আসলেই, ভুলগুলো মধ্যবিত্তদেরই ছিল!

এই করোনাকালীন মহাবিপর্যয়ের সময়ে আপাতদৃষ্টিতে অবস্থাসম্পন্ন হিসেবে বিবেচিত সবার পক্ষেও হয়তো মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া, তাদের ত্রাণকর্তা হয়ে ওঠা সম্ভব নয়। কেননা আপনি যে মানুষটিকে অবস্থাসম্পন্ন মনে করে তার কাছে অর্থসাহায্য চাইছেন, তিনি নিজেও হয়তো এই মুহূর্তে চরম অর্থসঙ্কটে রয়েছেন। এই মাসটা হয়তো কোনোভাবে চলে গেল, কিন্তু সামনের মাসটা কী করে চালাবেন ভেবে ভেবে তিনি অস্থির হয়ে যাচ্ছেন, নিজের অজান্তেই শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতায় ধস নামিয়ে দিচ্ছেন।

আসলে বাইরে থেকে দেখে অনেককেই মনে হয় সুখে আছে, স্বস্তিতে আছে, স্বাচ্ছন্দ্যে আছে। ভেতরে ভেতরে যে মানুষটা কেমন আছে, আপনি-আমি সম্ভবত চিন্তাও করতে পারব না।

তবে এই অতিমারীতে আমরা আর কিছু পারি কিংবা না পারি, একটা জিনিস কিন্তু চাইলেই পারি। তা হলো সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠা। পারি সবসময় সবাইকে জাজ করার মানসিকতা নিয়ে পর্যবেক্ষণ না করে, মানুষের প্রকৃত দুঃখ-কষ্টটা একটু অনুধাবনের চেষ্টা করতে। ওই যে শুরুতেই বলেছি, আপনার-আমারও হয়তো এই মুহূর্তে বিপদাপন্ন মানুষকে সাহায্য করার মতো সঙ্গতি নেই। কারণ আজ হয়তো আমরা নিজেরাই ভুক্তভোগী। তারপরও, অপরাপর বিপদাপন্ন মানুষদের কষ্টটা অনুভব করে তাদের ব্যথায় সমব্যথী তো আমরা হতেই পারি, তাই না?

বিপদাপন্ন মানুষগুলো হয়তো আমাদের সাহায্যের প্রত্যাশাও করছে না, সুতরাং তাদের সাহায্য করতে পারছি না ভেবে আমাদের খুব বেশি অপরাধবোধে ভোগারও কোনো কারণ নেই। কিন্তু নিজে থেকেই অপরাধ বোধ করে, অবচেতন মনে নিজেকে দায়ী ভেবে, সেই দায়টাকে আড়াল করার জন্য তাঁদের দিকে আঙুলটা তো আমরা না তুললেও পারি।

নিজেকে দিয়েই একটু চিন্তা করে দেখুন। কোনো কারণে যখন আপনার অবস্থা প্রকৃতপক্ষেই চরম শোচনীয়, সেই মুহূর্তেও সবাই আপনার পাশে দাঁড়াবে, এমন আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু সবাই আপনার কষ্টটাকে স্বীকার করবে, এটুকু আশা তো আপনি করতেই পারেন। তার বদলে কেউ যদি আপনার কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেয়ার মতো বলে, আপনার এই বিপদের জন্য দায়ী আসলে আপনিই, এটা আপনারই কর্মফল, নিশ্চয়ই আপনার ভালো লাগবে না। বরং আপনার কষ্ট বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যাবে।

অথচ কী আশ্চর্যের বিষয়, গোটা বিশ্ব যখন সন্দেহাতীতভাবে স্মরণকালের সবচেয়ে বাজে সময় পার করছে, তখনো কিছু মানুষ পড়ে আছে ওই নির্লজ্জ ভিকটিম ব্লেমিং নিয়ে। আজ মধ্যবিত্তের যে দুরাবস্থা, সেজন্য দায়ী নাকি মধ্যবিত্তরাই! তাদের শো অফ করার প্রবণতা, বিলাসী জীবনযাত্রা, ভোগ্যপণ্যের দাস হয়ে ওঠা, এসবই নাকি আজ তাদের অথৈ জলে পড়ার কারণ। তা নাহলে নাকি অন্তত ছয়টা মাস বসে খাওয়ার মতো টাকা সব পরিবারেই জমে থাকার কথা!

সিরিয়াসলি? এই ধরনের চিন্তাভাবনা যে মানুষের মাথা দিয়ে বের হয়, কোন দুনিয়ায় বাস করে সে? জীবনে কি আদৌ মধ্যবিত্ত পরিবারদের দেখেছে সে? নাকি সামনাসামনি গুটিকতক মানুষকে রেস্টুরেন্টে খেতে, সিনেপ্লেক্সে সিনেমা দেখতে, পার্লার/সেলুনে ফেসিয়াল করতে দেখেই ভেবে নিয়েছে, দেশের সব মধ্যবিত্তের অবস্থা এমন? অল্প কিছু নমুনা দেখেই ভেবে নিয়েছে গোটা দেশের আপামর মধ্যবিত্তেরই কাজ হলো শুধু শো-অফ করা আর সামর্থ্যের অধিক টাকা ওড়ানো?

যদি তর্কের খাতিরে মেনেও নিই, এমন লাগামছাড়া, ভবিষ্যতের ভাবনা না ভাবার কারণেই সমাজের কিছু মানুষ আজ বিপদে আছে, তারপরও প্রশ্ন থেকেই যায়, এগুলোর কারণে আজ বিপদে পড়েছে কয়জন মধ্যবিত্ত? এর বাইরেও যে শুধু ঢাকা শহরেই লক্ষ লক্ষ মধ্যবিত্ত পরিবার আছে, যারা ছয় মাসে নয় মাসেও কোনোদিন বাইরের খাবার খাওয়ার কথা ভাবতে পারে না, কোনোদিন কোনো ট্যুরও দেয় না, সন্তানকে কোনো রকম অযাচিত শখও পূরণ করতে দেয় না, তাদের কথা কি ভেবেছেন? তারা তো মিতব্যয়ী, সঞ্চয়ী, তবু তারা কি গত তিনমাস খুব স্বাচ্ছন্দ্যে আছে? আরো তিন মাস স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে?

উত্তরটা আমিই বলে দিই, থাকবে না তারা। কারণ সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মিনিমালিস্ট জীবনযাপনের পরও, নয়টা-পাঁচটা চাকরির বাইরে জীবনের অন্য কোনো শখ-আহ্লাদ পূরণ না করা সত্ত্বেও, তাদের হাত আজ একেবারেই খালি। এবং বালিতে মুখ গুঁজে থাকা উটপাখিদের দেখানো কারণগুলোর জন্য তাদের হাত খালি না।

তাদের হাত খালি, কারণ ঢাকা শহরে টাইলস করা বাসা না, নিতান্তই ভদ্রস্থ দুই রুমের ছোট একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে গিয়েও তাদের মাসিক আয়ের সিংহভাগটা বেরিয়ে যায়। সরকারি, বিনাবেতনের স্কুলে ছেলেমেয়েকে পড়ানো মানে নিজ হাতে তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করা, তাই বাধ্য হয়েই তারা ছেলেমেয়েকে মোটা টাকা বেতনে অপেক্ষাকৃত ভালো স্কুলে ভর্তি করায়। কোনো রকম বিলাসী দ্রব্য না, বাজারে গিয়ে স্রেফ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতেই তাদের চোখের জলে নাকের জলে একাকার হয়। ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তারা বিভিন্ন ইনস্যুরেন্স করিয়ে সেগুলোর ইনস্টলমেন্ট দিতে গিয়ে পাগলপ্রায় হয়ে যায়। অথচ এই এতটা নিরামিষ, এতটা নিরানন্দ জীবনাচারে নিজেদের এবং নিজেদের সন্তানদের অভ্যস্ত করানোর পরও, মাসের শেষ সাত থেকে দশটা দিন তাদের দুঃস্বপ্নের মতো যায়।

কেন এমন হয়? একটু ভেবে দেখেন, উত্তরগুলো পেয়ে যাবেন। দেশের সিস্টেমের কোথায় কোন গলদ আছে, কোথায় রক্তচোষা দুর্নীতিবাজরা ওঁত পেতে বসে আছে, কোথায় বলিউডি স্টাইলের স্বজনপোষণ হচ্ছে, এসবের কোনো কিছুই কারো অজানা থাকার কথা নয়। দিনরাত একাকার করে পরিশ্রম করেও কেন প্রাপ্য সম্মানীটা পাওয়া যায় না, নিজের যোগ্যতার তিন ভাগের এক ভাগ বেতনের চাকরি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়, এসব প্রশ্নের উত্তরও চাইলেই খুঁজে বের করা যায়। চাইলে ক্ষমতাবানদের ব্যাংক কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে আমলাতন্ত্রের উন্নাসিকতা, এই সবকিছুকেই দোষারোপ করা যায়। চাইলে একটু তলিয়ে ভেবে, সমস্যাগুলোর গভীরে যাওয়া যায়।

কিন্তু না, এসবের চেয়ে বরং ভিকটিম ব্লেমিং করাতেই সব সুখ! তাই তো সর্বোচ্চ দুই-তিন শতাংশ দৃশ্যমান মধ্যবিত্তকে দেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, সব দোষ আসলে তাদেরই। নিজেদের দোষেই তারা আজ ভুক্তভোগী। নইলে ছয়মাস তারা বসে বসেই খেতে পারত।

খুব সুন্দর কথা। একেবারে ভাইরাল হয়ে যাওয়ার মতো। এদিকে যে মানুষগুলো সারাজীবনেও কোনোরকম ভোগবিলাসিতার মুখ দেখেনি, সংসারের ঘানিই কেবল টেনে গেছে, না পেরেছে নিজের জীবনে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে কিংবা সন্তানের মুখে সত্যিকারের হাসি ফোটাতে, গত তিনমাস ধরে অর্থাভাবের জ্বালায় ক্রমশ দগ্ধ হয়েছে, তাদের বোধহয় এভাবে অভিযুক্ত হওয়াটাই বাকি ছিল। বাকি ছিল ফেসবুকে ঢুকে জানতে পারা যে ভুলগুলো সব তাদেরই ছিল! তাদের অদূরদর্শী চিন্তার কারণেই সংসারের আজ এই হাল।

এসব ভাইরাল কথাবার্তা ওই জীবনযুদ্ধে পরাজিত মানুষগুলোর সন্তানরাও দেখছে, তারাও এসে লাভ দিয়ে যাচ্ছে। এরপর হয়তো ফেসবুকের ভাইরাল কথায় প্রভাবিত হওয়া সন্তানরা একে একে তাদের সামনে এসে দাঁড়াবে, বলবে, ‘বাবা/মা, তোমাদের কারণেই আজ আমাদের এত কষ্ট!’ তখন ওই মধ্যবিত্ত অসহায় মানুষগুলোর ঘাড় আরো ন্যুব্জ হয়ে যাবে। সন্তানদেরকে ছেলেভোলানো কথাই তাদের বলতে হবে, ‘হ্যাঁ রে বাবা, ভুলগুলো সব আমাদেরই ছিল।’

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।