সিনেমা ‘স্বাতী’তে। নাম ভূমিকায় অভিনয় করা এই সিনেমায় সহশিল্পী হিসেবে ছিলেন শর্মিলা ঠাকুর, মাধুরী দীক্ষিতরা। অমিভাভ বচ্চনের বিপরীতে প্রথম অভিনয় করেন সাড়া জাগানো সিনেমা ‘শাহেনশাহ’-তে।

মুক্তির আগে বেশ আলোচনায় থাকলেও ‘গঙ্গা যমুনা সরস্বতী’ ফ্লপ হয়। এছাড়া আশির দশকে আলোচিত সিনেমার মধ্যে বিজয়, ডাকাত, আল্লা রাখা, পরিবার, বিশ সাল বাদ, দিলওয়ালা, বাড়ে ঘার কি বেটি অন্যতম। মিস্টার ইন্ডিয়ার তামিল রিমেকে শ্রীদেবীর চরিত্রে অভিনয় করেন। নৃত্যকলায় ও বেশ পারদর্শী ছিলেন।

সানি দেওলের সঙ্গে জুটি বেঁধে উপহার দেন সাড়া জাগানো সিনেমা ‘ঘায়েল’। সঙ্গে মহেশ ভাটের ‘জুরম’ দিয়ে নব্বই দশকের ক্যারিয়ার খুব ভালোভাবেই করেছিলেন। ঘর হো তো অ্যায়সা, শানদার, আদমি খিলোনা হ্যায়, ক্ষত্রিয়-এর পর জীবনের অন্যতম মাহেন্দ্রক্ষণ আসে ‘দামিনী’ নিয়ে। বাণিজ্যিক সফলতা থেকে সমালোচকের প্রশংসা সবই আসে এই সিনেমা দিয়ে।

তবে আক্ষেপ বা অভিমান আসে এই সিনেমা দিয়েই, মুক্তির পর ভূয়ষী প্রশংসা পাওয়ায় ভেবেছিলেন তিনি জাতীয় পুরস্কার পাবেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় সিনেমার সহ-নায়ক সানি দেওল সব পুরস্কার পেলেও অধরা জাতীয় পুরস্কার দূর থাক, এমনকি ফিল্মফেয়ারও পান নি মীনাক্ষী।

শোনা যায়, কোনো পুরস্কার  নাকি তিনি পান নি। এই অভিমান থেকেই নাকি তিনি স্বেচ্ছায় বলিউড থেকে নির্বাসন নেন। বিয়ে করে সংসারী হয়ে প্রবাস জীবন বেছে নেন। এখনো প্রবাসেই আছেন।

নায়িকা হিসেবে সর্বশেষ মুক্তি পাওয়া ছবি ১৯৯৬ সালে ‘ঘাতক’ সুপারহিট। ক্যারিয়ারে কখনোই আলোচিত কোনো পুরস্কার পাননি। অথচ, টানা সাফল্য পেয়ে গেছেন। তাই হয়তো অভিমানটা একটু বেশিই ছিল। ক্যারিয়ার যখন শুরু করেছিলেন তখন সবেমাত্র শুরু হয়েছিল শ্রীদেবীর রাজত্ব, সঙ্গে রেখা, জয়া প্রদা তো ছিলই, কিছুদিন পরেই মাধুরীর আগমন।

মিনাক্ষী ১৯৬৩ সালের ১৬ নভেম্বর ঝাড়খণ্ডের একটি তামিলিয়ান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। জন্মের পরে তাঁর নাম ছিল শশিকলা শেষাদ্রি। তবে পরে তিনি নিজের পর্দায় নাম পরিবর্তন করে হাজির হন।

আশির দশকে চিরাচরিত বানিজ্যিক সিনেমাতে সেভাবে ছাপিয়ে যেতে পারেননি মীনাক্ষী। তবে কিছু নারীকেন্দ্রিক সিনেমাতে অভিনয় করেছেন। সানি দেওলের সঙ্গে জুটি বেশ আলোচিত এছাড়া অনিল কাপুর, জ্যাকি শ্রফ, মিঠুন চক্রবর্তীদের বিপরীতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সিনেমায় অভিনয় করেন। সিনেমার রিভিউ বিষয়ক ওয়েবসাইট আইএমডিবি’র মতে, অবশ্য তিনি ভাতের ইতিহাসের শীর্ষ ৫০ অভিনেত্রীর একজন।

এর বাইরে তিনি একজন প্রশিক্ষিত নৃত্যশিল্পী। তিনি ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যের বিভিন্ন রূপ শিখেছেন। মীনাক্ষী চারটি ভারতীয় নাচ – ভরতনাট্যম, কুচিপুড়ি, কত্থক এবং ওডিসি নৃত্য জানেন। বোঝাই যাচ্ছে, তাঁর প্রতিভার কোনো কমতি নেই।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।