ম্যাককালাম কিছু বললেই বা কী!

খেলোয়াড়ি জীবনে ম্যাককালাম ছিলেন ক্রিকেটের সত্যিকার চেতনা লালনকারী একজন। ভদ্রতা আর শিষ্টাচারের মূর্ত প্রতীক। ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেটের সত্যিকার দূত। ব্যাটিং আর ক্যাপ্টেন্সিতে যত আক্রমণাত্মকই হোন- আচরণে ছিলেন একদম বিনয়ের অবতার। আমরা যখন আর দশটা খেলা থেকে ক্রিকেটকে আলাদা করি, আওয়াজ তুলি ‘জেন্টেলম্যানস গেম’-এর, সেই সময় সবার আগে সামনে আসে ম্যাককালামের মতো চরিত্র। কাউকে অপমান করে দু’কথা দূরে থাক, ভঙিমায় পর্যন্ত কোনো বাজে ইঙ্গিত করেননি কখনো।

বলতে গেলে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের বেশীরভাগের চরিত্রই এমন। পুরো বিশ্বে তাসমান পাড়ের দেশটিকে জানে- শান্ত, নির্বিবাদী ও ভদ্র হিসেবে। ক’মাস আগে ক্রাইস্টচার্চেরর মসজিদে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর, নিউজিল্যান্ড প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ জনতা কী অসাধারণ আচরণ উপহার দিয়েছে- তা আমরা দেখেছি, শুনেছি ও জেনেছি।

আর এদিকে সমস্ত ভুলে ম্যাককালামের সামান্য একটা প্রেডিকশন নিয়ে আমাদের বীরত্ব আর লম্ফঝম্পের সে কী বাড়াবাড়ি! যেনো একটা ক্রিকেট ম্যাচ জিতে কত্ত হাতিঘোড়া মেরে ফেলেছি! অথচ বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের শেষাংশের আগে অতি ক্ষুদ্র একটা অংশ ছাড়া, বাংলাদেশ জিতবে এমন বিশ্বাস ছিল না কারো

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচ জেতার কথা গুটিকয় অতি আশাবাদী বাদে ভাবেননি কেউই। আর এখন বাগাড়ম্বর দেখে মনে হচ্ছে- বাংলাদেশ বুঝি দু’তিনটা ফেবারিটের একটা হিসেবেই গেছে বিশ্বকাপে। শুনতে খারাপ লাগলেও বলি- এইসব অতিরঞ্জন আর বাড়াবাড়ির কারণে কখনো কখনো কোনো কোনো ম্যাচের পর মনে হয়, বাংলাদেশ না জেতায় ভালো হয়েছে!

প্রেডিকশন ব্যাপারটা যার যার ব্যক্তিগত। আমার কথা বলি। এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ছাড়াও অন্তত পাঁচটা দলকে আমি দক্ষিন আফ্রিকার চেয়ে এগিয়ে রাখবো। অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড ও উইন্ডিজ। আবার ফাইনালিস্ট হিসেবে কিছুতেই নিউজিল্যান্ডকে ভাবতে পারি না। আর এদিকে উইন্ডিজ ফাইনাল খেললে অবাক হবো না মোটেও।

লক্ষ্য করুন, শ্রীলংকা-পাকিস্তান-আফগানিস্তান আলোচনাতেই আসেনি। আফগানিস্তানকে আমাদের দেশের অনেকেও খুব হাইলি রেট করেন। অথচ আমার ধারণা- নবম বা দশম স্থানই ওদের জন্য নির্ধারিত।

ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা। এখন আমার অনুমানের বিপরীত ঘটলে হা রে রে করে তেড়ে আসবেন তা তো হয় না। একেকজনের ভাবনা পদ্ধতি একেকরকম। আমি বাংলাদেশি, আমার চোখে বাংলাদেশের বিশ্বজয়ে যত নির্ভুল যুক্তি আর সম্ভাবনা থাকুক- অন্যজন সেভাবে না-ও দেখতে পারেন।

আফগান ক্রিকেটাররা বিশ্বচ্যাম্পিয়নের স্বপ্ন দেখেন, আমি দেখি ওদের তলানির দল হিসেবেই। এটা যার যার ব্যক্তিগত ক্রিকেট জ্ঞান, ধারণা বা মতামতের ব্যাপার। হ্যাঁ, বাকস্বাধিনতায় বিশ্বাসী হয়ে যা তা কথা বলা যাবে না অবশ্যই। তবে একটা খেলার বিশ্ব আসর নিয়ে একদম মেপে মেপে নির্ভুল মতামত দিতে হবে সে দিব্যিও দেয়নি কেউ।

আপনার যদি কারো আলোচনা, প্রেডিকশন বা মতামত স্রেফ ছেলেমানুষি মনে হয়- তবে তাঁকে খোঁচা দেয়া, গালি দেয়া, তাঁর জ্ঞান নিয়ে, তাঁর সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এসব কেমন আচরণ? আপনার নিজের সুস্থতায় আস্থা থাকলে আপনি তাঁকে ‘অসুস্থ’ বা ‘প্রলাপ’ বলে এড়িয়ে যান। আক্রমণ করবেন কেনো? বা, সেই আক্রমণেও তো একটা সীমা থাকতে হবে, নাকি!

তাছাড়া আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু যাকে করছেন, একবার মানুষটির দিকে তাকাবেন না? একজন নিউজিল্যান্ডারকে এভাবে অপমান করা ঠিক? তাও আবার সামান্য একটা প্রেডিকশন ঘিরে? ক্রিকেটের অনুসারী হলে ‘মানুষ’ ম্যাককালামকে তো চেনার কথা। কীভাবে তাঁকে বাড়াবাড়ি আক্রমণের শিকার বানান?

উগ্র জাতীয়তাবাদ ভাল কিছু নয়। এটা মানুষে মানুষে সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যের বদলে ঘৃণা, বিদ্রুপ আর বিদ্বেষ ছড়ায়। দেশের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান আর সম্ভ্রমবোধ থাকা খুব ভালো। তবে মাত্রায় বেশী হলে তা বর্জনীয়। পৃথিবীকে ঘৃণার বিষে নয় আমরা প্রীতির উচ্ছ্বাসে ভরিয়ে তুলতে চাই। খেলাধুলার উদ্ভবও সেজন্য। হানাহানি, যুদ্ধ, রেষারেষির বদলে সম্প্রীতির বাতাবরণ ছড়াতে।

ম্যাককালাম পুরো ক্যারিয়ারে খেলাধুলা বা ক্রিকেটের মূল স্পিরিট থেকে বিন্দুমাত্র সরেননি। অথচ তাঁর সামান্য একটা প্রেডিকশন নিয়ে আমরা মূল স্পিরিট থেকে কত দূরে সরে গেছি!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।