মাসুদ রানার বিচারক বিভ্রাট: ন্যাকা কান্না বনাম ফ্যাক্ট

অভিনেতার কাছে পরিচালক হচ্ছে শিক্ষকের মতো। যে জাতি শিক্ষকের মর্যাদা করতে জানে না, দুইটা কথা শুনলেই কেঁদেকেটে বাসায় গিয়ে গালি দেয়, সেই জাতির দেশে আর যাই হোক, সিনেমা জিনিসটা দাঁড়াবে না। এতেও যদি না বুঝেন তা হলে ‘হুইপল্যাশ’ ছবিটা দেখুন।

আজ ইফতেখার আহমেদ ফাহমির মতো ছোট পর্দার পরিচালকের জায়গায় অমিতাভ রেজা হতো? তারপরেও গালি খেত। কারণ বাঙালি না বুঝে অভিনয়, না পড়সে মাসুদ রানা, শুধু জানে কয়েকটা সুন্দরী নায়িকার খবর!

কে হবে মাসুদ রানা ঘটনার বিতর্কিত অডিশন রাউন্ডের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ফাহমির ফেসবুক পেইজ/ প্রোফাইল ঘাটলাম। ফারুকী ভাইবেরাদারদের সময় থেকে এই ভদ্রলোকের কাজের সাথে আমি সুপরিচিত। মূলত পরিচালক হলেও কিছু অভিনয়ের কাজও (উচ্চতর পদার্থ বিজ্ঞান, বিপরীতে আমি) উনি করে গেছেন।

ওদের দলের আশফাক নিপুণ, আদনান আল রাজীবদের সাথে সময় অসময়ে অনলাইনে পরিচয় থাকলেও ফাহমির সাথে কখনো হয়নি। তার পরিচালনা আর অভিনয়ের মোটামুটি একটা বিশেষ ভক্তকুল আছে, যার মাঝে আমি একজন। তাই তার বহুল প্রতীক্ষিত ‘টু বি কন্টিনিউড’ সিনেমাটা খুবই সীমিত পরিসরে মুক্তি পেলেও আমি বড় পর্দায় গিয়ে দেখেছিলাম। তাঁর সমসাময়িকদের মতো তার কাজ সেভাবে প্রচারণা পায়নি বলে অনেকটা পর্দার আড়ালেই মনে হয়েছে তাকে।

তারপর যখন কে হবে মাসুদ রানা হলো, অডিশন রাউন্ড দেখে আমি রীতিমত চমৎকৃত। আমি পুরো অডিশন রাউন্ড এপিসোডটাই দেখেছি। শুধু ওই ভাইরাল ফেসবুক ভিডিও না, যা পুরাই উদ্দেশ্যমূলক মনে হয়েছে। কিছু মানুষ মাসুদ রানা হতে গিয়ে ‘পচানি’ খেয়ে ক্ষোভ ঝাড়তে এটা করেছে। আর বাঙালি হুজুগে নাচে, সেটাই করছে। অথচ মাসুদ রানা কি, তার জন্য কি দরকার আর কেনো ফাহমি বা অন্য বিচারকরা এতোটা রুক্ষ ছিলো সেটা বোঝার চেষ্টা করে নি।

এখন ফাহমির যেকোনো পাবলিক ফটো সার্চ করলে দেখা যাবে সেখানে গালিগালাজ ভর্তি, প্রকাশ্যে হুমকি। এগুলা কি? আপনার কি মনে হয় এই অডিশন রাউন্ডটা বানোয়াট ছিলো? বা মিডিয়া স্টান্ট? হতে পারে। কিন্তু সত্যি করে বলেন তো যদি মাসুদ রানা পড়ে থাকেন বা অন্তত চরিত্রটা সম্পর্কে কিছুটাও জেনে থাকেন, আপনার মনে হয়েছে কোনো যোগ্য প্রতিযোগীকে বাদ দেয়া হয়েছে?

একটা ব্যাপার বুঝতে হবে যে, প্রতিটা প্রতিযোগিতার বাছাইপর্বের একটা নিয়ম নীতি থাকে। বিচারক কেমন মানুষ খুঁজছে এই ভূমিকায়, তা আপনাকে বুঝতে হবে। সেটার জন্য একদম এমটিভি রোডিজ লেভেলের অডিশন নিয়েছে ওরা। আপনি এটা বলতে পারেন এটা সম্পূর্ণ ‘roadies rip-off. But well done rip-off.’ তারা যেখানে যেখানে মজার নেয়ার কথা, সেটাই করেছে। আয়োজকরাই এই অথোরিটিটা দিয়ে রেখেছিল বিচারকদের।

তাঁরা কি কারো গায়ে হাত তুলেছে? শারীরিক নির্যাতন করসে? যা করেছে সেটাকে মানসিক নির্যাতন বলা যায়। একজন পরিচালক তার অভিনেতা অভিনেত্রীর সাথে কাজ উদ্ধার করতে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে, এই নিয়ম জানতে কি মিডিয়ার মানুষ হতে হয়?

যার জন্য যা জরুরী, সেটাই করতে হবে। যেকোনো সিনেমার কাস্টিং কাউচে কি কি হয় একটু নেটে ঘেটে আসুন। তাছাড়া এটা একটা ছেলেদের রিয়েলিটি শো! কোনো বিউটি শো না, এখানে মানসিক দৃঢ়তাই দেখা হয়। যাদের সেটা আছে তারা সহ সবাই একটা র‍্যাগিং প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে খুব স্বাভাবিক। এটা নিয়ে ‘ন্যাকা কান্না’র কোনো সুযোগ নেই!

তাছাড়া এটা একটা বিনোদন জগত ভাই। টেলিভিশনে ওই প্রোগ্রামকে গৎবাধা ‘ইয়েস নো’ ফরম্যাটে রাখলে মাছিও জানতে পারতো না এটার কথা। ইন্ডিয়ান আইডলই ধরেন। সেখানে আনু মালিক তার রুক্ষ ব্যবহারের জন্য পরিচিত ছিলেন, কিন্তু গালি খান নি।

প্রোগ্রামটার পরের রাউন্ডগুলায় দেখলাম অভিনয় বাদ দিয়ে, ফিটনেস টেস্টই করা হচ্ছে সেটা নিয়ে কথা বলেন। মাসুদ রানা রোলে আসলে নতুন মুখ কতটা জরুরী, সেটা বলা যায়। ফেলুদা, জেমস বন্ড বিভিন্ন গোয়েন্দা চরিত্রে আজীবন দেখেছি অভিজ্ঞদের নেয়া হয়। এক বাংলাদেশেই দেখলাম উল্টা। ফলশ্রুতিতে আরেকটা সস্তা বাণিজ্যিক সিনেমাই হবে, যা মনে হচ্ছে। কেননা, এইসব টেস্ট দিয়ে একজন অনভিজ্ঞ ছেলে যত প্রতিভাবানই হোক, সে ড্যানিয়েল ক্রেগ হবে না। কিন্তু আপনাকে বুঝতে হবে,

এসবই বিজনেস। এখানে সৃজনশীলতার ছিটেফোঁটাও দেখিনা। ওরা মাসুদ রানা খুঁজছে না। আরেকজন মডেল খুঁজছে।

শুধু একটা কথাই বলবো, একজন বড় ভাই হিসেবে সম্মান করার চেষ্টা করি, তিনি ছোট পরিচালক হলেও পরিচালক ভাই। উনি কিছুটা হলেও আপনার আমার চেয়ে এই শিল্পটা বেশি বোঝেন। অনর্থক তাকে সামাজিকভাবে ছোট করে আপনি বড় হচ্ছেন না। এটা আপনার কাজ না। বিচার করা তার কাজ ছিলো। তিনি সেটাই করেছেন বা করার চেষ্টা করেছেন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।