একজন গ্র্যাজুয়েট গ্যাঙস্টার ও মুম্বাইয়ের প্রথম এনকাউন্টার!

বিএ গ্র্যাজুয়েট। তার উপর ৭৮ শতাংশ মার্কস। নিম্নবিত্ত জীবনে বড় হওয়া মনোহর অর্জুন সুরভের আর কি বা চাওয়া থাকতে পারে। কীর্তি কলেজ থেকে পাশ করার পর ভাল একটা চাকরিও জুটে যায়। ব্যস, এবার তো জীবনটাকে গুছিয়ে নেওয়া যাবে।

না, মনোহরের জীবনটা আর ১০ জন সাধারণ মানুষের মত হয়নি। না, মাদকাসক্তি বা নারী নয়, তিনি জড়িয়ে পড়েছিলেন অন্ধকার অপরাধ যুগের সাথে। লোকে বলে, জড়িয়ে পড়ার পেছনেও মনোহরের নিজের কোনো হাত ছিল না। যদিও, আন্ডারওয়ার্ল্ডে মনোহর যতটুকু সময় ছিলেন, বেশ ‘দাপট’ ছিল তাঁর। মাত্র দু’বছর সময়ে মুম্বাইকে প্রায় নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছিলেন।

চলুন সেই লোমহর্ষক সত্যি ঘটনাগুলোর গভীরে যাওয়া যাক।

পুরো নাম মনোহর অর্জুন সুরভে। জন্ম ১৯৪৪ সালে, রত্নাগিরির রানপার গ্রামে। মুম্বাই যখন আসেন, সাথে ছিল মা সৎ বাবা। ওহ হ্যাঁ, আরেকজন ছিলেন। তিনি হলেন সৎ বাবার ছেলে ভার্গব দাদা। এই দাদাই মানিয়ার জীবনে বিপদ নিয়ে আসেন। ভার্গব ছিলেন এলাকার ছোট-খাটো মাস্তান।

মানিয়া ১৯৬৯ সালে কীর্তি কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন। ১৯৬৯ সালে বডি বিল্ডিংয়ের জন্য ‘মুম্বাই শ্রী’ খেতাবও পান তিনি। কিন্তু পরিবারে পরিবারে অশান্তি থাকলে যা হয় আর কি।

বড় ভাই ভার্গব ডান্ডেকার নামের এক ব্যক্তিকে খুন করেন। খুনের মামলার চার্জশিটে নাম ভাইয়ের সাথে নাম চলে আসে মানিয়ার। কোথায়, তিনি একটা চাকরী নিয়ে আরামের একটা জীবন কাটাবেন, তাঁর ঠাঁই হল কি না পুনের জেলে। খুনের দায়ে ১৯৭০ সালে দুই ভাই আজীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী।

জেলের পরিবেশের কারণেই কি না, আমূল বদলে গেলেন মনোহর। জেলে থাকতেই ‘পটিয়া ভাই’ নামে পরিচিত এক গ্যাঙস্টার সুহাস ভাটকরের সাথে তাঁর কড়া প্রতিদন্দ্বীতা শুরু হয়। বিষয়টা অতিষ্ট হয়ে মনোহরকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় রত্নাগিরির জেলে। সেই জায়গা, যেখান থেকে একদিন এক বুক স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাই এসেছিলেন তিনি।

সুযোগটা কাজে লাগান মনোহর। অনশন করে ২০ কেজি ওজন কমিয়ে ফেলেন। কারাগার কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে তাঁকে পাঠানো হয় স্থানীয় সিভিল সার্জন হাসপাতালে। পুলিশের কড়া পাহাড়ার মধ্যেও ১৯৭৯ সালের ১৪ নভেম্বর মনোহর পালিয়ে যান হাসপাতাল থেকে।

নয় বছরের জেল মনোহরের পার্থিব ভাবনাটাই যেন পাল্টে দেয়। স্বাভাবিক জীবন নয়, তখন তিনি আন্ডারওয়ার্ল্ড দখল করার ষড়যন্ত্র করেন। নিজের আলাদা গ্যাঙ গড়ে তুলেন। জেলে থাকতে তাঁর সাথে পরিচয় হয় শেখ মুনির ও বিষ্ণু পাতিলের। তাদের সাথে ১৯৮০ সালের মার্চে যোগ দেন শার্প শ্যুটার উদয় শেঠি।

১৯৮০ সালের পাঁচ এপ্রিল প্রথম ডাকাতি করে। একটা অ্যাম্বাসেডর গাড়ি চুড়ি করে লক্ষ্মী ট্রেডিং কোম্পানির কাছে তাঁরা বিক্রি করে দেয় পাঁচ হাজার ৭০০ রুপিতে। তখন এটা অনেক টাকা। অল্প সময়ের মধ্যে এই গ্যাঙয়ের ‘সুনাম’ ছড়িয়ে পড়েন। মনোহর তখন হয়ে যান ‘মানিয়া’। উগ্রপন্থী রাজনৈতিক দল শিবসেনার রাজনৈতিক প্রচারণাতেও দেখা যায় তাঁকে।

১৫ এপ্রিল এই গ্যাঙ খুন করে মুনিরের শত্রু শেখ আজিজকে। পরে কানারা ব্যাংক থেকে অস্ত্রের মুখে কেড়ে নেয় এক লাখ ৬০ হাজার রুপি। ৩০ এপ্রিল এক পুলিশ কনস্টেবলকেও জখম করেন। এই ঘটনায় মুম্বাই পুলিশ নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়। যদিও, ততদিনে মুম্বাইয়ে প্রায় হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছেন। খুন, ব্যাংক ডাকাতি, লুটতরাজ, চাঁদাবাজি – এমন কোনো অপকর্ম নেই যারা এই মানিয়া গ্যাঙ ওই সময় করতো না।

মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড বিষয়ক যেকোনো ‘গল্পে’ই ডন দাউদ ইব্রাহিমের থাকাটা বাধ্যতামূলক। মানিয়ার জীবনেও এসেছিলেন তিনি। মুম্বাইয়ের আন্ডাওয়ার্ল্ডে তখন মানিয়ার প্রতিপত্তি থাকলেও মূল নেতৃত্বটা ছিল দুই ভাইয়ের হাতে – দাউদ ইব্রাহিম কাসকার ও বড় ভাই শাবির ইব্রাহিম কাসকার।

ততদিনে ভরদরাজন মুদালিয়ার আর হাজী মাস্তানরা অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। মুম্বাইয়ের অপরাধ জগতে তখন রইল কেবল করিম লালার নেতৃত্বাধীন পাঠানরা আর শাবির-দাউদরা। তবে, কাসকার ভাইরা একক ক্ষমতা দখল করতে চাইলেন। শুরু হল রক্তাক্ত গ্যাঙ ওয়ার। পাঠান বনাম কাসকার ভাই। একের পর এক গ্যাঙস্টার মরতে থাকলো। মুম্বাইয়ের পত্রিকাগুলো রোজ তখন নানা রকম গ্যাঙ ওয়ারের খবর ছাপাতো।

এগিয়ে আসলেন স্বয়ং হাজি মাস্তান। প্রভাব না থাকলেও তখনও তাঁর সিদ্ধান্তকে সবাই সম্মান করতো। কোনো হত্যাযজ্ঞ হবে না, পাঠান ও কাসকার ভাইরা এমন ওয়াদা করলেন হাজি মাস্তানকে।

(বাম থেকে) মানিয়া সুরভে, শেখ মুনির মায়া, দাউদ ইব্রাহিম ও শাবির ইব্রাহিম।

যদিও পাঠান গ্যাঙ কথা রাখেনি। এই গ্যাঙয়ের দুই সদস্য আমির জাদা ও আলম জেব চলে আসেন মানিয়া সুরভের কাছে। মানিয়াও জানতেন, সবার ওপরে উঠতে চাইলে পাঠানদের সাথে হাত মেলানোর কোনো বিকল্প নেই। তখনই শাবিরকে হত্যার পরিকল্পনা আঁকা হয়।

১৯৮০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। গভীর রাতে গাড়িতে শাবির। সাথে প্রেমিকা ও নর্তকী চিত্রা। গাড়ি তেল নেওয়ার জন্য থামে একটা পেট্রোল পাম্পে। সুযোগটা কাজে লাগান মানিয়া। সতীর্থ গ্যাঙস্টারদের নিয়ে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেন শাবিরকে। চিত্রা সরে যাওয়া মাত্রই চারপাশ থেকে শুরু হয় গুলি বর্ষন। পাঁচটা গুলি আঘাত হানে শাবিরের শরীরে – স্পট ডেড।

তখনই দাউদকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায় দাউদের বাড়ির গেটে থাকা রক্ষীদের তৎপরতায়। হামলা শুরুর আগেই তাঁরা পাঠান ও সুরভের গাড়ি চিনে ফেলে।

তবে, ভাইয়ের মৃত্যুর শোকে আরো হিংস্র হয়ে ওঠেন দাউদ ইব্রাহিম। শুরু করেন হত্যাযজ্ঞ। ৫০ জন পাঠানকে তিনি হত্যা করেন পরিবারসহ। এর মধ্যে ছিলেন স্বয়ং করিম লালার পরিবারও।

 

ইন্সপেক্টর আইজ্যাক ভগবান।

সুরভে আর মুনির তখন পলাতক। দাউদ তাঁদের হন্যে হয়ে খুঁজছে। একবার হাতের নাগালেও পেয়ে যায়। কিন্তু, সুরভে ও মুনির নিজেদের সাহসিকতায় বেঁচে যান। দাউদ তখন বিকল্প রাস্তা ভাবেন। বলা হত, ওই সময়ে কাসকার ভাইদের এত দাপটের মূলে ছিল মুম্বাই পুলিশ। পুলিশের সাথে খাতির বজায় রেখে চলতেন দাউদরা।

বিপুল পরিমান অর্থের বিনিময়ে তৎকালীন ইন্সপেক্টর আইজ্যাক ভগবানের কাছে সুরভের ব্যাপারে তথ্য চায় দাউদ। ভগবান রাজি না হওয়ায়, ঊর্ধ্বতন অফিসারকে ঘুষ দিয়ে সুরভেকে এনকাউন্টার করার আদেশ আদায় করে নেয় দাউদ।

এরপর আসে সেই দিন। ১৯৮২ সালের ১১ জানুয়ারি। শীতের সেই মুম্বাইয়ের দুপুর জানতো না যে, কিছুক্ষণ বাদেই এখানে ঘটতে যাচ্ছে ভারতের ইতিহাসের প্রথম এনকাউন্টার। পুলিশের কাছে গোপন সোর্সের দেওয়া খবর ছিল ওয়াদালার ডাক্তার আম্বেরকাড় কলেজ থেকে প্রেমিকা বিদ্যাকে নিয়ে পালাবেন মানিয়া। পুলিশ তাই ছদ্মবেশে অপেক্ষায় ছিল।

আধাঘণ্টা অপেক্ষার পর হলুদ রঙের ট্যাক্সি করে তিনি আসলেন। ট্যাক্সির গেট খুলে নামলেন। বেলা তখন দেড়টা। অপেক্ষায় থাকা ১৮ জন পুলিশ অফিসারের প্রথম সুযোগটাই কাজে লাগালেন। গুনে গুনে ছোড়া হল ২৫ টি গুলি। এর মধ্যে পাঁচটিই আঘাত হানে মানিয়ার শরীরে।

সেই ডাক্তার আম্বেরকাড় কলেজ।

সিওন হাসপাতালে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল অ্যাম্বুলেন্সে তখনও তিনি জীবিত। বারবার পুলিশকে ‘বেইমান’ বলে গালি দিচ্ছিলেন। আম্বেরকাড় কলেজ থেকে হাসপাতালের দূরত্ব ১২ মিনিটের। কিন্তু পৌঁছাতে সময় লাগে ২৫ মিনিট। ততক্ষণে মানিয়ার শরীরে আর জীবন নেই। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আত্মসমর্পন করতে চেয়েছিলেন।

কে জানে, এই সুযোগটা পেলে হয়তো নিজেকে শুধরে নিতেন। মানিয়ার সঙ্গী মুনির ওরফে মায়া টিকে ছিলেন আরো বছরখানেক। একবছর বাদে আরেকটা এনকাউন্টারে তাঁর মৃত্যু হয়।

মানিয়া সুরভেকে দিয়েই আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘এনকাউন্টার’এর যুগে প্রবেশ করে মুম্বাই পুলিশ। সেই ১৯৮২ সাল থেকে ২০০৪ সাল অবধি পুলিশের রেকর্ড মতে এনকাউন্টার হয়েছে মোট ৬২২ টি। মানিয়ার এনকাউন্টার নিয়ে ২০১৩ সালে বলিউডে নির্মিত হয় ‘শুটআউট অ্যাট ওয়াদালা’ নামের সিনেমাটি। মানিয়ার চরিত্রে ছিলেন জন আব্রাহাম। তাঁর কথিত প্রেমিকার চরিত্রটি করেন কঙ্গনা রনৌত। সিনেমার প্রয়োজনে মূল ঘটনায় কিছু পরিবর্তনও আনা হয়েছে।

শ্যুটআউট অ্যাট ওয়াদালা সিনেমার টুকরো দৃশ্য।

– মুম্বাই মাই লাভ, মিড ডে ও হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বন

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।