রাজা সবারে দেন মান, সে মান আপনি ফিরে পান

মাশরাফির ব্রেসেলেটের নিলামের পুরো আয়োজনটাই ছিল ভালো লাগায় টইটম্বুর। একটি-দুটি মুহূর্ত আলাদা করা কঠিন। তার পরও দুটি মুহূর্ত আমার কাছে ছিল অসম্ভব ভালো লাগার।

প্রথমটি, ব্রেসলেট আবার তাকেই উপহার দেওয়া হচ্ছে শোনার পর যখন অবিশ্বাস, বিস্ময় আর ভালো লাগা মেশানো হাসিতে দুহাতে মুখ ঢাকলেন মাশরাফি।

দ্বিতীয়টি, যখন বিএলএফসিএর চেয়ারম্যান ও আইপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব মমিন ইউ ইসলাম বললেন, ‘আপনি এই দেশকে যে সম্মান এনে দিয়েছেন, সেই সম্মানের প্রতিদান আসলে কোনোভাবেই হয় না। শুধু এটুকু করে আমরা চেষ্টা করেছি, আপনাকে কিছুটা হলেও সম্মান জানাতে।’

স্টিলের সামান্য একটি ব্রেসলেট। মাশরাফির দেড় যুগের নিত্য সঙ্গী হয়ে সেটি হয়ে উঠেছে অসামান্য। যে দেশে নিলামের কালচার সেভাবে নেই, ৪২ লাখ টাকা সেখানে অবশ্যই অনেক বড় অঙ্ক। কিন্তু এই ব্রেসলেটের যে আবেদন ও মাশরাফির যে বিশালত্ব, সেটির তুলনায় এই অঙ্ককে মমিন ভাইরা বড় কিছু মনে করেননি। আমার অসাধারণ লেগেছে যে তিনি বলেছেন, ‘এই স্মারকটি আসলে অমূল্য, কোনো মূল্য হয় না।’

বিএলএফসিএ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন। আইপিডিসি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। মাশরাফির প্রতি দেশের মানুষের আবেগ-ভালোবাসাকে ধারণ করা তাদের জন্য খুব জরুরি কিছু ছিল না। ওই ব্রেসলেটকে ঘিরে মাশরাফির যে আবেগ, সেটিকে সম্মান করাও তাদের জন্য অপরিহার্য কিছু ছিল না। কিন্তু তারা করেছেন। মানুষের আবেগ-ভালোবাসা, মাশরাফির আবেগ, নিজেদের ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ, সবকিছু তারা এতটা দারুণভাবে উপস্থাপন করেছেন, অসাধারণ বললেও কম হয়। তাদের প্রতি সামান্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলে খুব অন্যায় হয়।

মানবতা বা এসব কিছু যদি গভীরভাবে ভাবতে নাও চান, স্রেফ বাংলাদেশ ক্রিকেটের ক্ষুদ্র অনুসারী বা সমর্থক হোন, বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় নায়কদের একজনকে এভাবে সম্মান জানানো হয়েছে, স্রেফ এটুকু থেকেও শ্রদ্ধাবোধ আসার কথা তাদের প্রতি। মাশরাফি বলেছেন, তার অসম্ভব ভালো লাগছে। মাশরাফিকে এমন একটি অনুভূতি উপহার দেওয়ার জন্য হলেও ধন্যবাদ বিএলএফসিএকে।

হ্যাঁ, অবশ্যই এই নিলাম জিতে তারা অনেক প্রচার পেয়েছেন। অবশ্যই প্রবলভাবে আলোচনায় উঠে এসেছেন। খুব নির্মোহভাবে বললে, এটিরও আর্থিক মূল্য আছে। অবশ্যই আছে। কেউ বলতে পারেন, তাদেরও স্বার্থ আছে। ঠিক আছে। কিন্তু এত ভালো কাজ করে একটু প্রচার নাহয় পেল, সমস্যা কোথায়! আমরা তো নিত্য কতশত খারাপের প্রচার করি, ভালোর প্রচারে দ্বিধা থাকার তো কারণ তো নেই। আমরা সবসময় বলে থাকি, এই দেশে গুণীর কদর হয় কম। তো বিএলএফসিএ গুনীর কদর করল, মাশরাফির প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে সম্মান করল। তাদেরকে সম্মান করলে নিশ্চয়ই আমাদের ভাণ্ডার ফুরিয়ে যাবে না!

দেশটা তো বাংলাদেশ, প্রশংসার জোয়ার যেমন বইবে, সমালোচনা ও কটাক্ষের স্রোতও বয়ে যাবে নিশ্চিত। এই ভালোর মধ্যে কালো খোঁজা হবে। কালির দাগ লাগানো হবে। সবচেয়ে বেশি যেটা বলা হবে, ‘মাশরাফির কি টাকার এতই অভাব যে নিলাম করতে হবে?’

হ্যাঁ, আপনি ঠিক। আসলেই তার টাকার এত অভাব। গত প্রায় ২ মাসে ত্রাণ-সাহায্য-সহযোগিতায় অসংখ্য কাজ তিনি করেছেন। ১৫০০ পরিবারের ত্রাণ সহায়তার জন্য তালিকা করেন, শেষ পর্যন্ত সেই তালিকা গিয়ে ঠেকে ৩২০০ পরিবারে। হকার, দিন মজুর, খেটে খাওয়া মানুষদের আবার আলাদা করে সাহায্য করেন। খেয়া ঘাটের মাঝি, রিকশা-ভ্যান চালক, মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন, মোটর সাইকেলে খ্যাপ মেরে যারা পেট চালান, রাজমিস্ত্রী, এরকম এমন কোনো পেশার লোক নেই, যাদেরকে পেশা ধরে আলাদা করে সাহায্য করেননি।

এছাড়াও ব্যক্তিগত পর্যায়ে অমুকের নানা, তমুকের চাচা, এসব সাহায্য তো আছেই। চিকিৎসাসেবায় যেসব কাজ করেছেন ও উদ্ভাবনী পদক্ষেপ নিয়েছেন, কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। সব মিলিয়ে এই ২ মাসে যত পদক্ষেপ নিয়েছেন, সব বলেও শেষ করা কঠিন। এবং সেসবের বেশির ভাগই করেছেন নিজের টাকায়। নিজের সঞ্চয় থেকে লাখ লাখ টাকা খরচ করেছেন এবং করে চলেছেন। তিনি শিল্পপতি নন যে অঢেল টাকা আছে। তিনি ক্রিকেটার, যিনি এখন বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তিতে নেই। ঢাকা লিগ এবার হবে কিনা, সেই নিশ্চয়তা নেই। কাজেই সেই আয়ও অনিশ্চিত।

তিনি একজন ক্রিকেটার, যার ক্রিকেট জীবনে এখন গোধূলী বেলা। খেলা ছাড়ার পরের দীর্ঘ জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতে হয়। তিনি একজন এমপি, যার সামান্যতম অবৈধ সুবিধা নেওয়ার নজির এখনও নেই। তিনি একজন এমপি, এই দুর্যোগ শুরুর আগেও গত দেড় বছর ধরে সরকারী সাহায্যের পাশাপাশি নিজের পকেট থেকে যিনি এলাকায় অনেক কাজ করে আসছেন। করোনাভাইরাসের এই প্রকোপ সহসাই থামছে না। মানুষের পাশে তাকে থাকতেই হবে। তার অর্থের অফুরন্ত ভাণ্ডার নেই।

মাশরাফিকে আমি যতদূর চিনি, নিজের সঞ্চয় থেকে সাহায্য করার সময় দেদার খরচ করলেও এই ৪২ লাখ টাকার প্রতিটি পয়সার হিসাব তিনি রাখবেন। প্রতিটি পয়সার উপযুক্ত ব্যবহার করবেন। মানুষের ভালোবাসার আমানতের ওজন তিনি জানেন।

শুধু মাশরাফিই কেন, ক্রিকেটারদের নিলাম নিয়ে গত কিছুদিন ধরেই অনেকের বাঁকা কথা চোখে পড়ছে। অনেকেই বলছেন, নিজের পয়সা খরচ না করে তারা নাকি নিলামের ভণ্ডামির আশ্রয় নিচ্ছেন। আমি জানি না, এই লোকগুলি কোন জগতে থাকে। করোনাভাইরাস দুর্যোগের শুরু থেকেই তো আমাদের ক্রিকেটাররা যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তারা কি দেখেননি? সবাই তো বেশির ভাগটুকুই করেছেন নিজের পয়সায়।

আবারও বলছি, তারা ক্রিকেটার, শিল্পপতি নন। ক্রিকেট ক্যারিয়ারের স্থায়িত্ব খুব কম। সেই সময়টুকুও আবার অনিশ্চয়তায় ভরা। নিজের জীবন, পরিবার, ভবিষ্যৎ, এসব ভাবতে হবে না? তার পরও তারা যথেষ্টর বেশি করে চলেছেন। সিনিয়রদের কথা যদি বাদও দেই, এই রুবেল হোসেন বা নাজমুল ইসলাম অপু, বোর্ডের চুক্তিতে তারা নেই, আয়ের বড় উৎস ঢাকা লিগ অনিশ্চিত, কত আয় তাদের? তার পরও তারা কত কিছু করছেন! সমালোচনা করা মানুষগুলি কি এসব দেখে না? চোখ থাকতেও অন্ধ হলে অবশ্য কিছু করার নেই।

যাহোক, তুমুল ভালো লাগার আবহের মধ্যেও কিছু নেতিবাচক কথা আনতে হলো। দুঃখিত। এই নিলামের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত ছিলেন, নাফিজ মোমেন ভাই, প্রীত রেজা এবং সংশ্লিষ্ট সবাই, বাংলাদেশ ক্রিকেটের ক্ষুদ্র অনুসারী হিসেবে আমার কৃতজ্ঞতা সবার প্রতি।

আরেকটা ব্যাপার চোখে পড়ল, ফেইসবুকে অনেকেই দেখলাম তুলনা শুরু করেছেন, কার নিলাম থেকে কত টাকা এলো, কে জিতল, এসব। দয়া করে এসব বন্ধ করুন ভাই। এটা কোনো রান-উইকেটের খেলা নয়। জীবন বাঁচানোর লড়াই। যে অঙ্কই আসছে, পুরোটাই মানুষের জন্য।

সবশেষে মাশরাফির জন্য কেবল একটিই কথা, মাঠের ভেতরে-বাইরে আপনার এই নিরন্তর ছুটে চলার পথে সমাজের পঙ্কিলতায় মাঝেমধ্যে আপনি থমকে যান, একটু হতাশা পেয়ে বসে। এবার নিশ্চয়ই দেখেছেন, ভালোবাসা কীভাবে ফিরে আসে!

‘রাজা সবারে দেন মান, সে মান আপনি ফিরে পান…’

– ফেসবুক ওয়াল থেকে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।