মেহেদী-ঝুমকা জুটি: অশ্লীল যুগের হংস-মিথুন

ঢাকার চলচ্চিত্রে নব্বইয়ের দশকের শেষার্ধে এবং এর পরে ২০১০ সাল পর্যন্ত মেহেদী – ঝুমকা জুটি নৃত্যের ঝড় তুলে রূপালি পর্দা কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এই ‘কাঁপিয়ে দেওয়াটা’কে ওই সময়ের মধ্যবিত্ত নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখেছিল। কারণ, এই দু’জন ছিলেন ঢাকার ছবির অশ্লীল যুগের বেতাজ সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী।

সেই ঝড়ের কাহিনী অনেকের স্মৃতিতে আজো অম্লান। যদিও, একটা শ্রেণির মানুষদের কাছে এই জুটির গ্রহণযোগ্যতা ছিল। সেটাও ওই যৌন সুরসুরির কারণেই। কেউ কেউ বলতো, ছবিতে ‘মেহেদী-ঝুমকা’  জুটি থাকা মানেই – ‘যৌবন মাতানো নাচের নিশ্চয়তা।

পথে ঘাটে কেউ বা বলতো কি নাচ রূপালি পর্দায়! মেহেদী-ঝুমকারা কলুষিত করছে ঢাকার চলচ্চিত্রকে। এই জুটি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদের অশ্লীলতার কারণেই ভদ্র সমাজ সিনেমা হলের আশেপাশে যেতে চিরতরে ভুলে গেছে।

তবে, পুরোটা দোষ কি এই তারকাদের? না। চলচ্চিত্র জগতকে অশ্লীলতার জোয়ারে ভাসিয়ে দেয়ার জন্য কিছু নোংরা শ্রেণীর চিত্র নির্মাতাই সেদিন দায়ী ছিলেন।  ঢাকার ছায়াছবির জগত সেই অবস্থা থেকে আজো বেরিয়ে আসতে পারেনি।

মেহেদীর আসল নাম – নাজমুল হক শামীম। জন্ম ১৯৭৮ সালে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলার  মানিকখালী গ্রামে। পারিবারিক ভাবেই তিনি বেশ ধণ্যাঢ্য বলে জানা যায়।

শিশু শিল্পী হিসেবে অভিনয় শুরু করেছিল মেহেদী। পরবর্তীতে নায়ক হিসেবে অভিনয় করেছিলেন পাগল মন, বালিকা হলো বঁধু,  শুধু তোমারী, পরাণ কোকিলা, শত জনমের প্রেম, গরীবের অহংকার, দানব,  ধ্বংস, বাস্তব, নিরাপত্তা, রুটি, ক্ষুধার জ্বালা, নারী আন্দোলন, নিস্পাপ কয়েদী, গজব, খতম, বাবার জন্য যুদ্ধ, দমন, বাবার কসম, দু’জন দু’জনার, প্রিয়া আমার প্রিয়া, কদম আলী মাস্তান, জ্যান্ত কবর, নয়া কসাই,  মৃত্যু যন্ত্রণা, তীব্র প্রতিবাদ, দুর্ধর্ষ সম্রাট, নষ্ট ছাত্র, মেয়ে অপহরণ – ইত্যাদি ছবিতে।

শিশু শিল্পী হিসেবে মেহেদী অভিনয় করেছিলেন  ধন দৌলত, হাসু আমার হাসু, অন্যায়, মহান, নিয়ত, চেনামুখ, শরীফ বদমাশ, নান্টু ঘটক, জারকা, তিন বাহাদুর, মর্যাদা, নবাব, অহিংসা, কাবিন, নাগজ্যোতি, বিধাতা, উনিশ বিশ, দিদার, কসম ইত্যাদি সিনেমায়। বোঝাই যায়, নায়ক হওয়ার আগে সিনেমায় তার সূচনাপর্বটা বেশ মোক্ষমই ছিল। অথচ, তিনি অশ্লীলতার জোয়ারে গা ভাসিয়ে ক্যারিয়ার বিসর্জন দিলেন।

মেহেদীদের পুরান ঢাকায় বিশাল ব্যবসা আছে। এখন তিনি সেসব নিয়েই ব্যস্ত। পুরান ঢাকার মেয়ে ফারজানাকে বিয়ে করেছেন। তাদের দুই সন্তান। বছর দুয়েক আগে মঈন বিশ্বাস পরিচালিত ‘বুলেট বাবু’ নামের একটি ছবিতে তাকে খলনায়ক হিসেবে দেখা যায়। অশ্লীল যুগে গুজব ছিল, ঝুমকা আর মেহেদী নাকি গোপনে বিয়ে করে ফেলেছেন। যদিও, কখনও কেউই খবরটা প্রকাশ্যে স্বীকার করেননি।

ঝুমকার জন্ম ঢাকার সাভারে।  তার প্রথম ছবি হলো ‘জননেতা’। ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৯ সালে। ঝুমকা অভিনীত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ছবি হলো  দিল তো পাগল, রাজ গোলাম, অন্যায়ের প্রতিশোধ, দাঙ্গা দমন, খুনী চেয়ারম্যান, শত্রুর মোকাবেলা,  আগুন আমার নাম, কালা মানুষ, দুষ্ট মেয়ে, দিওয়ানা মাস্তান -ইত্যাদি। ঝুমকা আড়াশোটির মত ছবি করেছিলেন, অথচ মধ্যবিত্ত শ্রেণির অধিকাংশই তাঁর নামের সাথে পরিচিত নন।

সর্বশেষ তিনি ‘দাবাং’ নামের একটি ছবি করেন। বর্তমানে ঝুমকা বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন। ২০১৩ সালে তিনি আমেরিকা চলে যান। বর্তমানে তিনি সেখানেই রয়েছেন। স্বামী দেলোয়ার সাঈদ। এই দম্পতির রয়েছে একটি পুত্র সন্তান।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।