মাশরাফির সরে যাওয়াই কি সমাধান?

এমন একটা দিন ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজার জীবনে আসবে কেউ কি কল্পনাও করেছিলো কোনোদিন?

মাত্র কয়েক মাস আগেও দেশের সবচাইতে জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন মাশরাফি। এখন এত বছর জ্বলজ্বল করা সেই ছবি উল্টে গেছে। দেশের একটা মানার মতো, গোনার মতো অংশ ক্রিকেট অনুসারী মাশরাফিকে পছন্দই করেন না আর। আরো সত্য বললে ম্যাশ এখন তাদের ঘৃনার হিট লিস্টে।

এই ম্যাশ বিরোধিতা আর ম্যাশ ঘৃনার মূল কারনই যে তার রাজনীতিতে ঢুকে পড়া – তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে? সেক্ষেত্রে মাশরাফির রাজনৈতিক দলের ঘোর বিরোধীরা প্রধান অংশ। একটা বড় অংশ অবশ্যই আছে যারা ক্যারিয়ার চলাকালীন খেলোয়াড়দের পলিটিকসে নাম লেখানোর সমর্থক না একদম। এই দলে খোদ মাশরাফির পলিটিক্যাল পার্টির অনেক সাপোর্টারও আছেন।

এবার আসি বর্তমানে। চলমান বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রসঙ্গে। ২০১৫র বিশ্বকাপে সবার আগে মাশরাফির চোখ দিয়ে দেখা প্রায় অসম্ভব একটা স্বপ্ন সংক্রামিত হয়ে পড়েছিলো পুরো জাতির চোখেমুখে। আমরা পরের বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল খেলবো। পারলে ফাইনাল খেলবো। আরেকটু পারলে চ্যাম্পিয়নও হয়ে যাবো!

বাঙালি, বাংলাদেশ এখন সেই স্বপ্নের সেনাপতিকেই ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাইছে যুদ্ধের ময়দান থেকে। হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষ এখন আর চাইছেনা মাশরাফি খেলা চালিয়ে যাক বিশ্বকাপে!

আংশিক জনগণের এই চাওয়ার পিছনে কিছু যুক্তি তো আছেই!

মাশরাফির ফিটনেস আগের মতো নেই। বোলিংয়ে স্পিড, বাইট নেই৷ ব্যাটিং তো শূন্যের কোঠায়। পারফরম্যান্স তলানিতে। বিশ্বকাপে এরই মধ্যে তিন ম্যাচ খেলে ফেলা বাংলাদেশ দলে মাশরাফির পেইস বোলিং ইউনিট জ্বলে উঠতে পারেনি একদিনও। অথচ পরিস্থিতি বিবেচনায় রুবেল হোসেনের মতো পরীক্ষিত বোলারের সুযোগই আসেনি মাঠে নামার। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিস্ময়করভাবে রুবেলকে সুযোগ না দেওয়ার পিছনে মাশরাফিরও হাত ছিলো এমনটি ধরে নিয়েছেন অনেকেই।

এদিকে আমাদের ক্রিকেটমহলে সাবেক ক্রিকেটার, সংগঠকদের কেউ কেউ মাশরাফিকে অবসর নেওয়ার অনুরোধ করছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়।

পুরো ব্যাপারটাই বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যাচ্ছে দেখতে দেখতে। এটা আইপিএল, বিপিএল নামের ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ না যে ফ্র‍্যাঞ্চাইজি মালিকদের চাপে যখন যাকে খুশি বসিয়ে দেবেন, যখন খুশি তখন অধিনায়ককে সাইডলাইনড করে দেবেন।

মনে রাখতে হবে আমাদের মাশরাফি বিন মর্তুজা এখনও বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্রিকেট অধিনায়ক। বোলিংয়ে এখনও ফিরে আসার সামর্থ্য রাখেন আগের মতো না হলেও দলের জন্য কন্ট্রিবিউট করার মতো।

যারা মনে করেন, মাশরাফি কেবলই ক্যাপ্টেন কোটায় খেলেন তাদেরকে মনে করিয়ে দেই গত চার বছর ওডিআইতে উন্নয়নশীল যে বাংলাদেশকে দেখেছে বিশ্ব প্রতিদিন, তার পিছনে এই অপারেশন-সার্জারিক্লান্ত ‘খোড়া’ মানুষটার অবদান অনেক। বোলার হিসাবে যতটা, অধিনায়ক হিসেবে তাঁর চেয়ে অনেক অনেক বেশি।

এই বিশ্বকাপে সাকিব আল হাসান ছাড়া আর কেউই ধারাবাহিক পার্ফরমার হতে পারেননি আমাদের এখন পর্যন্ত। সদা নির্ভরযোগ্য তামিম, রিয়াদও যথেষ্ট ভুগিয়েছেন দলকে। মুশফিকও নিজের সেরাটা দিয়ে উঠতে পারেননি এখনো। তাদের নিয়ে এতটা কি হুলুস্থুল হচ্ছে?

হচ্ছে না। আসলে পুরো দলকেই ফিরে আসতে হবে প্রয়োজনীয় ফর্মে। ভালো কিছু করতে হলে। শুধু মাশরাফিকে টার্গেট করা বোকামি বা অতি চালাকি।

আমি, আপনি, তুমি, সে – সবাই বুঝি বাংলাদেশ এখনো বিশ্বকাপ জেতার মতো দল না। তবে সেমিফাইনালে কষ্টমষ্ট করে উঠেও যেতে পারে। গত তিন ম্যাচের দুইটায় হেরে সেই স্বপ্ন অবশ্যই ফিকে হয়ে পড়েছে কিছুটা। তবে এখন থেকে জিততে থাকলে যেহেতু সম্ভাবনা জেগে উঠবে আবার তাহলে হাল ছাড়া কেন?

আমাদের এই ইউনিটটাই ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা রাখে যে কোনো দিন এবং তা মাশরাফির নেতৃত্বেই।

এই মুহূর্তে মাশরাফিকে সরানোর চিন্তা করা বড় একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে দলের আত্মবিশ্বাসে আর ঐক্যে। তা আমরা যারা ক্রিকেটকেই আগে দেখি তারা চাই না।

খোড়া ঘোড়া যদি দৌড়াতে দৌড়াতে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যেতে পারে একবার, আরেকবারও তো অনেক দূর যেতে পারে। সেই সুযোগ তো দিবেন তাকে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।