মিরাজ-সিয়ামদের খবর নাই, পাড়া-পড়শির ঘুম নাই!

কিছুদিন আগে মডেল ও অভিনেতা সিয়াম বিয়ে করলেন। তাঁদের বিয়ের ছবি ভিডিওতে ফেসবুক ছয়লাব।যতটা না শুভকামনার পোস্ট তার থেকে বেশী তাঁদের নিয়ে ট্রল।

ট্রলের বিষয়বস্তু খুবই অদ্ভুৎ – সিয়ামের বউ মোটা কেন? তাকে দেখতে সিয়ামের থেকে বড় লাগে কেন? ইত্যাদি… ইত্যাদি!

এইসব নোংরামির মধ্যে যে জিনিসটা চাপা পড়ে গেল সেটা হল একজন মানুষের ভালবাসা, ডেডিকেশন কমিটমেন্ট, লয়ালটি, ট্রাস্টের গল্প।

প্রেম করা বা কারো সাথে রিলেশনশিপে যাওয়া আজকাল সবচেয়ে সহজলভ্য বিষয়। কঠিন হল সেই রিলেশনশিপের প্রতি সম্মান দেখানো,সেই ভালবাসা যে সত্যিই সত্যি তা প্রমাণ করা।

নয় বছর কমিটেড থাকার পর অবন্তীকে বিয়ে করে সিয়াম দেখিয়েছেন যে পৃথিবী থেকে প্রেম ভালবাসা এখনো বিদায় নেয়নি।

রোমান্টিক রিলেশনশিপ মানেই ডেটে যাওয়া, রেস্টুরেন্টে খাওয়া, চেক ইন দেয়া, হাগ ডে, কিস ডে পালন করা না। বিষয়টা এর থেকে অনেক অনেক বড়। বিষয়টা এত বড় যে এসব না করলেও ভালবাসার ইনটেনসিটিটা একই থাকে, হয়ত সময়ের সাথে সাথে সেটা আরও দৃঢ় হয়।

আর তাঁদের নিয়ে ট্রল করে আমরা দেখিয়েছি, সমাজ যে প্রগতিশীলতার কথা বলে তা আসলে একটা মুখোশ। মানুষ এখনও আরেকজনের ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলায়, এখনও প্রচণ্ড ভাবে মেয়েদের বডি শেমিং এর মুখোমুখি হতে হয়, এখনও মানুষের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম আবেগ অনুভূতি নিয়ে অনধিকার চর্চা হয়। আমরা প্রেম দেখি না, দেখি মানুষের বয়স, শরীর, চেহারা।

দু’দিন ধরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখছি মেহেদি হাসান মিরাজ বিয়ে করার পর থেকে।

নবদম্পতির ছবি পোস্ট করে মানুষ লিখেছে – মিরাজ এইটা কি বিয়ে করল? বউ তো ওর থেকে বড়। ‘খালাম্মা’ লাগে মিরাজের পাশে!

অথচ তারা হয়ত জানেনা এই মেয়েটা মিরাজকে তখন থেকে ভালবাসে যখন মিরাজ এই মিরাজ ছিল না। খালিশপুরের ভগ্ন কুড়ে ঘরে থাকা সাধারণ দরিদ্র ঘরের মিরাজকেই ভালবেসেছিল তাঁর প্রেমিকা।

যখন তাঁর খ্যাতি ছিল না, টাকা ছিল না, সামাজিক পরিচয় ছিল না তখন সেই মিরাজকে ভালবেসেছিল তার প্রাক্তন প্রেমিকা আর বর্তমান স্ত্রী।

হয়ত তাঁর হাত ধরে, তাঁর অনুপ্রেরণাতেই আজকের সফল মিরাজের জন্ম।

মিরাজ, সিয়াম – এরা আমাদের সমাজের জন্য একেকটা উদাহরণ। যুব সমাজের একটা অংশের এরা রিপ্রেজেন্টেটিভ যেই অংশটা এখনো ধ্বংস হয়ে যায়নি, যাদের মধ্যে এখনো বিবেক আছে, ভালবাসা আছে, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি সম্মান আছে, একটা ভালবাসার মন এবং তা রক্ষা করার গাটস আছে।

আমাদের কাছে যেটা ট্রলের বিষয়, তাঁঁদের কাছে সেটা অ্যচিভমেন্ট। ভালবাসার মানুষকে নিজের করে পাওয়া চারটি খানি কথা না। এটা যারা ভালবাসে কেবল তাঁরাই জানে।

এটা বক্স অফিসে সিনেমা হিট হওয়া বা বিশ্বকাপ জেতার থেকে বড় অ্যাচিভমেন্ট। কারণ, এই ভালবাসার মানুষেরাই বাকি সব অ্যাচিভমেন্টের উৎস। এরা পাশে ছিল, থাকে বলেই হাসিমুখে যুদ্ধ জয় করা যায়।

অন্যদের কাছে এরা শরীর, ফিগার, বয়স আর চেহারা হলেও মিরাজ বা সিয়ামের কাছে এরা তাঁদের আরাধ্য মানবী। ভাল না বাসতে পারলে অসুবিধা নেই কিন্তু অন্যের ভালবাসাকে অসম্মান দেখানো প্রচণ্ড অমানবিক এবং একটা ক্রাইমও।

এই ক্রাইম না করার অনুরোধ রইলো সবার প্রতি। খুব হতাশ লাগে এসব দেখলে।মনে হয় পৃথিবী এগিয়ে গেলেও জাতি হিসেবে আমরা এখনও প্রাগৈতিহাসিক যুগেই পড়ে আছি।

সবশেষে মিরাজকে অভিনন্দন জানাই। শুধু বিয়ের জন্য না, স্টার হবার পরও নিজের ভেতরের মানুষটাকে, প্রেমিকটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে। অভিনন্দন, একটা মেয়ের মধ্যে শুধু হাইট, ভাইটাল স্ট্যাটেস্টিকস, তাঁর বাহ্যিক সৌন্দর্য না দেখে তাঁর ভেতরের মানুষটাকে দেখার জন্যে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।