মাকসুদ: বাংলা ব্যান্ড ভূবনের এক সাহসী কণ্ঠ

পপ, রক, রেগে, জ্যাজ, মেটাল বা ফোক – বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের আছে আলাদা অনেক রকমফের। এই নানা ঘরানায় এসেছেন অনেক গুণী শিল্পী। তবে, একটু আলাদা করে বলতে হয় মাকসুদুল হকের কথা, যিনি বেশি পরিচিত মাকসুদ নামে।

মাকসুদের জন্ম ১৯৫৭ সালে ঢাকায়। পূর্বপুরুষ আসামের অধিবাসী ছিলেন। বাবা ব্যবসায়ী হবার সুবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গা ঘোরা হয়েছে তাঁর। তবে ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে স্থায়ী হয় তাঁর পরিবার। রেডিওতে বিভিন্নরকম গান শুনতে শুনতে সঙ্গীতের প্রতি ভালোলাগা। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কারো কাছে শেখেননি তিনি।

প্রথমে ১৯৭৪ সালে মালিবাগে ‘আর্লি বার্ড’ নামে একটি ব্যান্ড দলের সাথে যুক্ত হন। ১৯৭৬ সালে আসেন ফিডব্যাকে। তখন ইংরেজি গান করতেন। সবাই ডাকতেন ম্যাক নামে। বাংলা গান গাইতেন জাকিউর রহমান রোমেল। আজম খান মাকসুদকে বাংলা গান গাইতে উৎসাহিত করেন। কিন্তু ম্যাকের কাছে তখন বাংলা গান মানে আনস্মার্ট গান। তবে আজম খানের কড়া ধমকে মত পাল্টাতে হয় তাঁকে।

১৯৮৭ সালে অবশেষে বাংলা গানে আনুষ্ঠানিক প্রবেশ ঘটে মাকসুদের। সারগামের ব্যানারে প্রকাশিত হয় ফিডব্যাকের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘উল্লাস’। রোমেল উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে যাওয়ায় মাকসুদকেই বাংলা গানে ভোকাল দিতে হয়। অসাধারণ জনপ্রিয়তা পেলো ফিডব্যাক৷ সাথে শুরু হলো মাকসুদ ঝড়ের।

১৯৯০ সালে এলো পরবর্তী অ্যালবাম ‘মেলা’। এই অ্যালবামেই এলো সেই বিখ্যাত গান ‘মেলায় যাইরে’। মাকসুদ নিজেই গানটি লেখেন। লিখতে সময় লেগেছিল তিন মাস। গানটি ব্লকবাস্টার হিট করে। বৈশাখের গানে রবীন্দ্রসঙ্গীতের বাইরেও স্থান করে নেয় রক গান।

১৯৯১ সাল।  এইচ এম ভি-র ব্যানারে কলকাতায় প্রকাশিত হয় ফিডব্যাকের গানের সংকলন ‘জোয়ার’। এই এলবামে প্রথমবারের মত এলো মাকসুদের বক্তব্যধর্মী গান। ’৯১ এর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের সময় লিখলেন ‘মাঝি তোর রেডিও নাই বইলা জানতেও পারলিনা’। গানটি ব্যাপক সমাদৃত হলো কলকাতাসহ সারা বাংলাদেশেও।

মাকসুদ প্লে-ব্যাকও করেছিলেন। প্রথম প্রয়াত চিত্রপরিচালক দারাশিকো ‘অঞ্জলী’ ছবিতে গান গাওয়ার প্রস্তাব পান। মাকসুদও সুযোগটা লুফে নেন। ছবিতে তাঁর গাওয়া ‘তোমাকে দেখলে একবার’ ও ‘লোকে বলে পাগলামী’ গান দুটো জনপ্রিয়তা পায়। এছাড়া মমতাজুর রহমান আকবরের ‘ডিস্কো ড্যান্সার’ ছবিতে শিরোনাম গানটিও মাকসুদেরই গাওয়া।

১৯৯৪ এ প্রকাশিত হলো ‘বঙ্গাব্দ ১৪০০’। মাকসুদের গীতিকবিতার শুরু এই অ্যালবাম থেকে। গীতিকবিতা-১ ( মনে পড়ে তোমায়),  গীতিকবিতা-২ (ধন্যবাদ ভালোবাসা) এই অ্যালবামে প্রকাশিত হয় ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পাশাপাশি বক্তব্যধর্মী গানেও নতুন মাত্রা আনেন মাকসুদ। প্রকাশিত হয় ‘সামাজিক কোষ্ঠকাঠিন্য’ ও ‘উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি’-র মত গান।

তিনি ‘সামাজিক কোষ্ঠকাঠিন্য’ গানে লিখলেন –  ‘তেজস্ক্রিয় দুধের আমদানি করে গড়ো কালো টাকার পাহাড়/ আর সন্ধ্যা হলে তুমি কোন শুদ্ধ সঙ্গীতের আসরে পৃষ্ঠপোষকতা কর/ আর হুইস্কি সেবন কর, হুইস্কি সেবন কর।’ এছাড়াও বললেন, ‘বন্ধ করো এসব অশ্লীল ব্যান্ডবাজি।

চিরাচরিত আমি-তুমি ধরণের গানের বাইরে ম্যাকের এ ধরণের চেষ্টা পরবর্তীতে আরো দৃশ্যমান হলো। ঠিক করলেন প্রধানত বক্তব্যধর্মী গানই করবেন।  তাঁর কিছু প্রতিবাদী গান ফিডব্যাকের হয়ে বের করা সম্ভব হলো না। ঠিক করলেন নতুন ব্যান্ডদল গঠন করবেন।

ফিডব্যাকে গাইছেন মাকসুদ

১৯৯৬ এর অক্টোবরে ফিডব্যাক ত্যাগ করেন মাকসুদ। গড়ে তোলেন তাঁর নতুন ব্যান্ড ‘মাকসুদ ও ঢাকা’। ফিডব্যাকের সাথীদের মধ্যে এলেন সেকান্দার আহমেদ খোকা। আরো যোগ হলেন সেলিম হায়দার, রুবাইয়েত, ফজলুল হক মণ্টু প্রমুখ। ১৯৯৭ এ বাজারে এলো ঢাকার প্রথম অ্যালবাম ‘প্রাপ্তবয়স্কের নিষিদ্ধ’।

তবে রাজনৈতিক বক্তব্যধর্মী গান থাকায় অ্যালবামটি বড় কোন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে রিলিজ হতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত এলিফেন্ট রোডের সিডির দোকান ‘গীতাঞ্জলি’ থেকে প্রকাশিত হয়। এই একটি অ্যালবামের সাফল্য গীতাঞ্জলিকে পরিণত করে একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানে যা বর্তমানে ‘জি সিরিজ’ নামে পরিচিত।  প্রথম দিনেই এলবামটি ৭০ হাজার কপি বিক্রি হয়। পরিণত হয়ে মেগাহিটে৷

অ্যালবামের সর্বাধিক আলোচিত গান ছিল – গীতিমিছিল। মাকসুদ লিখলেন, ‘গণতন্ত্র মানে মিছিল মুখে মিছে স্লোগানের ভাষা/ আর সারা বাংলার ধর্ষণ দেখে মাজা দুলিয়ে নাচা নাচা নাচা।’

আরো লিখলেন, ‘গণতন্ত্র মানে সন্ত্রাসী প্রকাশ্যে গুলি চালায় / আর পাশে দাঁড়ানো পুলিশ আনন্দে দেখি নাকে আঙুল চালায় / তাই গণতন্ত্র মানে সাংবিধানিক এক মাস্তানতন্ত্র/ গায়ের জোরে আর পেশির জোরে চলে জীবিকার মন্ত্র।’ গানটি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।

এছাড়া অ্যালবামের ‘আবার যুদ্ধে যেতে হবে’, ‘পরওয়ারদেগার’, ‘বাংলাদেশ-৯৫’, ‘গীতিভাষণ- মৃত্যুদণ্ডের দাবি’ গানগুলোও ছিল বক্তব্যধর্মী প্রতিবাদী গান। ‘কোন পথে আমরা চলছি, হায় পরওয়ারদেগার/ যে হাতে তাদের কোরান শরীফ,  সেই হাতে কেন তলোয়ার’ – গানটির জন্য মৌলবাদী গোষ্ঠী তাঁর বাসায় কাফনের কাপড় পাঠায়। এছাড়া আরো অনেক দিক থেকেই হুমকির সম্মুখীন হন মাকসুদ।

তবে এতে তিনি দমে যাননি। সে সময় ‘চলতিপত্র’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হত। সম্পাদনা করতেন বিভূরঞ্জন  সরকার। সেখানে কলাম লিখতে থাকেন ‘নিষিদ্ধ এই সময়ে’ শিরোনামে। ঘোষণা দেন পরবর্তী অ্যালবামের। নাম দেন  ‘রাষ্ট্রক্ষমতা-২০১০’। তবে এর আগেই ১৯৯৯ এর জানুয়ারিতে এসে গিয়েছিল তাঁর ব্যান্ডের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘ওগো ভালোবাসা’। এটি ছিল বাংলা ভাষার প্রথম রক-জ্যাজ ফিউশন অ্যালবাম৷ এই অ্যালবামে ‘রবীন্দ্রনাথ-২০১০’ শীর্ষক  নীরিক্ষাধর্মী কাজটি রবীন্দ্র ভক্তরে তোপের মুখে পড়ে।

মাকসুদ ও ঢাকা

যাই হোক, পরবর্তীতে নানা উত্থান-পতন আসে ম্যাকের জীবনে। অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার,  মিডিয়ায় নিষিদ্ধসহ আরো অনেক কিছু। পরে আবার ফিরে আসেন গানের জগতে। তবে ‘রাষ্ট্রক্ষমতা-২০১০’ আর করা হয়নি। সম্প্রতি আবার কনসার্টসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যস্ত ‘মাকসুদ ও ঢাকা’। ভক্ত হিসেবে আশা করা যায়,  আবারো বক্তব্যধর্মী গান নিয়ে ফিরবেন মাকসুদ,  সাথে তাঁর ব্যান্ড ঢাকা। আবারো শ্রোতারা পাবেন অসাধারণ কিছু গান আর মানসম্মত লিরিক।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।