মাশরাফি, আত্মসম্মান, অপমান ও ‘চুরি’

প্রশ্নটা ছিল এমন –

যে প্রশ্নটা আপনার কাছে আসে তা অনেকটা আত্মসম্মানের। যে জায়গাটায় এখন দাড়িয়ে আছেন, বিশেষ করে ৮ ম্যাচে উইকেট নেই। ২০০১ সালে যখন শুরু করলেন নভেম্বরে টেস্ট ম্যাচ দিয়ে, ওয়ানডে খেললেন। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শুরু হয়েছিল, ফ্লাওয়ার ব্রাদার্সের উইকেট নিলেন। ২০০৭-২০০৮ সালে তিন চারটা ম্যাচে আপনি উইকেট পাননি, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আপনাকে পড়তে হয়নি। প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে বলেই কি একটা বাড়তি মোটিভেশন কাজ করছে, আপনার যদিও মোটিভেশনের দরকার পড়ে না।

জবাব মাশরাফি বিন মুর্তজা যা বললেন –

প্রথমত হচ্ছে যে, আত্মসম্মান বা লজ্জা- আমি কি চুরি করি মাঠে? আমি কি চোর? খেলার সাথে লজ্জা, আত্মসম্মান আমি মিলাতে পারি না। এত জায়গায় এত চুরি হচ্ছে, চামারি হচ্ছে তাদের লজ্জা নাই? আমি মাঠে এসে উইকেট না পেলে আমার লজ্জা লাগবে। আমি কি চোর? উইকেট আমি নাই পেতে পারি, আমার সমালোচনা আপনারা করবেন, সাপোর্টাররা করবে, লজ্জা পেতে হবে কেন? আমি কি বাংলাদেশের হয়ে খেলছি নাকি অন্য দেশের হয়ে ক্রিকেট খেলছি, যে আমার লজ্জা পেতে হবে। আমি পারিনি আমাকে বাদ দিয়ে দেবে। জিনিসটা সাধারণ। এখন কথা হচ্ছে, আমার লজ্জা, আত্মসম্মানবোধ কার সঙ্গে দেখাতে যাব? আমি তো বাংলাদেশের হয়ে খেলতে নামছি। আমি কি বাংলাদেশের মানুষের বিপক্ষের মানুষ। যে কেউ পারফর্ম নাই করতে পারে। সেটা তো তার ডেডিকেশন না থাকে, কোনো জয়গায় ঘাটতি থাকে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আসতেই পারে। আরেকটা সমালোচনা হতে পারে স্বাভাবিক- যেটা সারা পৃথিবীতেই হতে পারে, যে আমি উইকেট পাই না আমার সমালোচনা হবে। কিন্তু কথা যখন আসে লজ্জা, আত্মসম্মানবোধ তখন আমার প্রশ্ন থাকে। আমার সমালোচনা করুক, কিন্তু আমার আত্মসম্মানবোধ! আমি ক্রিকেট খেলতে এসে কি আমার আত্মসম্মানবোধ বিষর্জন দিতে আসছি নাকি। আমি কি অন্য দেশের হয়ে খেলছি,নাকি চুরি করছি, চামারি করছি। তা তো না। সুতরাং এই জিনিসটার সঙ্গে আমি মোটেও একমত না।

আরেকটা প্রশ্ন হচ্ছে যেটা বললেন – আন্তর্জাতিক প্রত্যেকেটা ম্যাচে চাপ থাকে। মুশফিক জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে গত ম্যাচে ২০০ করেছে, কাল যখন ব্যাটিং করতে নামবে, বলের একটা চাপ থাকবেই। পরিস্থিতির একটা চাপ থাকে। চাপ সবাইকে মানিয়ে নিতে হবে। আমার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, পারফর্ম করিনি,জিনিসটা একটু জটিল জায়গায় আছে। কিন্তু এটা নিয়ে ভেবে তো এখান থেকে বেরোতে পারব না। একইভাবে আমি নিশ্চতয়তা দিয়ে বলতে পারব না- কাল পাঁচ উইকেট পেয়ে সবকিছু শেষ করে দিলাম। তাতে কিছুই শেষ হবে না। একটা খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে একটা বয়স বা সময় আসেই, যখন প্রত্যেকটা দিনই তার জন্য চ্যালেঞ্জিং। আমি হয়তো ওই সময়ে আছি। আজ থেকে চার বছর পর মুশফিক, তামিম বা যারা আছে- তাদেরও ওই পরিস্থিতি আসবে। তরুণ ক্রিকেটাররা চাইবে তাদের সাথে মিলাতে। এটা একটা প্রক্রিয়া এটা নিয়ে এতকিছু ভাবনার আমি দেখি না।

১০ ম্যাচে এক উইকেট, বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে তিনি নেই, বোর্ড সভাপতি জানিয়ে দিয়েছেন সামনের বোর্ড মিটিংয়ে ওয়ানডে দলের নতুন অধিনায়ক নির্বাচন করা হবে। মানে বোর্ড তাঁর ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করে দিয়েছে। দেশের ক্রিকেটের অবিসংবাদিত সেরা অধিনায়ক তিনি, তারপরও তিনি বিদায় বলার আগেই বোর্ড তার বিদায় ‘নিশ্চিত করে ফেলেছে। এরপরও ‘আত্মসম্মান’ ইস্যুতে প্রশ্ন আসবে না, সেটা কি করে হয়!

আরো পড়ুন

যদিও, প্রশ্নটায় ওই একটা শব্দ বাদে কিন্তু নড়াইল এক্সপ্রেসকে অপমানজনক কোনো কিছুই বলা হয়নি। বরং ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকেই শেষ হয়েছিল। মাশরাফি অবশ্য ‘আত্মসম্মান’ ইস্যুতেই বেশি সময় কাটিয়েছেন। তার সাথে চুরি, চামারি, লজ্জা অনেক বিষয়কে মিলিয়েছেন। তিনি তার অবস্থানটা ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি তার জায়গা থেকে যেমন ঠিক আছেন, যিনি প্রশ্ন করেছেন, তিনিও তাঁর জায়গা থেকে ঠিক আছেন।

মাশরাফি আমাদের ক্রিকেটের নায়ক। কিন্তু, তার অবস্থান সুসংহত করতে আরেকজনকে খাটো করা কেন। কেন আরেকজনকে ভিলেন বানাতেই হবে! মাশরাফি নিজে অন্যকে খাটো করায় বিশ্বাস রাখেন না, তাহলে তার ভক্তরা কেন রাখবেন?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।