মমতা কুলকার্নি: মাদক ও মাফিয়া জগতে হারিয়ে যাওয়া ডিভা

নব্বই দশকের সাহসী নায়িকাদের একজন ছিলেন মমতা কুলকার্নি। ‘তিরাঙ্গা’ সিনেমা দিয়ে ১৯৯২ সালে তিনি প্রথম পা রাখেন বলিউডে। এরপর আশিক আওয়ারা (১৯৯৩), ওয়াক্ত হামারা হ্যায় (১৯৯৩), ক্রান্তিবীর (১৯৯৪), সাবসে বাড়া খিলাড়ি (১৯৯৫), বাজি (১৯৯৫) দিয়ে তিনি বলিউডে প্রতিষ্ঠা পান। ১৯৯৪ সালে তিনি ফিল্মফেয়ারের বিবেচনায় বছরের সেরা নতুন মুখের পুরস্কার পান। ১৯৯৫ সালে মুক্তি পায় তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় হিট – সালমান খান, শাহরুখ খানের ‘করণ অর্জুন’।

এরপর সেই অবস্থান থেকে আরো সাফল্যের শিখরেই ওঠার কথা ছিল মমতার। কিন্তু, তা আর হয়নি। হয়নি, কারণ অন্ধকার জগতের নজরে চলে এসেছিলেন তিনি। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে তার মেলামো ছিল একেবারে ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই।

বলছি, ১৯৯৬ সালের কথা। মমতা তখন ছিলেন বলিউডের শীর্ষ আইটেম গার্ল, তাঁর নাচের তালে নাচতো বহু তরুণ ভক্তের হৃদয়। তখন তাঁর পরিচয় হয় বিজয়গিরি বিক্রম গোস্বামীর সাথে। বিক্রম ছিলেন আহমেদাবাদের স্মাগলার। মুম্বাইয়ের বিমানবন্দর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউনে কালো রঙের ব্রিফকেস ভর্তি করে বেআইনি পন্য আমদানি-রফতানি করে বিপুল অর্থের মালিক বনে গিয়েছিল বিক্রম ওরফে ভিকি।

মুম্বাই পুলিশের এনকাউন্টার স্পেশালিস্টদের একটি দল, যার মধ্যে ছিলেন প্রদীপ শর্মা ও দ্যায়া নায়করা তারা একবার একটা আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে পাঁচটি একইরকম ব্যাগ খুঁজে পেয়েছিল। বলাই বাহুল্য তার মধ্যে ছিল নিষিদ্ধ মাদক ম্যানড্রাক্স। আর পুরো ব্যাপারটার পেছনে ছিলেন বিজয়গিরি ‘ভিকি’ গোস্বামী।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের মুকুটহীন সম্রাট  দাউদ ইব্রাহিমের মত ওতটা না হলেও ভিকি নিজে কিন্তু কম গ্ল্যামারাস ছিলেন না। আর বলিউডে কি করে যেন তার প্রচুর গ্রহণযোগ্যতটা ছিল, প্রভাবও ছিল। সেই সূত্র ধরেই মমতার সাথে পরিচয় হয় ভিকির। হয় হৃদয়ের আদান-প্রদান।

ভিকি-মমতা

আরেক ডন ছোটা শাকিলের সাথেও নাকি মমতার দহরম মহরম ছিল। ১৯৯৮ সালে রাজকুমার সন্তোষী মমতাকে তাঁর ছবি ‘চায়না গেট’ থেকে মাঝপথে বের করে দেন । পরে আসে ছোটা শাকিলের ফোন। তাঁর হুমকিতেই নাকি ফের মমতাকে ছবিতে ফিরিয়ে নেন রাজকুমার।

কিন্তু, ২০০২ সালে গ্ল্যামার দুনিয়া থেকে একেবারেই হারিয়ে যান মমতা। মমতার শেষের দিকের কাজগুলো হল – সেন্সর (২০০১), ছুপা রুস্তম (২০০১) ও কাভি হাম কাভি তুম (২০০২)। বলিউডে ১০ বছরের ক্যারিয়ারে মমতা করেন মোট ২২ টি ছবি।

ওই সময় ভিকি তাঁর জন্য একরকম পাগলই ছিল। ভিকির তরফ থেকে একাধিক চেষ্টার পর অবশেষে এই অভিনেত্রীর মন গলে। ভিকির প্রস্তাবে সম্মতি দেন তিনি। যদিও, অনেকদিন দিন প্রেম করার পর বিয়েটা করেন বেশ দেরীতে গিয়ে, ২০১৩ সালে। তবে, মমতা যদিও আরো পড়ে দাবী করেন, ভিকির সাথে তাঁর বিয়ে হয়নি, কোনো প্রেমের সম্পর্কও নেই। তাঁরা দু’জন নাকি স্রেফ ব্যবসায়িক পার্টনার।

ড্রাগ পাচারকাণ্ডে দুবাইয়ে ১৯৯৭ সালে গ্রেফতার করা হয় ভিকিকে। তবে ভিকি জেলবন্দি থাকাকালীন মমতা স্থির করেন তিনি দুবাইতেই থেকে যাবেন। তখন থেকেই বলিউডের সাথে তার সম্পর্কের ছেদ পড়ে। আধ্যাত্মিক জীবন যাপন করছেন বলেও শোনা গিয়েছিল।

তবে, সবই ছিল অপরাধের পর্দা। ভিকির সংস্পর্শে অপরাধ জগতের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যান মমতা। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে তাকে কেনিয়াতে কুখ্যাত সব ড্রাগ মাফিয়াদের সাথে বৈঠক করতে দেখা যায় ভিকির সাথে।

মমতার বর্তমান

সে বছরের জুনে দু’হাজার কোটি রুপির আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকায় নাম আসে কুলকার্নির। ভিকি ও মমতা এখন ভারতের নারকোটিক ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সেস (এনডিপিএস) এর তালিকাভূক্ত অপরাধী। ক্রাইম ব্রাঞ্চের কর্মকর্তারা মুম্বাইয়ের ভারসোভায় মমতার বাড়ি স্কাই এনক্লেভের দরজায় গ্রেফতারি পরোয়ানা লাগিয়ে দিয়ে এসেছে। যদিও, তার খোঁজ মেলেনি।

মমতার এসব নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই। বরং, তিনি এক সাক্ষাৎকারে দাবী করেছেন, বলিউডে আসাটাই তার জীবনের একটা ভুল ছিল। মায়ের ইচ্ছা পূরণের জন্য বলিউডে না আসলেও পারতেন তিনি।

ভিকির গল্পটাও কিন্তু বলিউডের থ্রিলার ছবিকেও হার মানায়। আহমেদাবাদের সামান্য একজন স্মাগলার থেকে তিনি মুম্বাই আসেন। বলিউডের এক ‘সুইটহার্ট’-এর মন জয় করেন। এরপর দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়িয়ে মাদকের ব্যবসা করেন, ধরে ধিরৈ হয়ে ওঠেন মাদকদের দুনিয়ার বাদশাহ। ভারতের পুলিশ তো বটেই, ভিকি ইউএস ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সিও তাঁকে খুঁজছে।

তাঁকে ‘পাকারনা মুশকিল হি নেহি, না মুমকিন হ্যায়’!

– ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।