‘গডফাদার’ যখন ঢাকায়

বিখ্যাত লেখক মারিও পুজোর বিখ্যাত বই গডফাদারের একটি চরিত্র হল ডন ভিটো করলিওনি। এই গডফাদার নিয়ে হলিউডে তিন পর্বের মুভি হয়েছে। আইএমডিবি রেটিংয়ের উপরের সারির, একাডেমি অ্যাওয়ার্ড সহ একাধিক পুরুস্কার জেতা এই মুভি বিশ্ব মুভি জগতে একটি মাইল ফলক।

মারলন ব্র্যান্ডোর ছবিটিতে তাঁর নকল চোয়াল ও ফোলা গাল বেশ আইকনিক হয়ে গিয়েছিল। একই সাথে তারঁ ফিস ফিস করে কথা বলাও বিখ্যাত হয়েছিল বেশ। হলিউডের ইতিহাসের এই আইকনিক চরিত্রটি নির্মিত হয়েছিল বাস্তবের এক মাফিয়ার জীবনের ওপর ভিত্তি করে।

অপরাধ জগতের এই ডনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মানুষটিকে বেশ দক্ষতার সাথেই বের করে এনেছিলেন ব্রান্ডো। এই ভদ্রলোক ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াইয়ে যেমন মত্ত, তেমনি বাবা হিসেবে নিজের দায়িত্ব নিয়েও সচেতন।

রোমাঞ্চিত হই যখন জানতে পারি এই চরিত্র পর্দায় রুপায়নের আগেই মারলন ব্র্যান্ডো আমাদের বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন। তিনি ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইউনিসেফের ব্র্যান্ড এম্বাসেডর হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থান তথা বাংলাদেশে ঘুরে গেছেন।

১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একটি দুর্লভ ছবি। ইউনিসেফের ব্র্যান্ড এম্বাসেডর হিসেবে হলিউড অভিনেতা মারলন ব্র্যান্ডো বাংলাদেশী অভিনেতা, অভিনেত্রীদের সাথে এফডিসিতে। বাম থেকে অভিনেত্রী শবনম, অভিনেতা এবং পরিচালক এহতেশাম, সিনেমাটোগ্রাফার আব্দুস সামাদ।

এসে উঠেছিলেন হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে। এফডিসিতে আমাদের চলচিচত্রের নির্মাতা, কলাকুশুলিদের সাথে মত বিনিময় করেছেন, একান্তে সময় কাটিয়েছেন।

যদিও তখন গডফাদার নির্মিত হয়নি। কিন্তু ততদিনে সুদর্শন এই অভিনেতা ‘অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট’ সিনেমার জন্য অস্কার জিতেছেন। সেরা অভিনেতা হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন আরও পাঁচবার। শুধু হলিউড না বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটেই তিনি তখন একটি শক্তিশালী মুখ।

মারলন ব্র্যান্ডো এফডিসিতে বক্তব্য রাখছেন।

আর এরপর গডফাদারের জন্য তো তিনি হয়ে গেছেন ইতিহাস আর গডফাদারের জন্য সেরা অভিনয়ের একাডেমী অ্যাওয়ার্ড বর্জন করে তিনি হয়ে গেছেন একজন কিংবদন্তি।

মারলন ব্র্যান্ডো যখন হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে উঠেছিল তখন হলি ক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে একদল শিক্ষার্থী তাঁর সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। তাদের দেখে মারলন ব্র্যান্ডো বিস্মিত হয়ে বলেছিল, তার এতদিন ধারনা ছিল এই অঞ্চলের মেয়েরা ঘরের বাইরে তেমন বের হয় না। কিন্তু এখন দেখলেন যে এরা শুধু বেরই হয় না – মুভিও দেখে, বিশ্বের খোঁজ খবর রাখে। বাংলাদেশের ব্যাপারে সেদিন ধারণা পাল্টে গিয়েছিল ব্র্যান্ডোর।

অন্যদের সাথে আপ্যায়নরত হলিউড অভিনেতা মারলন ব্র্যান্ডো।

দীর্ঘ মুভি জীবনে মারলন ব্র্যান্ডোর অপ্রাপ্তি বলে তেমন কিছু নেই। একাডেমী অ্যাওয়ার্ড এ ৮ বার সেরা অভিনেতার মনোনয়ন পেয়ে জিতেছেন দু’বার। গোল্ডেন গ্লোবে নয়বার মনোনয়ন পেয়ে জিতেছেন চারবার।

ব্রিটিশ একাডেমি ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডে আটবার মনোনয়ন পেয়ে জিতেছেন তিনবার, আর বাদ বাকি পুরস্কার তো অগুনিত। টাইম ম্যাগাজিনের জরিপে শতাব্দীর সেরা ১০০ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের ভেতর তিনি ছিলেন একজন। আমেরিকান ফিল্ম ইন্সটিটিউটেরে জরিপে সেরা চলচ্চিত্র তারকার ভেতর তিনি চতুর্থ স্থানে আছেন।

মারলন ব্র্যান্ডো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে।

তবে যে কাজ টা করে অনেকের মন জয় করেছিলেন তা হল তিনি গডফাদার মুভির জন্য ১৯৭৩ সালের ৪৫তম আসরে সেরা অভিনয়ের একাডেমী অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখান করেছিলেন। জানা যায় হলিউডের বর্ণবাদী মনোভাবের জন্যই মারলন অভিনয়ের এই সেরা পুরুস্কার বর্জন করেছেন।

ওয়েস্টার্ন জনরার সিনেমাগুলোর প্রায় সবকটিতেই রেড ইন্ডিয়ানদের উপস্থাপন করা হত নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে। বলা হত তাঁরা নাকি বর্বর, হিংস্র, অশিক্ষিত। তাছাড়া হলিউডের সিনেমায় ন্যাটিভ আমেরিকানদের দেওয়া হত কম গুরুত্বপূর্ণ রোল। কোন ভায়োলেন্ট দৃশ্যে নেটিভ আমেরিকানদের দেখানো হত বেশ আক্রমণাত্মক হিসেবে। ব্র্যান্ডা এসবের বিরোধী ছিলেন।

মূলধারার গণমাধ্যমের এই বৈষম্যমূলক আচরণ কিন্তু একদিনে হয় নি। এই ব্যাপারগুলো বেশ সুক্ষভাবে আমাদের মন ও মননে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং হচ্ছে। কালোদেরকে বর্বর হিসেবে দেখানো, ইসলাম ধর্মের মানুষদের সন্ত্রাসী হিসেবে দেখানো কিংবা নারীদের ছোট করা – মিডিয়া যখন যেভাবে পেরেছে নিজের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সবাইকে নিজের মত করে উপস্থাপন করেছে।

এই মিডিয়ার পেছনে বসে কলকাঠি নাড়ছে কিছু মানুষ, কিছু সিস্টেম। অস্কারের মত একটা জায়গায় মারলন ব্র্যান্ডোর এই পুরস্কার বর্জন এই পক্ষপাত সিস্টেমের মুখে একটি জোরালো আঘাত ছিল। আজো অবশ্য হলিউড এই অবস্থান থেকে সামান্যই সরেছে। তবে, আগের চেয়ে বিষয়গুলো কিছুটা হলেও কমেছে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।