মিডিয়াই তাঁদের হিরো বানায়: ইরফান খান

মাসখানেক আগেও যিনি দাপিয়ে বেড়িয়েছেন, এখন তাঁর ঠিকানা লন্ডনের হাসপাতাল। বিরল এক ক্যান্সারে আক্রান্ত তিনি। বলিউডে বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা এই অভিনেতা এখন আছেন লোকচক্ষুর আড়ালে। টুইটারে আপডেটই তাঁর ব্যাপারে জানার একমাত্র ভরসা। এরই মধ্যে সম্প্রতি তিনি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মুখোমুখি হয়েছেন এবিপি আনন্দ’র।

সম্প্রতি আপনি ‘হিন্দি মিডিয়াম’ সিনেমাটা করেছেন। আপনার কি মনে হয়, এই যে বাংলা মিডিয়াম, হিন্দি মিডিয়াম কিংবা ইংরেজি মিডিয়াম, এসব দিয়ে আদৌ কিছু এসে যায়?

– স্থানীয় বা মাতৃভাষার ভাল স্কুল কিন্তু এখনও কম। আসলে বাবা-মায়েরা মনে করেন, ছেলে বা মেয়ে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়লেই সেটা ক্যারিয়ারের জন্য ভাল। আর ইংরেজি ভাষায় পড়া মানেই একটা সুপিরিয়রিটি চলে আসে বাচ্চাদের মনে। কারণ এটা তো একটা আন্তর্জাতিক ভাষা। দেখবেন, এমন অনেকেই আছেন যাঁরা ইংরেজি না-জানার গ্লানি নিয়ে নিজেরাই নিজেদের শূলে চড়ান! দে ফিল ইনফিরিয়র। জানি না, কেন! আর এখানেই আমার চরিত্রটা ইন্টারেস্টিং। লোকটা ইংরেজি জানে না। এবং তাতে তার কোনও সমস্যার বালাই নেই। বাকিরা সারাক্ষণ তাই নিয়ে লোকটাকে টিটকিরি মারে। কিন্তু ওই লোকটা এসব পাত্তাই দেয় না!

আপনার সন্তানদের জন্য কি কোনও ‘আদর্শ’ স্কুল খুঁজে পেলেন?

– পেয়েছি। সেখানেই ওদের ভর্তি করিয়েছি। জানেন, ওখানে ওরা বিষয়গুলো যেন বাস্তবে বুঝে নিতে পারে সেভাবেই পড়ানো হয়। থিওরি কপচে কাজ সাড়া হয় না। থিওরিটিক্যাল শিক্ষাটা আমার মোটেই পছন্দ নয়। শিক্ষাটা হৃদয়ে পৌঁছাতে হবে। বুঝতে হবে।

আপনার স্কুলজীবনটা কেমন ছিল?

– আমার বেশি আগ্রহ ছিল খেলাধুলায়। যত এক্সট্রা-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ হতো, সবকিছুতে আমি থাকতাম। পড়ুয়া তো কোনওদিনই ছিলাম না। কাজেই একটা সময় আবার স্কুলটা জেলখানার মতো মনে হতে শুরু করেছিল। স্কুলজীবনটা একেবারেই উপভোগ করিনি। ভাবতাম, কবে এসব শেষ হবে!

কী শিক্ষা নিয়েছিলেন?

– বিরাট শিক্ষা। ওটাই তো একটা লার্নিং এক্সপিরিয়েন্স ছিল আমার কাছে, যে আমরা যেটা ভোগ করলাম, আমাদের ছেলেমেয়েরা যেন সেই একই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে না যায়। ওই শিক্ষাটা কাজে লেগেছিল।

ইংরেজিটা জানলে তবেই না হলিউডে যাওয়া যায়! এটা তো মানবেন?

– হা হা, তা তো বটেই! আর এজন্যই তো জোরগলায় বলছি, আরে ভাই হিন্দি আর ইংরেজির মধ্যে কোনও শত্রুতা নেই। যত বেশি পারো অন্য ভাষা শেখো। এটা তোমার চিন্তাভাবনার জগৎকে প্রসারিত করবে। অন্যভাবে ভাবতে পারবে। তবে নিজের ভাষাটা নিয়েও লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। এর থেকে পালিয়ে যেও না। এই কথাটাই পরিচালক ছবিতে বলতে চেয়েছেন।

– পরবর্তী হলিউড ছবিটা করছেন কবে?

করছি তো। ছবির নাম ‘দ্য পাজল’। কেলি ম্যাকডোনাল্ড (স্কটিশ অভিনেত্রী, হলিউডে বেশ কিছু নামী ছবিতে অভিনয় করেছেন ৪১ বছর বয়সি কেলি) রয়েছেন আমার বিপরীতে। প্রোডিউসার-টার্নড-ডিরেক্টর মার্ক টার্টলেটাবের পরিচালনা। ওঁর প্রযোজিত শর্ট ফিল্মগুলো আমাকে মুগ্ধ করেছে। খুব আশাবাদী ছবিটা নিয়ে। এই সেপ্টেম্বরেই মুক্তি পাবে।

অস্কার-টস্কারের স্বপ্ন দেখেন?

– দেখুন, এটা তো খুব স্বাভাবিক। যে পুরস্কারটা এত সম্মানজনক এবং যেটা তোমার সম্পর্কে একটা পারসেপশন তৈরি করে দিতে পারে, সেই পুরস্কার জেতার চিন্তা তো মাথায় আসবেই। অভিনেতারা তো স্বীকৃতিটাই চান। তবে, যখন পুরস্কারটা নিজেই ঠাট্টায় পরিণত হয়, তখন সে নিয়ে না ভাবাই ভাল।

আপনি নায়ক, নাকি অভিনেতা?

– দেখুন, আজকাল যে কাউকেই চাইলে পাওয়া যায়! স্টারডমে তো এখন কোনো রহস্যই নেই। মিডিয়া তাঁদের হিরো বানায়। কেউ কেউ যেটা দেখে বিশ্বাস করেন, তাঁরা বুঝি সত্যিই হিরো। কিন্তু আমার কাছে আসল হিরো তাঁরাই, যাঁরা অন্যের জীবন বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। আমরা তো মিডিয়ার তৈরি হিরো। আমার মনে হয় না যে, এটা আমরা ডিজার্ভ করি।

শরীর কেমন এখন?

– জীবনের কোনো গ্যারান্টি নেই। ক্যান্সার আমার জীবনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। আমার মন যেন সব সময় কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে, তোমার এই রোগ হয়েছে। যে কোনও সময় মৃত্যু হবে। কিংবা মাঝে মাঝে এই চিন্তাটা জাস্ট উড়িয়ে দিয়ে জীবন যেমন আছে, সে ভাবেই উপভোগ করছি। আমি বিশ্বাস করি, আমার ধৈর্যের কাছে ক্যান্সার হেরে যাবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।