বিশ্বাস নিয়ে যাওয়াটা জরুরী: মাশরাফি বিন মুর্তজা

এশিয়া কাপে দু’বার রানার আপ হলেও কখনোই শিরোপা জেতা হয়নি বাংলাদেশের। দু’বারই তীরে এসে তরী ডুবেছে বাংলাদেশের। দুয়ারে আরো একটি বিশ্বকাপ। হয়তো, এরপরে আর কখনোই এশিয়া কাপে মাঠে নামা হবে না মাশরাফি বিন মুর্তজার। মাশরাফি কি পারবেন নিজের শেষটা রাঙিয়ে দিতে? অধিনায়ক হিসেবে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এসে তিনি জানিয়েছেন এশিয়া কাপকে ঘিরে নিজেদের পরিকল্পনার কথা।

সাকিবের ফিটনেস ইস্যু নিয়ে অধিনায়ক হিসেবে আপনি কতটা চিন্তিত?

শেষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে সাকিব যেভাবে খেলেছে, সেই হিসেবে সাকিবই সবচেয়ে ভালো বলতে পারবে সে কেমন আছে। সবমিলিয়ে যদি আপনি সাকিবের পারফর্মেন্স দেখেন, তাহলে বলতে হবে আমাদের জয়ের জন্য তাঁর পারফর্মেন্স অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে। আমার কাছে মনে হয় ও অতটুকু সুস্থ থাকলে সেটা দলের জন্য যথেষ্ট। তবে সিদ্ধান্তটা সাকিবের। এখানে কারো কোন হাত নেই। সিদ্ধান্ত নেয়ার পর এখানে অজুহাতের কোন জায়গা থাকার কথা না। সে যখন খেলবে তখন শতভাগ দিয়েই খেলবে।

স্কোয়াড নিয়ে আপনার কি ভিন্ন কোনো চাহিদা ছিল?

টুর্নামেন্ট খেলতে যাওয়ার আগে অযথা বিতর্ক সৃষ্টি করার কোন মানে হয় না। আমাদের যেই দল আছে সেই দল নিয়েই আমরা ভালো খেলতে পারি, এতটুক বিশ্বাস নিয়ে যাওয়া জরুরী। আশা করি যারা আছে তাঁরা যথেষ্ট ভালো প্লেয়ার, এশিয়া কাপে ভালো করার জন্য।

শেষ তিন এশিয়া কাপ ও এবারের এশিয়া কাপ – কিভাবে তুলনা করবেন?

এত আগে থেকে মনে হওয়ার কিছু নেই। আগের দুই-তিন এশিয়া কাপে খেলা এখানে খুব বেশি ম্যাটার করবে না। এবার ফরম্যাটটাও ভিন্ন। দুইটি টিম বাড়াতে প্রথমে নট আউট পর্ব পার করে আসতে হবে, এরপর সবার সাথে খেলতে হবে। একটু অন্যভাবে সাজানো এবারের ফরম্যাটটা। মূল কথা হচ্ছে, প্রথম ম্যাচটা খুব গুরুত্বপূর্ণ আমাদের জন্য। প্রথম ম্যাচটা যদি ভালো করতে পারি তাহলে সব কিছু ঠিক মত চলবে।

শান্তর ফিটনেসের অবস্থা কি? কোনো বিকল্প পরিকল্পনা আছে কি?

শান্তর যেই ইনজুরি ছিল আশা করি সেটা ঠিক হয়ে যাবে। টুর্নামেন্টের আগে থেকেই হয়তো সে অনুশীলন শুরু করতে পারবে। আর যদি কোন সমস্যা হয়ে তাহলে নির্বাচকদের সাথে আলাপ করে আপডেট জানাব। দুইজন প্লেয়ারকে অবশ্যই আমরা চিন্তা করছি।

বাস্তবতা বিবেচনায় এশিয়া কাপে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কতটুকু?

সম্ভাবনা কতটুকু এভাবে আসলে বলা যায় না। দল গুলো যদি দেখেন, তাহলে আমরা খুব বেশি পিছিয়ে নেই। হয়তো ভারত অনেক ভালো দল। পাকিস্তান তাদের ঘরের মাঠে খেলবে। কিছুটা বাড়তি সুবিধা তাঁরা পাবে। তাদের দলে রিস্ট স্পিনার বেশি আছে। তবুও আমার কাছে মনে হয় আমাদের সামর্থ্য আছে তাদেরকে হারানোর। আমরা শুরুটা কেমন করি আর পরের রাউন্ডে যেতে পারি কিনা, সেটা দেখতে হবে। এখানে বিভিন্ন ক্যালকুলেশন আছে। সব কিছু ঠিক থাকলে আমার কাছে মনে হয় আমরা খুব বেশি পিছিয়ে নেই।

আগের দুই এশিয়া কাপ থেকে এবারের এশিয়া কাপটা কি বেশি কঠিন?

আগে যেই টুর্নামেন্ট খেলেছি সেগুলোও কঠিন ছিল। এবারো অবশ্যই কঠিন থাকবে, সিচুয়েশন অবশ্যই কঠিন হবে। আর সেখানে (আরব আমিরাতে) আমরা দল হিসেবে খেলি নি, এটাও একটা পয়েন্ট। অনেক জায়গা আমরা সফল হয়েছি যেখানে আমাদের সামর্থ্যে অনেক প্রশ্ন ছিল। এমন অনেক ভালো খারাপের মধ্য দিয়েও আমরা সফল হয়েছি। এগুলো আসলে আমার কাছে খুব বড় ইস্যু মনে হয় না। ইস্যু হচ্ছে, আমরা শুরুটা কেমন করছি, আমরা শ্রীলঙ্কার সাথে কেমন খেলছি। আমার কাছে হয় আসন্ন ১৫ তারিখটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

২৩ বছর পর আরব আমিরাতে খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এটা কতটা চ্যালেঞ্জিং হবে? আর ২৫০ উইকেটের মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে আপনি কতটা রোমাঞ্চিত?

একই কথা বার বার আসছে। আসলে আমরা কতটুকু প্রস্তুত আছি টুর্নামেন্টটা জেতার জন্য, আপনারা অনেকে টুর্নামেন্ট জেতার কথা বলছেন। আমি আবার এই টাইপ না, আমি এই ধরনের কথা বলতে চাই না। আমি মনে করি আমাদের সামর্থ্য আছে। বাকি দল গুলোর সাথে যদি তুলনা করেন, কন্ডিশন, উইকেট ও কিছু টুকটাক ব্যাপার থাকে…রিস্ট স্পিনাররা কেমন ফর্মে আছে। সব কিছু মিলিয়ে আমাদের থেকে বেটার টিম আছে এই টুর্নামেন্টে। তবে বাকি দলের সাথে খুব বেশি পার্থক্য আছে বলে মনে হয় না। সেই পার্থক্যটা আমরা ভালো ক্রিকেট খেলে পূরণ করতে পারি, আমার কাছে সব কিছুই সম্ভব মনে হয়। সবকিছুর আগে নির্ভর করছে আমরা প্রথম ম্যাচটা ভালো খেলে জিততে পারি কিনা। আর আমার নিজের কোন লক্ষ্য থাকে না। ওয়েস্ট ইন্ডিজও যাই নি, এখানেও যাবো না। কখনো এমন লক্ষ্য নিয়ে যাই না। আমি চেষ্টা করব অবদান রাখার, যতটুক পারি। এটা খারাপও হতে পারে ভালোও হতে পারে। এটা নিয়ে আসলে এত মাথা ব্যথা নেই। আর টুর্নামেন্টের শুরুতে তো থাকেই না।

গেল আফগান সিরিজে বাংলাদেশ স্পিনারের বিপক্ষে ধুঁকেছে। এশিয়া কাপে এটা কি তাই দুশ্চিন্তার কারণ, বিশেষ করে আফগানিস্তানে রশিদ খানের মত বিশ্বমানের লেগ স্পিনার আছে?

রশিদ খান অবশ্যই বিশ্বমানের লেগ স্পিনার, বিশেষ করে এই দুই ফরম্যাটে। একটা ইতিবাচক দিক হচ্ছে, টি-টিয়েন্টিতে শর্টস খেলার চাপ থাকে, ওয়ানডেতে সেটা থাকে না… ব্যাটসম্যানরা ওয়ানডেতে দুই-তিন ওভার সময় পাবে তাঁকে দেখে খেলার। তবে তাঁকে বুঝে উঠতে পারা খুব জরুরী। গুগলি বা লেগ স্পিন যেটা আছে সেটা বুঝতে পারতে হবে। যারা বুঝতে পারে তাদের সমস্যা হবে না। আর রশিদ খানকে খেলতে সারা বিশ্বের সব ব্যাটসম্যানদেরই সমস্যা হচ্ছে। এখানে মানসিকভাবে কিছুটা শক্ত হলে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাবে। তবে রশিদ খানের আগে আমাদের শ্রীলঙ্কার স্পিন, পেস বোলিং হ্যান্ডেল করা বেশি জরুরী। আমরা যদি প্রথম ম্যাচ জিততে পারি তাহলে যেই আত্মবিশ্বাসটা পাব সেটা দিয়ে রশিদ, মজিব, নবিদের হ্যান্ডেল করা অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। আর শ্রীলঙ্কার সাথে যদি খারাপ হয় তাহলে সেটা দুইগুণ বেশি কষ্ট হবে। প্রথম ম্যাচটা আমাদের জন্য অনেক কিছুই সেট করে দিবে।

দলের দুর্বলতার দিক কোনটি?

আসলে দুর্বলতা নিয়ে কথা না বলাই ভালো। একটা দল টুর্নামেন্টে যাচ্ছে, এখন ইতিবাচক কথা বলাই ভালো। প্রতিটা দলেরই দুর্বলতা আছে, আমাদেরও অবশ্যই আছে। আমরা সেটা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। একটা টুর্নামেন্টের আগে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়েই যাওয়া ভালো। আমরা ওয়েস্ট ইন্ডিজে ওয়ানডে, টি-টুয়েন্টি সিরিজ জিতে এসেছে। আশা করি প্লেয়াররা সবাই ভালো ছন্দে আছে, ফ্রেম অব মাইন্ডে আছে। যা আমদের সেখানে প্রথম ম্যাচে ভালো খেলতে সাহায্য করবে।

কোহলি নেই, এটা কি বাংলাদেশের জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট?

এটা আসলে ভারতের ব্যাপার। কোহলি না থাকায় তাঁরা কিভাবে মাইন্ড সেট করবে সেটা তাদের ব্যাপার। অবশ্যই বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় সে, ভারতের কি হবে জানি না। তবে আমরা বিশ্বাস রাখি, কোহলি থাকতেও আমরা তাদের হারিয়েছি। আবার অন্যান্য দলের জন্য কোহলির না থাকাটাও অনেক বড় সুবিধা, এটাও সত্যি কথা। আমাদের গ্রুপ পর্বে ওদের সাথে কোন খেলা নেই। তাই এখন তাদের নিয়ে ভাবার সুযোগ একটু কম।তবে ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, কোহলির না খেলা সবার জন্যই বড় সু

আরব আমিরাতের উইকেট আমাদের জন্য অপরিচিত। সেদিক থেকে তামিম-রিয়াদের পিএসএল অভিজ্ঞতা কতটা কাজে দেবে?

আসলে দলে তাদের নিজেদেরও তো বড় দায়িত্ব আছে। তামিমের সাম্প্রতিক সময়ের ফর্ম দেখেন, ওর ব্যাটিং এর দায়িত্ববোধ যদি দেখেন, একই কথা রিয়াদের জন্যও… অবশ্যই তাদের অবদান খুবই জরুরী। আমার মনে হয় না শুধু তাদের কাছ থেকেই ইনপুট নেয়ার প্রয়োজন আছে। অস্ট্রেলিয়ায় যখন ২০১৫ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলি, তাঁর আগে কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আমাদের স্মৃতি খুব ভালো ছিল না। সেটাই বললাম, যদি মাঠ বা আউটফিল্ড আমাদের পক্ষে না থাকে তাহলে পারফর্ম করতে পারব না, সেই বিশ্বাস নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। আমাদের মনে হয় আমাদের সামর্থ্য আছে, তাঁর সাথে রিয়াদ, সাকিব,মুশফিকও খেলেছিল সেখানে। তামিম খেলেছে অনেকদিন এবং সে পারফর্মও করেছে। তাদের ইনপুট থাকাটা জরুরী। আমাদের যারা তরুণ প্লেয়ার, আসলে তাঁরা এখন আর তরুন প্লেয়ার না… তিন,চার, পাঁচ বছর ধরে খেলছে অনেকে, তাদের আপনারা তরুণ প্লেয়ার বলছেন। তিন বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার পরও তাদের তরুন প্লেয়ার বলতে একটু বাঁধা লাগা উচিত। আমার বিশ্বাস যে তারাও পারফর্ম করবে।

ছয় দলের মধ্যে কোন দলের সম্ভাবনা বেশি? আমাদের জন্য কোন দল হুমকির কারণ হতে পারে?

আমাদের জন্য সবাই হুমকি। বিশেষ করে আমাদের গ্রুপে যারা আছে, ছয় দল পর্যন্ত যাওয়ার আগে তো আমাদের তিনটা দলের সাথে খেলা হবে। আফগানিস্তানের বোলিং শক্তি, শ্রীলঙ্কার অলরাউন্ড সামর্থ্য, সব দিক বিবেচনা করলে যে কোন কিছুই হতে পারে। আমি সবসময় বলে আসছি, আমাদের প্রথম ম্যাচটা গুরুত্বপূর্ণ। এটা আমরা যদি জিততে পারি ভালো ভাবে, তাহলে এশিয়া কাপে ভালো করার সুযোগ থাকবে।

একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসি। ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত জীবন কতটা চ্যালেঞ্জিং?

ক্রিকেটের সাথে সংসার, আসলে যারা চাকরি করছে তাঁরাও তো সংসার করছে। এখানে কঠিন কিছু নেই। পুরোটাই একজন আরেকজনের সাথে বোঝাপড়ার বিষয়। আমার তো মনে হয় চাকুরীজীবীদের থেকে ক্রিকেটারদের সংসার করাটা আরও সহজ। আমাদের অফুরন্ত গ্যাপ থাকে, সুযোগ থাকে পরিবার নিয়ে সফর করার। এটা একজন চাকুরীজীবী বা অন্যান্য পেশায় থাকে না। এটা যুগলদের জন্য আরও ইন্টারেস্টিং, স্পোর্টস আসলে বন্ডিংটা আরও শক্ত করে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।