সামান্য ফল ব্যবসায়ী কিংবা বলিউডের অবিসংবাদিত সেরা

বলিউডের আল্টিমেট ‘ট্রাজেডি কিং’ নামেই বেশি পরিচিত তিনি। বলিউডের সর্বকলের সেরা অভিনেতা হিসেবেও গন্য করা হয় তাকে। তিনি শাহজাদা সেলিম, তিনিই  সবার প্রিয় দিলীপ কুমার। যে সময়টাতে হিন্দী সিনেমা দর্শকদের মনে আস্তে আস্তে জায়গা করে নিচ্ছিলো সেই সময়টাতে পুরো ভারতবর্ষে সবচেয়ে মননশীল একজন অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তিনি।

১৯২২ সালে পাকিস্তানের খাইবার অঞ্চলে এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। নাম রাখা হয়েছিল মুহাম্মদ ইউসুফ খান। কিন্তু ভারতীয় সিনেমা জগতে তিনি দিলীপ কুমার নামেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর পিতা লালা গোলাম সারওয়ার একজন ফলের ব্যবসায়ী ছিলেন।

তৎকালীন সময়ে তিনি ভারতের মহারাষ্ট্র প্রদেশ এবং পাকিস্তানের পেশোয়ারে ফলের ব্যবসা জমিয়ে তুলেছিলেন। দীলিপ কুমার নাসিকে দেওলিয়ার বার্নস স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু করেন। ১৯৩০ সালের শেষের দিকে তার বাবা ১২ সদস্যর পরিবার নিয়ে মুম্বাই সেই সময় বোম্বে শহরে পাড়ি জমান। ১৯৪০ সালে দিলীপ কুমার একজন ক্যান্টিন মালিক এবং একজন শুষ্ক ফল সরবরাহকারী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন।

১৯৪৩ সালে মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সেই সময়কার অন্যতম সেরা প্রযোজনা সংস্থা ‘বম্বে টকিজ’-এর মালিকানাধীন অভিনেত্রী দেবিকা রানী ও তাঁর স্বামী হিমাংশু রাই পুনের সামরিক ক্যান্টিনে দিলীপ কুমারের সাথে ভাগ্যক্রমে পরিচয় হয়। প্রথম পরিচয়ের দিনই সাধারণ একজন যুবক ইউসুফ খানের মাঝে একজন তারকার প্রতিচ্ছবি দেখতে পান তাঁরা।

তারই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪৪ সালের ‘জোয়ার ভাঁটা’ চলচ্চিত্রটির জন্য তাকে প্রধান চরিত্রে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং এই চলচ্চিত্রটিতে অভিনয়ের মাধ্যমে বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশ করেন ইউসুফ খান। প্রখ্যাত হিন্দি লেখক ভগবতি চরণ বর্মা তাঁকে পর্দায় নাম পরিবর্তন করে দিলীপ কুমার রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কারণ, তখনকার সময়ে মুসলমান নাম নিয়ে হিন্দি চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া বেশ কস্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। এভাবেই খুব সাধারণ একজন যুবক  ইউসুফ খান থেকে হিন্দি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি দিলীপ কুমারের পথচলা শুরু হয়।

দিলীপ কুমার ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পে ছয় দশকের অধিক সময় ধরে বিচরণ করেছেন এবং অভিনয় করেছেন ৬০টির বেশি ছায়াছবিতে। তিনি বিভিন্ন ধরনের বৈচিত্রময় ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, রোমান্টিক ধাঁচের চলচ্চিত্র হিসেবে ১৯৪৯ সালের আন্দাজ, ১৯৫২ সালের বেপরোয়া বা হঠকারী এবং চালবাজ চরিত্রে আন, ১৯৫৫ সালে ক্লাসিক চলচ্চিত্র দেবদাস, ১৯৫৫ সালের কমেডি চলচ্চিত্র আজাদ, ১৯৬০ সালে ঐতিহাসিক মুঘল-ই-আজম, এবং ১৯৬১ সালের সামাজিক ঘরানার চলচ্চিত্র গঙ্গা যমুনা। এসব সুপারহিট সিনেমার মধ্যে দিয়ে দিলীপ কুমার সফলতার শিখরে পৌছে গিয়েছিলেন তার অভিনয় দক্ষতা এবং অসাধারন নায়কোচিত সৌন্দর্যের মাধ্যমে।

মধুবালা ও দিলীপ কুমার – বলিউডের অবিসংবাদিত সেরা জুটি

প্রখ্যাত বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের মতে দীলিপ কুমার একজন কমপ্লিট গুণী অভিনেতা। বলিউডের প্রথম স্টার বা তারকা অভিনেতা তিনি। যিনি অসংখ্য ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিয়েছেন সাথে সমালোচকদেরও সন্তুষ্ট করেছেন। দিলীপ কুমার বিভিন্ন ভাষায় কথা বলতে পারেন। ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু এবং পশতু ভাষায় তাঁর সমান দখল আছে।

দিলীপ কুমার এর প্রথম চলচ্চিত্র ‘জোয়ার ভাঁটা’ তাকে খ্যাতির চূড়ায় পৌছাতে সাহায্য না করলেও পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে সেই সময়কার জনপ্রিয় অভিনেত্রী এবং গায়িকা নূরজাহানের বিপরীতে ‘জঙ্গু’ বক্স অফিসে তার প্রথম ব্যবসা সফল চলচ্চিত্রসহ ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন।

এক ফ্রেমে তিন প্রজন্মের তিন কিংবদন্তি

তাঁর ক্যারিয়ারে পরবর্তীতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাবসাসফল চলচ্চিত্র ছিল ‘শহীদ’। একটি ত্রিভূজ প্রেমের গল্পে রাজ কাপুর এবং নার্গিসের পাশাপাশি অভিনয় করেন তিনি। এই সিনেমাট বক্স অফিসে ব্যাপক সাফল্য লাভ করে। জনপ্রিয় পরিচালক মেহবুব খানের সাথে তার অভিনয় করা সিনেমাগুলো আলোচিত এবং ব্যবসাসফল হিসেবে বক্স অফিসে সাড়া জাগিয়েছিল সেই সময়।

এই সময়ে এসে বিয়োগান্তক ভূমিকায় অভিনয় শুরু করেন তিনি। জোগান, দীদার, দাগ, দেবদাস, ইহুদি, মধুমতি সহ বেশ কিছু কালজয়ী সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। তবে ১৯৫৪ সালে মেহবুব খানের ‘অমর’ সিনেমায় খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন। এই সিনেমাটি তাঁকে ‘ট্রাজেডি কিং’ হিসেবে সিনেমা পর্দায় প্রতিষ্ঠিত করেন। ‘দাগ’ সিনেমার জন্য প্রথম অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেছিলেন দিলীপ কুমার।

মুঘল ই আজম: দিলীপ কুমারের অনন্য এক কাজ

অসংখ্য সিনেমায় অভিনয় করলেও তার অভিনয় জীবনের সবচেয়ে সফল এবং ঐতিহাসিক সিনেমা হিসেবে বিবেচনা করা হয় ‘মুঘল ই আযম’ কে। ভারতীয় সিনেমা ইতিহাসে কে. আসিফের পরিচালনায় এই সিনেমা আজ একটি ক্ল্যাসিক হিসেবেই গন্য করা হয়। সেই সময়ের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং বিশাল ক্যানভাসের এই রোমান্টিক সিনেমায় তার সাথে জুটি বেধে অভিনয় করেছিলেন বলিউডের সবচেয়ে লাস্যময়ী অভিনেত্রী মধুবালা। দিলীপ কুমারের জীবনে প্রেম এবং বিচ্ছেদ এই শব্দ দুটির সাথেও মধুবালার নামটি জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে।

তাঁদের প্রেম, বন্ধুত্ব এবং পারিবারিক কারণে বিচ্ছেদ – এটা কোনো হিন্দি সিনেমার গল্পের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। জুটি হিসেবে হিন্দি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে সেরা পাচটি জুটির একটি তাদের জুটি। তবে নার্গিস, মিনা কুমারী, বৈজয়ন্তীমালার সাথেও তাঁর জুটি সুপার হিট ছিল। বিশেষ করে বৈজয়ন্তী মালার সাথে বেশিরভাগ সুপারহিট সিনেমা উপহার দিয়েছেন তিনি।

মধুবালার সাথে ছাড়াছাড়ি হবার পরে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন হিন্দি সিনেমার আরেক সুন্দরী এবং জনপ্রিয় নায়িকা সায়রা বানুকে। তাদের মধ্যকার বয়সের পার্থক্য ২২ বছরের। বিয়ের সময় অনেকেই মন্তব্য করেছিলেন যে, এই বিয়ে টিকবেনা। কিন্তু একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা এবং সম্মান নিয়ে অনেক ঝড় ঝাপটা পেড়িয়ে বেশ সুখেই সংসার করে যাচ্ছেন এই তারকা জুটি।

দিলীপ কুমারকে ব্যাপকভাবে হিন্দি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি একজন ভারতীয় অভিনেতা হিসেবে সর্বোচ্চসংখ্যক পুরস্কার বিজয়ী হওয়ার জন্য গিনেস বিশ্ব রেকর্ড ঝুলিতে নিজের জায়গা দখল করে নেন। তিনি তাঁর অভিনয় জীবনে ৮ বার ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা পুরষ্কার সহ ১৯ বার ফিল্মফেয়ার মনোনয়ন পেয়েছেন। ১৯৯৩ সাল থেকে ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মাননা পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত হন।

দিলীপ-সায়রা: দু’জন দু’জনার

২০১৫ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মবিভূষণ দেওয়ার ঘোষণা করেন। ১৯৯৪ সালে তাকে দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার প্রদান করা হয়। ১৯৯৮ সালে তাকে পাকিস্তানের সরকার দ্বারা প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক প্রস্কার নিশান-এ- ইমতিয়াজ প্রদান করা হয়। তিনি দ্বিতীয় ভারতীয় হিসেবে এই পুরস্কার লাভ করেন।

দিলীপ কুমারের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হল তিনি আজকের দিনেও সকলের আদর্শ। এখনো যখন নতুন কোনো অভিনেতা বলিউডে পা রাখেন, তিনি দিলীপ কুমার হওয়ার স্বপ্ন নিয়েই আসেন। এই একটা জায়গায় তাঁর কাতারে আর কেউ পৌঁছাতে পারবে না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।