হালচাষ থেকে বলিউডের লাল গালিচা

এই সময়ে ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির শক্তিশালী অভিনেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। অথচ তাঁকেই তিন তিন বার ফিরিয়ে দিয়েছিল ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা (এনএসডি)। কি অবাক হচ্ছেন? অবাক হবেন না, এটাই সত্যি। যদিও, পরের জীবনে এসে তিনি সেসব সাবেক আক্ষেপ একদম তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন।

এখন পর্যন্ত গ্যাংস্টার, পুলিশ থেকে সমকামী নানা চরিত্রে নিজেকে পরিক্ষীত করেছেন। পেয়েছেন দু’দুবার জাতীয় পুরস্কার। তিনি সিনেমায় থাকলে নির্মাতারা ভরসা পান। নাম তাঁর মনোজ বাজপেয়ী, ভিন্নধর্মী এক অভিনেতা, সত্যিকারের এক তারকা।

দ্রোহকাল, ব্যান্ডিট কুইন, তামান্না, দস্তক – এসব ছবি ছোট চরিত্র দিয়ে বলিউডে যাত্রা শুরু মনোজের। এরপর বেশ বড় সুযোগ পান রামগোপাল ভার্মার ‘সত্য’ ছবিতে। সুযোগ পেয়েই নিজেকে মেলে ধরেন ‘ভিখু’ চরিত্রে। পুরো ছবিতে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য পেয়ে যান জাতীয় পুরস্কার, এই ছবির বদলৌতে পরিচিতি শুরু। রামগোপাল ভার্মা কাছে একজন আস্থাভাজন অভিনেতা হিসেবে পরিচিত হন। রামগোপাল ভার্মার সাথে তাঁর প্রথম কাজ ‘দৌড়’ ছবিতে। এরপর একে একে অভিনয় করেন কৌন, শূল, সরকার ৩ ইত্যাদি সিনেমায়।

মনোজ বাজপেয়ী-এর ক্যারিয়ারে সেরা ছবি হিসেবে বিবেচিত অনুরাগ কশ্যপের পরিচালনায় করা ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’। এই ছবিতে ‘সরদার খান’ চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় দর্শকদের মাঝে অন্যরকম গ্রহনযোগ্যতা এনে দেয়। এছাড়া বায়োগ্রাফিক্যাল সিনেমা ‘আলিগড়’ এ একজন বিতর্কিত সমকামী অধ্যাপকের চরিত্রটিও তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয়।

প্রকাশ ঝা’র তারকাবহুল ছবি ‘রাজনীতি’-তেও খল চরিত্রে অভিনয় করে আলাদা নজর কাড়েন মনোজ। যশ চোপড়ার বিখ্যাত ছবি ‘বীর জারা’তেও ছিলেন খল ভূমিকায়। এছাড়া আকস, রোড, অরক্ষন, সত্যাগ্রহ, শূটআউট এন্ড ওয়াদালা ছবিতে খল চরিত্রে অভিনয় করে ভিন্নমাত্রা এনেছেন।

বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে ‘পিঞ্জর’ ছবিতে দেশভাগের শিকার হওয়া একজন যুবকের চরিত্রে অভিনয় করে অর্জন করেন জাতীয় পুরস্কারে বিশেষ জুরি পুরস্কার। সমালোচকদের রায়ে তিনবার ফিল্মফেয়ার পাওয়া এই দাপুটে অভিনেতার ক্যারিয়ারে আরেকটি অন্যতম সিনেমা নীরাজ পান্ডের ‘স্পেশাল ২৬’। এছাড়া তাঁর ক্যারিয়ারে অন্যান্য ছবির মধ্যে ফিজা, যুবেইদা, চক্রব্যূহ, নাম শাবানা অন্যতম। দক্ষিণের সিনেমা অবলম্বনে ‘ট্রাফিক’ সিনেমায় কেন্দ্রীয় চরিত্রে তিনি ছিলেন অস্বাভাবিক রকমের ভাল।

তেলেগু সিনেমা ‘পুলি’তেও তিনি অভিনয় করেছেন। এই বছর তাঁর মুক্তি পেয়েছে তিনটি সিনেমা, ‘বাঘি ২’ দর্শকমহলে সাড়া ফেলেছে, তিনি ছিলেন খল চরিত্রে। অন্যদুটি সিনেমা আইয়ারি ও মিসিং নিয়ে ব্যাপক প্রত্যাশা থাকলেও হতাশ করেছে। আশা রাখছি, তাঁর পরবর্তী সিনেমাগুলো সর্বমহলে সমুজ্জ্বল হবে।

মনোজ বাজপেয়ী’র ব্যক্তিগত জীবনটাও কম সিনেম্যাটিক নয়। বিহারের নারকাতিয়াগঞ্জে তাঁর জন্ম ১৯৬৯ সালের ২৩ এপ্রিল। বাবা ছিলেন কৃষক। বাকি পাঁচ ভাই-বোনের সাথে মনোজও কাজ করতেন মাঠে।

বাবা চাইতেন বড় হয়ে মনোজ ডাক্তার হউন। কিন্তু, নামটা রাখা হয়েছিল বিখ্যাত ভারতীয় অভিনেতা মনোজ কুমারের নাম অনুসারে। এমনকি, মনোজও হতে চাইতেন বোমান ইরানি কিংবা পরেশ রাওয়ালের মত অভিনেতা।  মজার ব্যাপার হল, খুব লাজুক প্রকৃতির ছিলেন তিনি। স্কুলে শিক্ষক তাই তাঁকে দিয়ে রোজ সবার সামনে কবিতা আবৃত্তি করাতেন। তখন বিরক্ত হলেও, এটা মনোজের জীবনে পরবর্তী সময় খুব কাজে দেয়।

পরবর্তীতে দিল্লীতে এসে ভর্তি হন দিল্লী ইউনিভার্সিটিতে। তখন থিয়েটারে জড়িয়ে যান। এই সময়ই এনএসডিতে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেও পারেননি। এরপর বাধ্য হয়ে শামদেব গ্রুপ থিয়েটারে এক বছরের ওয়ার্কশপ করেন।

বারবার এনএসডিতে ভর্তিতে ব্যর্থ হওয়া মনোজ জন ব্যারি থিয়েটার গ্রুপে ১২০০ রুপির একটি চাকরি পেয়ে যান। এরপর আবারও এনসিডিতে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেন। এবার ছাত্র হিসেবে না হলেও শিক্ষকমণ্ডলীর একজন হিসেবে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান বাজপেই।

এরপরই আসে স্মরণীয় এক সুযোগ। শেখর কাপুরের ছবি ‘ব্যান্ডিট কুইন’-এ তাঁকে বিক্রম মাল্লার চরিত্রটির জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়। সুযোগ আসে কারণ, কিংবদন্তি নাসিরুদ্দিন শাহ ছবিটি করতে নাকোচ করে দেন। ভাগ্য আর পরিশ্রমের বলেই সুযোগ মিলে মনোজের। বাকিটা ইতিহাস!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।