সাদাসিধে গল্পের মায়ায় ভাসানো নদী

আহ! আরেকটা মালায়ালাম ছবি পুরো ভাসিয়ে দিলো! কী অসাধারণ স্ক্রিন প্লে!

এতো সুন্দর মিষ্টি ডিটেইলিং রেখেছে পুরাটা সময়ে, যে আবারো বলতে হচ্ছে- এই লেভেলের ছবি দেখলে বলিউড আসলেই দেখা লাগেনা। অথচ কি সাদাসিধে একটা গল্প! ছবির নাম ‘মায়ানাধি’। ড্রামা, রোম্যান্স, ক্রাইম জনরার ছবি।

মাথান এক গ্যাংয়ের জন্য কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত এক পুলিশকে মেরে ফেলে। অন্যদিকে, আপ্পু একজন স্ট্রাগলিং অভিনেত্রী। বড় চিত্রনায়িকা বান্ধবীর সুবাদে বিভিন্ন জায়গায় অডিশন দিয়ে দিয়ে ক্লান্ত। পারিবারিক বিয়েশাদিতে গেলে তাকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাইক হাতে নিয়ে পরিচালিকার কাজ করতে হয়। এমনই একদিন সাবেক প্রেমিক মাথান তাঁর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছে। কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলে তার ভার্সিটির অনেক সিনিয়র বড় ভাই। অথচ ওরা সেসময় চুটিয়ে প্রেম করতো। মাথান কোন একভাবে বিশ্বাসভঙ্গ করেছিলো বলে আপ্পু আর তাঁর উপর ভরসা রাখতে পারছে না।

এদিকে মাথান বলে সে টাকা জমিয়েছে, দু’জন দুবাই গিয়ে সুখে শান্তিতে থাকতে পারবে। আপ্পু ভাবে কই সে এখানে নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, সেখানে মাথানের মতো চালচুলো নেই একটা ছেলের জন্য সব ছেড়ে দেবে? সারাদিন একটা টুপি মাথায় চাপিয়ে ঘুরছে। কি করছে না করছে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজনও বোধ করেনি আপ্পু।

আরেকদিকে ৩ জন পুলিশের একটা গ্রুপ ধীরে ধীরে কেসের সমাধান করে ফেলছে। ওদের মাঝে সবচেয়ে জুনিয়রজন সদ্য বিয়ে করেছে। ওদের মধ্যকার সম্পর্কটাও খুব বাস্তবিক আর সুন্দর করে দেখানো হয়েছে।

ড্রামা-রোমান্স-ক্রাইম গল্প একদম সহজসরল ন্যারেটিভে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু কি দারুণ চিত্রনাট্য! আপ্পুর স্ট্রাগলিং অ্যাক্ট্রেস জীবনের মাধ্যমে মালায়ালাম মুভি ইন্ডাস্ট্রি, পার্শ্ব চরিত্রে আপ্পুর সাথে তার নায়িকা বান্ধবীর সম্পর্ক, ওদের তিন ফ্ল্যাট মেইটের জীবনও উঠে আসে। ব্যাকস্টোরি সবার না দেখালেও পার্শ্ব চরিত্রগুলাও চমৎকারভাবে দু একটা দৃশ্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা, যে কখনোই মূল প্লট হারিয়ে যায়নি। বরং, আপ্পুর চরিত্র বেশি সুন্দরভাবে আঁকা হয়েছে।

দর্শক হিসেবে রোমান্স পছন্দ করলে মাথান আপ্পুর সম্পর্কের বাস্তবতায় লেখনীর সূক্ষ্মতা চোখে পড়বে। মিষ্টি, আবার রিয়েলিস্টিক। আহামরি সংলাপ নেই, মেলোড্রামা, বড়বড় স্পিচ নেই, পুরাটাই চিত্রনাট্যের কামাল!

ঐশ্বরিয়া লক্ষ্মী ও টোভিনো থমাস দুজনই আমার কাছে নতুন, কারণ মালায়ালাম ছবি দেখেছিই অল্প কয়েকটা। ঐশ্বরিয়ার সৌন্দর্য আর চেহারার আদলে কোথায় যেন বাংলাদেশের সাদিয়া জাহান প্রভাকে দেখি। সবচেয়ে বেশি ইউনিক লেগেছে টোভিনো থমাসের মাথান চরিত্রটা, টোভিনো এমনিতে কীভাবে অভিনয় করে জানিনা, তবে ওর এই চরিত্রের অভিনয় দারুণ লেগেছে!

দুটো গান – ‘কাতিল’ আর ‘মিঝিইল নিন্নুম’ তো শুনছি আর শুনছিই! দ্বিতীয় গানটা পুরাটাই লাভমেকিং দৃশ্যের ধারণ। চিত্রায়ন আর মুভিতে প্লেসিং এতো সুন্দর যে এটা ছাড়া ছবিটা হয়তো পূর্ণতা পেতো না। মায়ানাধি মানে ‘রহস্যময় নদী’। আক্ষরিক বাংলা করলে হয় ‘মায়ানদী’। আর এই রহস্যময়তা গানগুলার চিত্রায়নে চাইলেই খুঁজে পাওয়া যায়।

অসম্ভব মোলায়াম আবহ সঙ্গীত দিয়েছে আমার প্রিয় মালায়ালাম অল্টারনেটিভ রক ব্যান্ড ‘অ্যাভিয়াল’-এর লিড গিটারিস্ট রেক্স বিজায়ান!

‘মায়ানাধি’র গল্পটা অন্য কেউ অনেক ডালপালা লাগিয়ে উপস্থাপন করতে পারতো, সেরকম সুযোগ ছিলো, তা না করে এতো সিমপ্লিসিটির মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন আশিক আবু, যে ফ্যান হয়ে গেলাম। তাই খুঁত যা ছিলো, তা ছোটোখাটো মুহূর্তগুলোর উপস্থাপনা আর দুজনের প্রেমকাহিনীর সূক্ষ্মতায় ক্ষমা করে দিলাম।

এই ছবি রিমেক করলে এতোটা ভালো না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ এখানে একটু এদিক ওদিক করলে ফিলটা আর থাকবে না।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।