একজন মেসি ও আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ হতাশা

আর্জেন্টিনা নামটি বিশ্বে বহুল পরিচিত। আর সেটা কেবল ফুটবলের জন্যই। না, একটু ভুল বললাম। আর্জেন্টিনা আরেকটি কারণে পরিচিত, বর্তমান আর্জেন্টিনার সাথে আরেকজনের নাম জড়িয়ে আছে। তিনি হলেন মেসি। এ নাম দুটো নিয়ে ফুটবল সমর্থকদের যেন আগ্রহের দিন্দুমাত্র কমতি নেই। বিশেষ করে বিশ্বকাপ এলে আর মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়।

মেসিকে আমি দু ভাগে ভাগ করবো – আর্জেন্টিনার মেসি  ও বার্সেলোনার মেসি।

বার্সেলোনার মেসি বরাবরই দুর্বোধ্য, অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু স্বীয় দেশ আর্জেন্টিনাকে কতটুকু দিতে পেরেছেন মেসি? প্রশ্ন থেকে যায়। থাকারই কথা। কারণ অনেক নাম ডাকের ভিড়ে মেসি ছাড়িয়ে গেছেন খোদ ম্যারাডোনাকেও। বর্তমান ফুটবল বিশ্ব তাকে বসিয়েছে ম্যারাডোনার থেকেও উচ্চ আসনে। যে ম্যারাডোনার রয়েছে দুই দুই বার বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড।

অথচ মেসি সেই আরাধ্য বিশ্বকাপটি আজো ছুয়ে দেখতে পারেনি। দেশকে দিতে পারেনি কোন শিরোপার স্বাদ। অবশ্য ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে শিরোপার খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছে এই ফুটবল জাদুকর। জার্মানদের করা শেষ মুহুর্তের গোলটি আর্জেন্টাইন জাল ভেদ না করলে প্রেক্ষাপট এতোদিন ভিন্ন হতে পারতো।

গত বিশ্বকাপে দলকে ফাইনালে তোলাই ছিল মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন। তাছাড়া আর্জেন্টিনার মেসি বরাবরই নিষ্প্রভ। জাতীয় দলের হয়ে কখনই সেভাবে নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি পাঁচ বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই ফুটবল জাদুকর।

নিজ দলের হয়ে মেসি কেন নিজেকে মেলে ধরতে পারেনা? এমন প্রশ্নের একটাই জবাব। তা হলো- বার্সেলোনার মত আর্জেন্টিনা দলে মেসিকে অ্যাসিস্ট করার মত যোগ্য কেউ এখনো গড়ে ওঠেনি। ৯০ মিনিটের যুদ্ধে মেসি জাভি, ইনিয়েস্তার মত কাউকে পায়নি যে তাদের নিয়ে সে তার নিদারুণ ফুটবল শৈলী দিয়ে প্রতিপক্ষ শিবির ভেদ করে একের পর এক গোল নামক পেরেকটি ঠুকে দেবে। উলটো তাকে ম্যাচের পর ম্যাচ দলকে টিকিয়ে রাখতে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়, মিডিয়াতে নানান কথা শুনতে হয়। এমনকি মাঝে মাঝে তার সামর্থ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠে।

এখন আর্জেন্টিনার এবারের বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনা করা যাক। প্রথম ম্যাচে আনাড়ি আইসল্যান্ডের সাথে ড্র আর সর্বশেষ ক্রোয়েশিয়ার সাথে ৩-০ গোলে হেরে পুরোপুরি খাদের কিনারায় দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এতে চরমভাবে হতাশ ও বাকরুদ্ধ সমর্থকরা।

তবে দলের এমন বিপর্যয়ের কারণ কি? অনেকে অবশ্য এজন্য দায়ী করেছেন দলের কাণ্ডারী মেসিকে। কারণ তার উপর যে ছিল অনেক চাওয়া। উলটো মেসি ভরসার প্রতিদান না দিয়ে সবাইকে হতাশার সাগরে ভাসিয়েছেন। প্রথম ম্যাচে তো রীতিমত পেনাল্টি মিস করে জন্ম দিয়েছেন নানা বিতর্কের। কারণ পেনাল্টি মিস না করলে সেদিন আর্জেন্টিনা পুর্ণ তিন পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারতো। শুধু পেনাল্টি মিসই না। শেষ দুই ম্যাচে মাঠে পাওয়া যায়নি চিরচেনা মেসিকে।

অবশ্য এর পুরো দায় মেসির একার নয়। বলতে গেলে আর্জেন্টিনা দলটি এখন পুরোপুরি মেসি নির্ভর। যা তাকে চাপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রত্যাশার বোঝা কাঁধে নিয়ে সে পারফর্ম করতে পারছে না। তাছাড়া দলে নেই অন্য কোন ফুটবলার যার উপর সে প্রয়োজনে তার বিকল্প হিসেবে কাজে লাগাবে। এত সব কিছুর সাথে যুদ্ধ করে আসলে মেসি জয়ী হতে পারছে না। যার দরুণ আর্জেন্টিনাও বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।

এবার চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ভরাডুবির জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করাবো মুল আসামিকে। তিনি হোর্হে সাম্পাওলি। আর্জেন্টাইন কোচ। অনেকে তাকে ক্ষ্যাপাটে বা পাগলাটে বলে অভিহিত করেন। অবশ্য এর জন্য যথার্থ যৌক্তিকতা রয়েছে। আচরণ তো বটেই, সাম্পাওলির পাগলাটে আচরণ তার সিদ্ধান্তেও স্পষ্ট। মুলত এবারের বিশ্বকাপে তার ভুল ট্যাকটিকসের কাছেই বলি হয়েছে আর্জেন্টিনা।

প্রথম ম্যাচে ৪-২-৩-১ ফরমেশনে খেলালেও দ্বিতীয় ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার সাথে তিনি আকাশ-পাতাল ব্যবধান গড়েন। মাঠে খেলোয়াড় নামান ৩-৪-৩ ফরমেশনে। মুলত সাম্পাওলির এমন চিন্তাধারাই দলের ধস নামাতে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছে। তাছাড়া সাম্পাওলি এখনো দলের জন্য বেস্ট কম্বিনেশনটাই খুঁজে পাননি। দুই ম্যাচে তিনি ১৮ জন খেলোয়াড় মাঠে নামিয়েছেন। এ থেকে তা সহজেই প্রমাণিত হয়।

এছাড়াও সাম্পাওলির সাথে টিম ম্যানেজার এবং দলের সিনিয়র খেলোয়াড়দের সাথে রেষারেষির খবর পাওয়া গেছে ইতিমধ্যে। এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনাও মাঠের খেলায় যথেষ্ট প্রভাব ফেলছে।

আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় রাউন্ডের স্বপ্ন এখন পেন্ডুলামের মত দুলছে। ডু অর ডাই ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ আফ্রিকান সুপার ঈগল খ্যাত নাইজেরিয়া। মেসির আর্জেন্টিনা কি পারবে বিপর্যয় কাটিয়ে নাইজেরিয়াকে রুখে দিয়ে পরবর্তী পর্বের টিকিট কাটতে? তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে সামনের বুধবার পর্যন্ত।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।