নড়াইলের ছেলেটা এখন অবিসংবাদিত কিংবদন্তি

সকাল গড়িয়ে দুপুর। ঘুম ঘুম ভাব এখনো কাটেনি। ভ্যাপসা গরম। অ্যাপস জানাচ্ছে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এখন ঢাকায়। অন্তত: ছয় ডিগ্রি বেশি তাপমাত্রায় দুই সপ্তাহ মরু অঞ্চলে ক্রিকেটারগুলোর কথা ভাবলাম। শরীরে খুন্তির ছ্যাঁকা দেয়ার মত গরমে সবার অবস্থা খারাপ। খুব খারাপ। মন? সম্ভবত সেটা মাপার যন্ত্র পাওয়া গেলে দেখা যেতো, একেকজন যদি পারতো কালকের রাতটা আরেকবার ফিরিয়ে এনে নতুন করে জয়ের চেষ্টা করতো।

মন খারাপের ভারি চাদরটা সারা শরীরে পেঁচিয়ে এদিন ঘুম ভেঙেছে ঢাকার। বাংলাদেশের। এতো কাছে তবু এতো দূরে! কোন শিরোপা যেনো কুহুলীকা। আলেয়ার মত খালি ডেকে আবার উধাও।

মন খারাপ আমাদের তাড়া করে আইজাজ চিমার সেই রাজ্জাকের লেগ স্টাম্পে আঘাত করার ছয় বছর আগের রাতটা থেকে। মিরপুর থেকে কলম্বো হয়ে দুবাই। মন খারাপের রাতটা শেষ হচ্ছে না। কখনো দিনেশ কার্তিক কখনো কেদার যাদব সহ পুরো ভারতীয় দলটাই। হয়তো এর চেয়েও বড় কাপটাই জিতবো সামনে। তাই এমন ক্রিকেট বিধাতার নিষ্ঠুর রসিকতা।

একটা জম্পেশ ফাইনাল হলো। ভারতের সাবেক পেসার জহির খান একতরফা ফাইনালের জন্য বাংলাদেশকে ভারতের প্রতিপক্ষ হিসেবে চাননি। এই ফাইনালে অনেক ভারতের সাবেক ক্রিকেটার টুইট করলেও, তার কোন বক্তব্য এখনো সামনে আসেনি। বেচারা লজ্জা পেয়েছে। এমন অনেক লজ্জাই কাল পেয়েছে ভারত সহ পাকিস্তান এমনকি শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা। লঙ্কান মিডিয়া কমিটির একজন দেখলাম এই ফাইনালের আগে মাশরাফীর ফাইনালে জয়ের আশার কথা শুনে তীব্র উষ্মা প্রকাশ করেছেন।

তার মতে বাংলাদেশের চেয়েও ভাল দল আফগানিস্তান। কেনো যে এরা এশিয়া কাপ খেলতে আসে! অথচ নিজের ঘরের ঠিক নেই। নিজেদের দলের অধিনায়ক শুধু নেতৃত্বই নয়, জায়গাই হারিয়েছেন দল থেকে। এক হাতুরুসিংহের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া টের পেতে শুরু করেছে শ্রীলঙ্কা।

পাকিস্তানের এক ছুপা রুস্তম যিনি মিরপুরে তুম মেরা ভাই হো , বেনিফিট অফ ডাউট নিয়ে গ্যালারিতে থাকে, তাকেও দেখলাম ভারতীয় জার্সিতে মুগ্ধ চোখে খেলা দেখতে। এই ফাইনালকে উদ্দেশ্য করে এশিয়ার ক্রিকেট অক্ষটাকে এক হতে দেখেছি। হাসিও পেয়েছে।

এক বাংলাদেশ যে কত অস্বস্তির কাঁটা ভারত ও পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার জন্য সেটা বারবার মনে করিয়ে দেয়ার কোন দরকার ছিল না। তারা এ দেশের ক্রিকেটকে পাত্তা দিতে চায় না। কিন্তু মনে মনে মেলা অস্বস্তিতে থাকে। ফাইনালে হারার পর দেখলাম কি পরিমান স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলছেন উপমহাদেশের অন্য দুই বড় শক্তি।

এই যে অস্বস্তিতে তাদের মনে কালো মেঘের জন্ম দেয়া একটা শিরোপার চেয়ে কম নয়। স্বান্তনা নয়, এটাই সত্যি। চ্যাম্পিয়ন হইনি। বাংলাদেশ এই আসরের গত দুই আসরের রানার্সআপ। আরেকটু বড় করলেন গত চার আসরের তিনটিতেই রানার্সআপ। যেখানে ছয় বছর ধরে পাকিস্তানও লংকা একবারই ফাইনাল গেছে।এটা স্বীকার করতে গেলে হয়তো একটু বাধো বাধো ঠেকে অনেকেরই। তাতে ফ্যাক্ট পরিবর্তন হয় না।

লিটন দাস বাংলাদেশের ২৪ তম ওপেনার হিসেবে সেঞ্চুরি করেছেন কাল। এটা নতুন না। বেচারা এক ফাইনালের আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠতে গিয়েও পারলেন না। ওপেনার হিসেবে তামিম ও সৌম্য’র ৯৪ বলের দ্রুতগতির শতককে পেছনে ফেলেছেন। তিনি কেন লিটন দাস সেটা অন্তত: এদিন প্রমান করতে পেরেছেন।

আশা করছি অন্য অনেকের মত অধারাবাহিকতার রোগ তাকে পেয়ে বসবে না। তিনি হলেন পঞ্চম ক্রিকেটার যিনি ফাইনালে হেরেও ম্যাচ সেরা হয়েছেন। সবশেষ এই ঘটনা ঘটেছিল রাহুল দ্রাবিড়ের বেলায় ১৯৯৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ত্রিদেশীয়তে।

এশিয়া কাপে প্রথম দশ ওভারে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ১২ উইকেট হারিয়েছে। গড় ১৩.৩৩। ওভার প্রতি রান ৩.২০। ভারত মাত্র একবারই দশ ওভারে তাদের ওপেনিং জুটি খুইয়েছে। গড় ২৮২! ওভার প্রতি রান ৫.৬৪। ফাইনালের আগে ৫ ম্যাচে বাংলাদেশের রান ছিল ৫২ উদ্বোধনী জুটি থেকে। দুই দলের পার্থক্যটা চোখে পড়ে যায় এখানেই। অনেকে মুশফিক-মাহমুদউল্লাহর উড়িয়ে মারাকে দোষ দিচ্ছেন। ব্যর্থদের নিয়ে সমালোচনা হবেই। এতো ভাল শুরুর পরও ওরকম উড়িয়ে মারার সমালোচনা হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু গিলোটিনে তোলার আগে এটা মাথায় রাখা উচিত মুশফিকের দুই ইনিংস বাদ দিলে বাংলাদেশের এই ফাইনালে ওঠা হয়না।

মিঠুনের দুই ফিফটির সঙ্গে মাহমুদউল্লাহর আফাগানিস্তানের বিপক্ষে ফিফটিটা কত মূল্যমানের সেটা নির্ণয় করা কঠিন। শেষ বেলায় এসে কেনো সবাই মিলে পারছে না এটা বড় প্রশ্ন। কিন্তু অনেক উত্তরও তো দিয়ে গেলো এই এশিয়া কাপের ফাইনাল। ভারত শেষ বলে এসে ম্যাচ জিতেছে মাত্র তিনটি। শুরু করেছিল ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। এ বছরই দুবারই তাদের প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ। তার মানে দাঁড়াচ্ছে ভাগ্যটাও আমাদের সাথে থাকছে না শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।

সাকিব-তামিম ছাড়া আমাদের প্রায় অর্ধেক শক্তির দলের বিপক্ষে জিততে তাদের যে কালঘাম ঝড়েছে, সেটা শক্তি যোগায়। সাহস দেয়। ক্রিকেট বাণিজ্যে শুধু নয়, মাঠের পারফরর্ম্যান্সের অধারাবাহিকতাতেও পাকিস্তান এখন আর ভারতের সম প্রতিপক্ষ নয়। ১১০ কোটির সাথে প্রায় ২০ কোটি মানুষের বাড়তি বাণিজ্যের জন্যই ভারতের উচিত নিয়মিত বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজ আয়োজন করা।

ভারত যদি সাত মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশের বিপক্ষে শেষ বলে দুই ফাইনাল জয়ের পরও যদি না বোঝে মাশরাফীদর ক্রিকেটের জোর, তবে বুঝতে হবে উট পাখি হলেই প্রলয় বন্ধ হয় না। দানে দানে তিন দান আসতে সময় লাগে না। কে জানে লন্ডনেও সেটা হয়ে যেতে পারে! মন তাই বলে। অন্তত: দুবাইয়ের ফাইনাল বুঝিয়ে দিয়েছে তুমি ভারতই হও বা অন্য কেউ, ২২ গজের প্রতি ইঞ্চিতে বাংলাদেশের সঙ্গে মেপে লড়তে হবে।

কেনো? এক মাশরাফি এবার যে রসদ নিয়ে প্রবল বিক্রমে লড়েছেন বড় দলগুলোর বিপক্ষে, তাকে যে রমিজ রাজার মত পাকিস্তানিরাও ‘কাপ্তান অব এশিয়া’ খেতাব দিচ্ছে সে জন্যই। এমএস ধোনি পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলে সত্যিকারের নেতা। বিরাট কোহলি প্রভাবশালী হতে পারেন, কিন্তু নড়াইলের ছেলেটা এখন অবিসংবাদিত কিংবদন্তি।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।