রহস্যময় নায়ক ‘মাশরাফি: কিছু অভিযোগ ও তার জবাব

পৃথিবীর একমাত্র ব-দ্বীপের দেশ বাংলাদেশ! আয়তনে ছোট এই দেশটির দক্ষিণ পশ্চিমের জেলা নড়াইলে ১৯৮১ সালে পাঁচ অক্টোবর মুর্তজা পরিবারে জন্ম নেয় এক শিশু। ছোটবেলা থেকেই সে ধরাবাঁধা পড়াশোনার পরিবর্তে ফুটবল আর ব্যাডমিন্টন খেলতেই বেশি পছন্দ করতেন, আর মাঝে মধ্যে চিত্রা নদীতে সাঁতার কাটা।

তারুণ্যের শুরুতে ক্রিকেটের প্রতি তার আগ্রহ জন্মে, বিশেষত ব্যাটিংয়ে; যদিও এখন বোলার হিসেবেই তিনি বেশি খ্যাত, যেজন্যে তাকে ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ নামেও অভিহিত করা হয়। বাইকপ্রিয় মাশরাফিকে সবাই খুব হাসিখুশি আর উদারচেতা মানুষ হিসেবেই জানে। প্রায়শই তিনি বন্ধুদের নিয়ে বাইকে স্থানীয় আপন মনে ঘুরে বেড়ান। নিজের শহরে তিনি প্রচণ্ড রকমের জনপ্রিয়।

সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ার সময় সুমনা হক সুমির সাথে তার পরিচয় হয়। মাশরাফির সাথে একই ক্লাসে পড়তো সুমনা হক সুমী। কলেজে থাকতে মাশরাফি রোজ সুমনাদের বাড়ি যেতো নোট আনতে আর এভাবেই একদিন দুজন দুজনের প্রেমে পড়ে গেলো। দু’জনের পরিবারের কেউই প্রথম দিকে তাদের বিয়েতে মত দেয় নি।

কিন্তু পরে অনেক জেদাজেদি এবং মাশরাফির নাহিদ মামার আপ্রাণ চেষ্টাতে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মাশরাফি এবং সুমীর বিয়ে হয়। মাশরাফির সন্তান দুইজন। ১ মেয়ে এবং ১ ছেলে। মেয়ের নাম হুমায়রা এবং ছেলের নাম সাহেল।দু’জনে ২০০৬ সালে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন। মাশরাফি বাংলাদেশের সফলতম পেস বোলারদের একজন।

আক্রমণাত্মক, গতিময় বোলিং দিয়ে অনূর্ধ-১৯ দলে থাকতেই তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ সাবেক ফাস্ট বোলার অ্যান্ডি রবার্টসের নজর কেড়েছিলেন, যিনি কিনা তখন দলটির অস্থায়ী বোলিং কোচের দায়িত্বে ছিলেন। রবার্টসের পরামর্শে মাশরাফিকে বাংলাদেশ এ-দলে নেয়া হয়। বাংলাদেশ এ-দলের হয়ে একটিমাত্র ম্যাচ খেলেই মাশরাফি জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান।

৮ নভেম্বর, ২০০১ এ বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে টেস্ট ক্রিকেটে তার অভিষেক ঘটে।একই ম্যাচে খালেদ মাহমুদেরও অভিষেক হয়। বৃষ্টির কারণে ম্যাচটি অমীমাংসিত থেকে যায়। মাশরাফি অবশ্য অভিষেকেই তার জাত চিনিয়ে দেন ১০৬ রানে ৪টি উইকেট নিয়ে। গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার ছিলেন তার প্রথম শিকার শুরু।

মজার ব্যাপার হল, মাশরাফির প্রথম ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচও ছিল এটি। তিনি এই বিরল কৃতিত্বের অধিকারী ৩১তম খেলোয়াড় এবং ১৮৯৯ সালের পর তৃতীয়। একই বছর ২৩ নভেম্বর ওয়ানডে ক্রিকেটে মাশরাফির অভিষেক হয় ফাহিম মুনতাসির ও তুষার ইমরানের সাথে। অভিষেক ম্যাচে মোহাম্মদ শরীফের সাথে বোলিং ওপেন করে তিনি ৮ ওভার ২ বলে ২৬ রান দিয়ে বাগিয়ে নেন ২টি উইকেট। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ব্যক্তিগত তৃতীয় টেস্ট খেলার সময় তিনি হাঁটুতে আঘাত পান।

এর ফলে তিনি প্রায় দু’বছর ক্রিকেটের বাইরে থাকতে বাধ্য হন। ইংল্যন্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট খেলায় তিনি সফলতা পান। ৬০ রানে ৪ উইকেট নেয়ার পর আবার তিনি হাঁটুতে আঘাত পান। এযাত্রায় তিনি প্রায় বছরখানেক মাঠের বাইরে থাকতে বাধ্য হন। ২০০৪ সালে ভারতের বিরুদ্ধে খেলার সময় রাহুল দ্রাবিড়কে অফ-স্ট্যাম্পের বাইরের একটি বলে আউট করে তিনি স্বরুপে ফেরার ঘোষণা দেন।

সেই সিরিজে তিনি ধারাবাহিকভাবে বোলিং করেন এবং টেন্ডুলকারকে ও গাঙ্গুলিকে আউট করার সুযোগ তৈরি করেন তবে ফিল্ডারদের ব্যর্থতায় তিনি উইকেট পাননি। এই সিরিজের একটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভারতের বিরুদ্ধে অবিস্মরণীয় জয়ের নায়ক ছিলেন তিনি।

২০০৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে তিনি বেশ ভালো বোলিং করেন। বাংলাদেশি বোলারদের মধ্যে তার গড় ছিল সবচেয়ে ভাল। কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে নাটকীয় জয়ে তিনি অবদান রাখেন। তিনি মারকুটে ব্যাটসম্যান অ্যাডাম গিলক্রিস্টকে শূন্য রানে আউট করেন এবং দশ ওভারে মাত্র ৩৩ রান দেন। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে ভালো পেস বোলারের ঘাটতি ছিল।

বাংলাদেশে মোহাম্মদ রফিকের মত আন্তর্জাতিক মানের স্পিনার থাকলেও উল্লেখযোগ্য কোন পেস বোলার ছিল না। মাশরাফি বাংলাদেশের সেই শূন্যস্থান পূরণ করেন ২০০৬ ক্রিকেট পঞ্জিকাবর্ষে মাশরাফি ছিলেন একদিনের আন্তর্জাতিক খেলায় বিশ্বের সর্বাধিক উইকেট শিকারী। তিনি এসময় ৪৯টি উইকেট নিয়েছেন।

২০০৬ সালে নাইরোবিতে কেনিয়ার বিরুদ্ধে মাশরাফি ২৬ রানে ৬ উইকেট নেন, যা তার সেরা সাফল্য।২০০৭ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে অবিস্মরণীয় জয়ে মাশরাফি ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ৩৮ রানে ৪ উইকেট দখল করেন। বিশ্বকাপের প্রস্তুতি খেলায় নিউজিল্যান্ডের সাথে বিজয়েও মাশরাফির ভূমিকা রয়েছে। মাশরাফি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ গতির বোলার ছিলেন।

মাশরাফি একজন মারকুটে ব্যাটসম্যানও বটে। ভারতের বিপক্ষে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় একদিনের আন্তর্জাতিক খেলায় তিনি পরপর চার বলে ছক্কা মারেন। সেই ওভার থেকে তিনি ২৬ রান সংগ্রহ করেন যা কোন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানের জন্য এক ওভারে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড।২০০৯ সালের শুরুতে মাশরাফি অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুলের সহকারী ছিলেন।

পরবর্তীতে ওই বছরেরই জুন মাসে তিনি মোহাম্মদ আশরাফুলের স্থলাভিষিক্ত হন এবং তার সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পান সাকিব আল হাসান।কিন্তু অধিনায়ক হিসেবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে নিজের প্রথম ম্যাচেই তিনি হাঁটুতে আঘাত পেয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি। ঐ খেলায় বাংলাদেশ জয়লাভ করে কিন্তু মাশরাফি এই চোটের কারণে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাঠের বাইরে ছিলেন।১৬ বছরের ক্যারিয়ারে ১১ বার চোটের কারণে দলের বাইরে যেতে হয়েছে মাশরাফিকে। চোটই তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল ২০১১ সালের দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ।বিশ্বকাপ দলে না থাকা মাশরাফির কান্না ছু্ঁয়ে গেছিল কোটি ভক্তের মন।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হাঁটুর ইনজুরি দিয়ে শুরু, এরপর গত ১৫ বছরে ১১বার ইনজুরিতে পড়েছেন মাশরাফি। যার মধ্যে বাঁ হাঁটুতে চার বার এবং ডান হাঁটুতে অপারেশন হয়েছে তিনবার। টেস্ট অধিনায়কত্ব পাবার প্রথম দিনেই ইনজুরিতে পড়েছেন, ইনজুরির কারণে মিস করেছেন ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ। তবুও হাল ছাড়েননি। হাল ছাড়ার ব্যাপারটি যে তার অভিধানেই নেই!

প্রতি বার মাশরাফি ইনজুরির সাথে লড়াই করে ফেরেন, আর তার ডাক্তার অস্ট্রেলিয়ান ডেভিড ইয়াং চোখ কপালে তুলে বলেন, ‘এ-ও কি সম্ভব!’ এ ধরনের একটা ইনজুরিই তো শেষ করে দিতে পারে একজন ফাস্ট বোলারের ক্যারিয়ার! সেখানে মাশরাফির বারবার লড়াই করে ফিরে আসার রহস্য কী? উত্তরটা দিয়েছিলেন স্বয়ং মাশরাফি নিজেই।

এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘বারবার ইনজুরি থেকে ফিরে আসার প্রেরণাও পাই সেসব বীর মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকেই। এমনও ম্যাচ গেছে আমি হয়তো চোটের কারণে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিলাম না। দুই-তিনটা বল করেই বুঝতে পারছিলাম সমস্যা হচ্ছে। তখন তাঁদের স্মরণ করেছি। নিজেকে বলেছি, ‘হাত-পায়ে গুলি লাগার পরও তাঁরা যুদ্ধ করেছিলেন কীভাবে? তোর তো একটা মাত্র লিগামেন্ট নেই! দৌড়া…’

২০১৪ সাল বাংলাদেশের ক্রিকেটে জয়ের খড়া। আফগানিস্তানের মতো দলের কাছেও হারতে হয়েছে। টানা ব্যর্থতায় দল তখন ক্রিকেটের অবস্থা টালমাটাল। নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের সাথে হোম সিরিজে তিনি পুনরায় অধিনায়কত্ব পান। তবে এ বার তিনি শুধু একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য দায়িত্ব পান এবং এবারও তার সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পান সাকিব আল হাসান।

নভেম্বরে জিম্বাবুয়েকে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করে তার অধিনায়ক হিসেবে নতুন করে পথচলা শুরু। ২০১৫ সালে ওয়ান ডে বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা, ইংল্যান্ডের মতো দলকে হারিয়ে দেওয়া, ঘরের মাঠে পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, আফগানিস্তানের সাথে সিরিজ জয়! অধরা জয় বঞ্চিত বাংলাদেশ দলের সোনালি সময় এবং মাশরাফিকে এ সময়ই জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়।

২০১৭ সালে তাঁর নেতৃত্বেই ইংল্যান্ডের মাটিতে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে প্রথমবারের মতো পা রাখে বাংলাদেশ। ২০১৮ সাল বাংলাদেশ দলের জন্য ছিল সাদামাটা এবং মাশরাফির জীবনের জন্য নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার প্রথম ধাপ। কিছুদিন পরেই মহান জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামা বেজে উঠল। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তার বাসভবনে ডাকলেন মাশরাফি ও সাকিবকে।

সাকিব কোনো কারণে না করতে পারলেও মাশরাফি শেখ হাসিনার কথা ফেলতে পারলেন না। আওয়ামী লীগের পক্ষে নড়াইল-২ আসনের মনোনয়ন দেওয়া হলো। এবার ভাগ হতে শুরু করলো মাশরাফির সমর্থকগোষ্ঠী। দেখাতে শুরু করলেন হুট করে মাশরাফি ভক্ত বনে যাওয়া লোকগুলো তাদের প্রকৃত রূপ।

আওয়ামী লীগ বিরোধী ম্যাশ ভক্তরা গালাগালি শুরু করল, একদল তার সিদ্ধান্ত মেনে নিল এবং আরেকদল তার অবসরের দাবি তুলল।বিতর্কিত নির্বাচনে মাশরাফি জিতল ঠিকই কিন্তু চারদিকের নির্বাচনের মতো ভোটযুদ্ধে তিনিও হয়ে রইলেন সমালোচিত। নির্বাচিত হয়েই নেমে পড়লেন এলাকার সমস্যা সমাধানে পুরোদমে একজন যোদ্ধার মতো। স্বাস্থ্যখাতে আমাদের দেশের হাসপাতালে সেবাখাতের করুণ চিত্র সবারই জানা জেলা শহরে আরো নাজুক অবস্থা। হুট করে তিনি হানা দিলেন নড়াইলের হাসপাতালে।

উপস্থিত পেলেন না ডাক্তার সংকটে থাকা হাসপাতালের ডাক্তারদের। ফোন করে কৈফিয়ত চাইলেন অনুপস্থিতি থাকার কারণ সম্পর্কে।সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে কর্তৃপক্ষের নজর পড়ল এবং একজন ডাক্তারকে বদলি করে দিলেন।কতিপয় ডাক্তার সমাজ এবার মাশরাফির বিরুদ্ধে চলে গেল। নানাভাবে গালাগালি করা শুরু করল মাশরাফিকে। মাশরাফির ডাক্তারের সাথে কথা বলার ধরণ একটু রূঢ় হওয়ার মাশরাফি সেই ডাক্তারের কাছে দুঃখ প্রকাশ করলেন। বিশ্বকাপ শুরুর সন্ধিক্ষণ ঘনিয়ে আসল।

মাশরাফি দল নিয়ে আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সেখান থেকে ইংল্যান্ডের বিমান ধরলেন ততদিনে কিন্তু একটি ডাক্তার মহল এবং তৈরি হওয়া তার বিরোধী গ্রুপ তখনো সমালোচনা এবং গালাগালিতে ব্যস্ত। বিশ্বকাপে মাশরাফি থাকলেন বিবর্ণ। গ্রুপ পর্বের ৯ টি ম্যাচে পেলেন মাত্র ১ উইকেট অথচ তার আগেই আয়ারল্যান্ডে ছিলেন মুস্তাফিজের সাথে ৯ উইকেট নিয়ে যৌথভাবে সেরা উইকেটশিকারী।

নির্বাচনের সময় তৈরি হওয়া বিরোধীগোষ্ঠী এবং বিশ্বকাপে তার খারাপ খেলার সুবাদে আরেক দল তুমুল সমালোচনায় মাশরাফিকে বিদ্ধ করলেন। মাশরাফিকে বিশ্বকাপের পর অনেকেই অবসরের দাবি তুললেন কিন্তু তিনি তা গ্রাহ্য করলেন না। বিশ্বকাপ পরবর্তী সিরিজ শ্রীলঙ্কা সফরে যাওয়ার কথা থাকলেও চোটের কারণে ছিটকে পড়লেন।

বিসিবি ভবনে তাকে ডাকলেন বোর্ড কর্তারা হয়তো কবে অবসরে যাবেন সেটা জানতেই। তিনি তাৎক্ষণিক না বলে দিয়ে খেলা চালিয়ে যেতে চাইলেন। ফেসবুকে পৃথিবী নিষ্ঠুর স্টাট্যাঁস দিয়ে আবার মুছেও ফেললেন। এখন তিনি ক্রিকেটে যততা নিষ্ক্রিয় ততটাই রাজনীতিতে সক্রিয়।এবার আসি মাশরাফির উত্থান, নির্বাচন, বিশ্বকাপ এবং সমালোচনা নিয়ে কিছু প্রশ্ন এবং উত্তর জানতে।

  • মাশরাফির জনপ্রিয়তার উত্থানটা মূলত কবে হয়?

২০১৪ সালে হারের বৃত্তে থাকা বাংলাদেশের দলের অধিনায়ক পরিবর্তন করে মাশরাফিকে দেওয়া হয়। নভেম্বরে ঘরের মাঠে ৫ ম্যাচ সিরিজে জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে মাশরাফির নেতৃত্বে নতুন সূচনা শুরু করে। ২০১৫ সালে তার নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশনের ওয়ানডে বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশের খেলাই বদলে দপয় তার জনপ্রিয়তাকে। এরপর ঘরের মাঠে পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে ওয়ানডেতে সিরিজ হারানো তার জনপ্রিয়তাকে তুঙ্গে তুলে দেয়। এসময় তিনি নিজে পারফর্ম করেছেন এবং দলকে পারফর্ম করিয়েছেন। এভাবেই চলতে থাকে মাশরাফি ম্যাজিক শো!

  • মাশরাফি কি অধিনায়ক কোটায় খেলছেন নাকি যোগ্য ক্রিকেটার হিসেবে খেলেন?

অনেক সমর্থক তার নেতৃত্বে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্স দেখে আবেগের বশে দাবি করেন তিনি অধিনায়ক হয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকলেও দল জিতবে ।কিন্তু তিনি নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েই যে দলে ছিলেন সেটা তার ২০১৪ থেকে পরিসংখ্যানই বলে দেয়। এ সময় তিনি দেশের হয়ে উইকেট শিকারীর তালিকায় ওয়ানডেতে দ্বিতীয় সেরা পোসার হিসেবেই আছেন।তিনি কখনো দলের বোঝা নয় বরং তার যোগ্যতা প্রমাণ করেই খেলে আসছেন। কিন্তু কতিপয় বিরোধীরা তাকে কোটার অধিনায়ক বলে গালমন্দ করে থাকেন। তিনি যদি কোটায় খেলতেন তাহলে ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে বিবর্ণ থাকায় কোনো আলোচনাই হত না। তিনি নিজের সেরা খেলাটা খেলতে পারেননি বলেই যত বিতর্ক হয়েছে।

  • দলের অধিনায়ক থাকা অবস্থায় মাশরাফির রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ারা কতটা যুক্তিসংগত?

যেহেতু তিনি দেশের ক্রিকেটের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং অধিনায়কের ভূমিকায় আছেন সেহেতু অন্য সবার মতো মাশরাফির এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করি না। কিন্তু লোকটা যে মাশরাফি যিনি চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসেন! মাশরাফির প্রিয় জায়গা নড়াইল এবং তার এলাকায় উন্নয়নে জন্য কাজ করে আসছেন।

তিনি এমন ধনী কেউ নন যে একাই নিজের সম্পত্তি দিয়ে নড়াইলের উন্নয়ন করে ফেলবেন। মাশরাফি অনেক আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন ২০১৯ বিশ্বকাপই তার শেষ বিশ্বকাপ। হয়তো তিনি চেয়েছেন এরপর আর কদিনই খেলবেন তাই নিজের এলাকার জন্য কিছু করার জন্য এখান থেকেই শুরু করতে। কারণ হিসেবে বলা যায়, একজন এমপি চাইলেই এলাকায় যতটা উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারেন সেটা সাধারণ মানুষ হিসেবে ততটা সম্ভব না।

কিন্তু, মাশরাফি চাইলে আরো পরে রাজনীতিতে জড়াতে পারতেন তাহলে হয়তো তার ক্রিকেট খেলা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারত না। তবে, বড় কথা হল মাশরাফি যতটা ভাল ক্রিকেটকে বাসেন, তার চেয়েও বেশি ভালবাসেন নড়াইলকে।

  • রাজনীতির মাঠে মাশরাফি কেমন খেলোয়াড়?

আমাদের দেশের জনগণ সব সময় চায় দেশে নোংরা রাজনীতি বন্ধ হোক কিন্তু এদের মধ্যে সিংহভাগ অংশই আবার ভালো মানুষগুলো রাজনীতির মাঠে নামলে সমালোচনায় মুখোর হয়ে ওঠেন। এরা নিজেরা যতটা দেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলে প্রচার করে ততটাই এরা দেশের প্রতি উদাসীন। মাশরাফি এমপি হওয়ার পর বদলে গেছে নড়াইলের পরিবেশ। হাসপাতাল, রাস্তাঘাট এবং অন্যান্য সেক্টরে এসেছে ব্যাপক উন্নয়নের ছোঁয়া। কিন্তু রাজনীতি মাঠে মাশরাফি চেয়েছেন ছক্কা মারতে তার বদৌলতে চক্ষুশূল হয়েছেন এক শ্রেণির অসাধু লোকদের কাছে। কারণ মাশরাফির কারণে এদের স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটছে।

  • শুধু  রাজনীতিতে আসায় কেন তার সমালোচনা করতে হবে? দেশের অনেক জনপ্রিয় লোকেরা এর আগেও রাজনীতির মাঠে এসেছেন কিন্তু সমালোচনা হয়নি কেন?

বাংলাদেশের ফুটবল দলের এজ সময়ের জনপ্রিয় গোলরক্ষক আমিনুল ইসলাম বিএনপির রাজনীতিতে এসেছেন।তুমুল জনপ্রিয় মনির খান,আসিফ আকবর এরাও বিএনপির সমর্থক এবং কখনো প্রত্যক্ষ রাজনীতিও দেখা গেছে। তাদের ভক্তবৃন্দ তখন তাদের বয়কট করে নি, কখনো গালাগালি করে নি অথচ তারা ঐ দলের সমর্থকও নন। কিন্তু মাশরাফি যখন রাজনীতির মাঠে আসলেন তাকে কেন দালাল বলতে হবে? মাশরাফি যদি নিজের এলাকার জন্য দালাল উপাধি পেয়েও জনগণের সেবা করতে পারে তাহলে এমন দালাল দেশের প্রতিটি সংসদীয় আসনে প্রয়োজন আছে। দেশের উন্নতির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জন্য যোগ্য নেতাদের প্রয়োজন আছে। শুধু সোস্যাল মিডিয়ার কারো সমালোচনা করে দেশের উন্নতি সম্ভব হবে না যতদিন প্রতিটি মানুষ সচেতন না হয়।

  • মাশরাফির সমালোচক তৈরি হওয়ার মূল কারিগর কারা?

একশ্রেণির আবেগী সমর্থক তাকে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করে আছে এবং এরাই আবার তার সমালোচক বনে গেছেন।অন্যদিকে দেশের ক্রিকেটে অন্য একটি অংশ মাশরাফিকে রাজনীতির মাঠে নামায় নাখোশ কিন্তু এরা যতটা নিজেদের সুশীল মনে করে ততটা তারা নন। কারণ,এদের মূল কাজই খুজে বেড়ানো হোক সেটা ভালো কিংবা খারাপ। আরেক শ্রেণির লোক দেখা যায় এরা মাশরাফির প্রতিপক্ষ হিসেবে অন্য ক্রিকেটারদের দেখেন এই সংস্কৃতির ফলে আরেক শ্রেণির সমালোচক তৈরি হয়েছে।

আসলে দিনশেষে মাশরাফিও একজন মানুষ অন্য দশ জনের মতো। তার সব দিনই সমান যাবে, সব সিদ্ধান্তই সময়োপযোগী হবে এমনটা আশা করা অন্যায়। কিন্তু একটা জা’গায় মাশরাফি বিন মর্তুজা অনন্য। ক্রিকেট অধিনায়ক মাশরাফি । তার ধ্যান-জ্ঞান-প্রজ্ঞা আর নেতৃত্বের কাছাকাছি আর কোনো ক্রীড়া অধিনায়কের জন্ম হয়নি বাংলাদেশে। হয়তো হবেও না কোনোদিন।

নিন্দুকেরা হয়তো নিন্দা করতে পারবেন তার, সমালোচকরা সমালোচনা করে যাবেন আজীবন কিন্তু এই জায়গাটায় হাত দিতে পারবেন না কেউ কোনোদিন। হাজারো চেষ্টাতেও মাশরাফিকে আলাদা করা যাবেনা বাংলাদেশের ক্রিকেট থেকে। আক্ষরিক অর্থেই তিনি রহস্যময় ও সাহসী এক চরিত্র হিসেবে ইতিহাসের পাতায় টিকে থাকবেন।

আসলেই মাশরাফির ক্রিকেট ক্যারিয়ারের উত্থান- পতন যেমন আছে ঠিক তেমনি কঠোর পরিশ্রম, দৃঢ় মনোবল, হার না মানার মানসিকতা উদাহরণ হয়ে থাকবে বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসে। মাশরাফি এত তাড়াতাড়ি রাজনীতিতে আসুক এটা সমর্থন করি নি কিন্তু যখন এসেছেই নিষ্ঠার সাথে একটি জেলাকে যদি বদলে দিতে পারে সেখানে ক্রিকেটের চেয়েও বড় স্বার্থকতা রয়েছে বলে আমি মনে করি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।