অনেকের মত ক্ষোভ ঝেড়ে বলতে পারি না- ‘পুরুষ জাতটাই খারাপ!’

কোথাও পড়েছিলাম- ‘Being a male is a matter of birth, being a man is a matter of age, but being a gentleman is a matter of choice.

কথাটির ভাবানুবাদ করলে মোটামুটি এমন দাঁড়ায়- ছেলে হবার ব্যাপারটি জন্মসুত্রে নির্ধারিত। সেই ছেলের ক্রমশ পুরুষ হয়ে ওঠা কেবলই সময়ের ব্যাপার। কিন্তু তিনি একজন সত্যিকারের ভদ্রলোক হয়ে উঠবেন কিনা, সেই ব্যাপারটি নির্ভর করে তাঁর রুচির ওপরে। সেটি তাঁর সিদ্ধান্ত।

অদ্ভুত ব্যাপারটি হচ্ছে, আমাদের পারিবারিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ভদ্রলোক/ভদ্রমহিলা হয়ে ওঠার শিক্ষাটি অন্তর্ভুক্ত না। যেভাবে আমরা বাচ্চাদের শেখাই কীভাবে কাপড় পরবে কিংবা কীভাবে খাবে (আজকাল অনেক পরিবার এসবও শেখায় না), সেভাবে আমরা শেখাই না যে কীভাবে একজন দয়ালু মানুষ হয়ে উঠবে। শেখাই না কীভাবে অন্যকে সম্মান করবে, অন্যের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। শেখাই না যে নিজের কাজগুলো নিজে করতে পারাই সম্মানজনক, অন্যের ওপরে দোষ না চাপিয়ে পরিবর্তনের জন্যে নিজে চেষ্টা করাটাই কর্তব্য।

শেখাই না যে- নারী কোন পণ্য নয় আর পুরুষও এটিএম বুথ নয়। শেখাই না কীভাবে অন্যের ইচ্ছা ও মতামতকে সম্মান করতে হয়। শেখাই না কীভাবে মেরুদণ্ড সোজা রেখে বাঁচতে হয়, কীভাবে কদর্য ব্যাপারগুলো। আমরা ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাদেরকে ইঁদুর দৌড়ে সামিল করে দিই। অন্যকে পায়ে মাড়িয়ে হলেও নিজে সামনে যাবার শিক্ষা দিই, ছলে বলে কৌশলে নিজের মন বাসনা পূরণ করার শঠতা শেখাই। অসংখ্য পিতামাতা আজকাল বাচ্চাদেরকে কোন মানবিক মূল্যবোধ শেখাতে পারেন না, কারণ তাঁদের নিজেদের মাঝেই সেটা নেই।

আমার এই জীবনে আমি অসংখ্য নোংরা মনের পুরুষ দেখেছি, যাদের কেবল দেহটাই পুরুষের আর বাকি সব নর্দমার কীটের মত। নিজেকে বাদে তারা বাকি সবাইকে আবর্জনা মনে করে, মেয়েদেরকে মনে করে পায়ের জুতো। তারা প্রেমিকাকে নির্যাতন করে, বৌকে পেটায়, কন্যাকে শাসনের নামে পিষে ফেলে। আর মা হচ্ছে তাঁদের চোখে হুকুমের দাসী। তারা মনে করে নারীর কোন মন নেই, মস্তিষ্ক নেই, আছে কেবল একটা শরীর।

তারা বিয়ের পরে স্ত্রীর জীবনের মালিক বনে যায়। স্ত্রী কাজ করবে নাকি বাচ্চা পালবে, হেঁসেল ঠেলবে নাকি আরাম করবে- সব সিদ্ধান্তই তাঁদের। নারীর শরীর তাঁদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ শরীর ছাড়া তাঁদের চোখে নারীর কোন মুল্য নেই। তারা নারীকে বিচার করে বুক আর কোমরের মাপ দিয়ে। জ্বি, এরা তারাই যারা পথেঘাটে মেয়ে মানুষ দেখলেই শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকে, ফেসবুকে বসে যৌন সুড়সুড়ি ভরা মেসেজ দেয়, বাড়ি ফিরে বড্ড ভালো মানুষ সেজে থাকে … বিশাল লম্বা তাঁদের গুণের ফিরিস্তি। আমার এই ক্ষুদ্র হাতে ওসব ধরবে না।

কিন্তু সৌভাগ্যবশত এই জীবনে আমি অসংখ্য চমৎকার পুরুষও দেখেছি, যারা নিখুঁত-নিপাট ভদ্রলোক। কেবল নারী নয়, তারা জানেন সকল মানুষের সাথেই কীভাবে আচরণ করতে হয়। তারা সকলকে তাঁর প্রাপ্য সম্মানটি দেন, বিনিময়ে নিজেরাও সম্মানিত হন। আমাদের সমাজে যেখানে নারীকে পণ্য মনে করাটাই পৌরুষ দেখাবার মাধ্যম, সেই পরিবেশেও তারা ধরে রেখেছেন নিজের স্বকীয়তা। কেবল নিজের মা, বোন, স্ত্রী, প্রেমিকা কিংবা বান্ধবী নয়… আমি তাদেরকে দেখেছি সকল নারীকেই তাঁদের প্রাপ্য সম্মানটি দিতে। আমি পুরুষ বিধায় আমি শ্রেষ্ঠ- এই মিথ্যে অহংকার তাঁদের মাঝে নেই।

আমার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে, সে সবসময়ে বলে – ভদ্রলোক সেই ব্যক্তি, যে প্রতিকূল পরিবেশেও নিজের সম্মান ধরে রাখতে জানে, অন্যকে সম্মান দিতে জানে। যে দুর্বল ভেবে অন্যকে টিজ করে, নির্যাতন করে, নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়… সে আর যাই হোক ভদ্রলোক নয়।

একজন পুরুষ কতটা চমৎকার একজন মানুষ হতে পারেন, সেটা আমি এই মানুষগুলিকে দেখেই বুঝেছি। এদেরকে জীবনের নানান পর্যায়ে দেখেছি বলেই আমি অনেকের মত ক্ষোভ ঝেড়ে বলতে পারি না – ‘পুরুষ জাতটাই খারাপ!’

মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার একটা ছেলে সন্তান হোক। তাঁকে আমি আমার মনের মত করে মানুষ করবো, সে বেড়ে উঠবে চমতকার একজন পুরুষ হিসেবে। সে জানবে- জোর করার মাঝে কোন পৌরষ নেই, ছল চাতুরির মাঝে কোন পৌরষ নেই। পৌরষ কেবল অর্জন করে নেয়ার মাঝে- সেটা সম্পদ হোক, সম্মান হোক, কিংবা মানুষ!

প্রিয় পিতা-মাতা…
আপনি আপনার সন্তানকে একজন চমৎকার মানুষ হবার শিক্ষা দিচ্ছেন তো? শিক্ষা কেবল স্কুলের পাঠ্যবইতে থেমে নেই তো?

__________

লেখাটা প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা একটি বইয়ের অংশ বিশেষ। বইয়ের নাম- বোকা মেয়ের ডায়েরি। অমর একুশে বইমেলায় আসছে ফেব্রুয়ারিতে আসবে, বর্ষা দুপুর থেকে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।