ফাহাদ ফাসিল: ফ্লপ স্টার থেকে অভিনয়ের কিংবদন্তি

জমকালো সূচনার পর হারিয়ে যাওয়ার গল্প তো ইন্ডাস্ট্রিতে বিস্তর শোনা যায়। এবার এমন একজনের কথা বলবো, যিনি নিজের বাজে সূচনা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিপুল বিক্রমে ফিরে এসেছেন, নিজেকে নিয়ে গেছেন কিংবদন্তিদের কাতারে।

১৯৮৩ সালের আট আগস্ট। ক’দিন আগেই কপিল দেবের ভারত ইংল্যান্ড থেকে বিশ্বকাপ জিতে ফিরেছে। ক্রিকেটের উন্মাদনায় ভাসছে গোটা দেশ। এমন সময় বিখ্যাত পরিচালক মোহাম্মদ ফাজিলের ঘরে জন্ম নেয় এক শিশু সন্তান। নাম রাখা হয় ফাহাদ ফাসিল।

ছোটবেলা থেকেই মালায়ালাম সিনেমা দেখে বেড়ে ওঠার কারণে সিনেমার প্রতি উন্মাদতা ক্রমশ বাড়তেই থাকে। কোন বাঁধাই তাকে দমন করতে পারেনি। সিনেমার সাথে জড়িত হলেও মুসলিম পরিবারের রক্ষণশীল মনোভাব চায়নি ফাহাদের ক্যারিয়ার ও সিনেমায় দিয়ে হোক।

কিন্তু ছেলের পাগলামোর কাছে ধরাশায়ী হতে হয় বাবা ফাজিলের। অনেকটা জোর করেই বাবার নির্দেশনায় অভিনেতা হিসেবে আবির্ভাব ঘটে রূপালি পর্দায়। কিন্তু যথাপুযুক্ত অনুশীলনের অভাবে তাঁর ফ্যাকাসে অভিনয় স্পষ্টতর হয়ে উঠে সিনেমার মাঝে। ২০০২ সালে অভিষেক সিনেমা ‘কায়েত্থুম দুরাথ’ মুখ থুবড়ে পড়ে বক্স অফিসে। ম্যামুট্টির ক্যামিওতেও সিনেমাটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

তখন ফাহাদের বয়স মাত্র ১৯। অভিনয় জীবনের শুরুতে বড়সড় ধাক্কা খেয়ে শিক্ষা পেলেন। বুঝে গেলেন কেবল স্বপ্ন থাকলেই চলবে না, স্বপ্নপূরণের জন্য নিজেকে সেভাবে তৈরি করতে হবে। তাই সময়টা পড়ালিখায় মনোনিবেশ করলো। মনে যদিও লালিত ছিলো অভিনেতা হিসেবে নিজের গড়ার, তার আগে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত মানুষ হিসেবে গড়তে মরিয়া হয়ে ওঠেন।

দীর্ঘ বিরতির পর, ২০০৯ সালে ‘কেরালা ক্যাফে’র মতো অ্যান্থোলজি গল্পের দারুণ চরিত্রে কাজের সুযোগ পান। তারই ধারাবাহিকতায় কিংবদন্তি অভিনেতা মামুট্টি ও জয়াসুরিয়ার মতো প্রতিভাবান অভিনেতাদের সাথে অভিনয়ের সুযোগ তাঁকে প্রভাবিত করে নিজেকে পরিণত সাবলীল রূপে গড়ে তোলার। এরপর কালক্রমে তিনি কেবল নিজের ক্যারিয়ারই নয়, মালায়ালাম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির পালাবদলেও রাখলেন বিশাল ভূমিকা।

‘ছাপ্পা কুরিশু’ সিনেমায় নেগেটিভ ইমেজের চরিত্র তাঁকে বড্ড ভাবিয়ে তোলে। দর্শক কী তাকে এত সহজে মেনে নিবে নেগেটিভ ইমেজে? কিন্তু সেদিকে কর্ণপাত না করে চরিত্রটির প্রয়োজনে নিজেকে সেভাবে গড়ে নিয়েছে। টানা কয়েক মাস ধরে অনুশীলন চলে, চরিত্রের সাথে মিশে যেতে।

এমনকি সিনেমার সম্ভাব্য নায়িকা রেমিয়ার সাথে প্রণয়ালাপ ব্যাপারটা রেমিয়াকে আজো ভড়কে দেয় চিন্তা করতে, সে কি আদৌ তার সাথে সত্যি প্রেম করছিলো না! যখন গল্পটি সিনেমাতে গড়ালো, ফলাফল অবিসম্ভাবী দেখালো। প্রত্যেকেই মোহিত হলো ফাহাদের অভিনয়ে।

‘২২ ফিমেল কোট্টায়াম’ সিনেমাতেও ফাহাদ ফাসিলের নেগেটিভ শেডের চরিত্রটি নিয়ে তাঁর মনে প্রফুল্লতা বড্ড বেশি ছিলো। রিমার সাথে সান্নিধ্যতা সেসময়ে মিডিয়া পাড়ায় গুজবের সৃষ্টি করে। কিন্তু চরিত্রানুযায়ী ফাহাদের রিমার সাথে একাগ্রচিত্তে মিশে যাওয়া মিডিয়ার কাছে আগুনে হাওয়া দেওয়ার মতোই কাজে দিলো। ফলাফল অবিস্মরণীয়। দূর্দান্ত সাফল্যের পাশাপাশি সিনেমাটিতে অভূতপূর্ব অভিনয়ের দরুণ সেরা অভিনেতার পুরষ্কার ফাহাদের ঝুলিতে আসে।

সেরা অভিনেতার পুরষ্কার কেবল ফাহাদের কাজের প্রতি অনুপ্রেরণা বাড়ায়নি বরং অভিনয়ের প্রতি ক্ষুধা দিনকে দিন আরো বাড়িয়ে তুলেছে। কিন্তু বাঁধ দেখা দিলো ইন্ড্রাস্টি পাড়ায়। তাঁর ‘ডায়মন্ড নেকলেস’ সিনেমাটি যদিও তুমুল প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু এই সিনেমাতেও তার চরিত্রটিতে নেগেটিভ ইমেজের ফলস্বরূপ সু-স্পষ্টতর।

যার ফলে একের পর এক একই ধরনের চরিত্রের গল্প ঘিরে ধরেছে ফাহাদকে ঘিরে। নিজেকে একবিন্দুতে একীভূত করতে চায়নি ফাহাদ। বরং মুখের উপরে অনেক ভালো মাপের পরিচালককেও না করে দিয়েছেন। যদিও এমন সিদ্ধান্তের দরুণ মনক্ষুন্ন হয়েছে অনেকের, কিন্তু ফাহাদ এগিয়ে গেল তার ব্যতিক্রমী চিন্তাচেতনায়।

‘আন্নায়ুম রাসুলুম’ রোমান্টিক গল্পে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন একেবারে সাদামাটা প্রেমিক হিসেবে। অন্যদিকে স্যাটায়ারধর্মী ‘আমেন’ সিনেমাতে তাঁর সরলমনা চরিত্রটি দর্শকের প্রশংসায় মুখরিত হয়ে উঠে।

ফাসিল তার এক সাক্ষাতকারে বলছিলেন, ‘আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং কাজ ছিলো মামুট্টি স্যারের সাথে ইমানুয়েল সিনেমাতে স্ক্রিন শেয়ার করা। সেসময়ে যদিও আমি চলতি সময়ের পরিচিত মুখ ছিলাম৷ কিন্তু চরিত্রের প্রয়োজনে আমি যখন মামুত্তির স্যারের কলার ধরে রাগীস্বরে কথা বলছিলাম। বিশ্বাস করবেন না ভয়ে আমার হাত পা কাঁপছিলো। বারবার মনে হচ্ছিলো দৃশ্যটা কোনভাবে এড়িয়ে যাই। কিন্তু স্বয়ং মামুত্তি স্যারই এগিয়ে আসলেন আমাকে স্বাভাবিক হতে। দৃশ্যটা স্বাভাবিক ভঙ্গিকে করতে পেরেছি দেখে আমি নিজেই হতবাক হয়েছি। মামুত্তি স্যারের আমার কাজের প্রশংসা অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। আমি সবসময় উনাকে আমার আইডল ভেবেছি।’

‘৫ সুন্দারিকাল’ অ্যান্থোলজি গল্পে দুলকার সালমান, জয়সুরিয়া, নিভিন পাওলির পাশাপাশি ফাহাদ ফাসিলেরও একটি গল্পে চমৎকার ইফেক্টিভ কাজ দর্শকনন্দিত হয়। গল্পটির প্রয়োজনে রাত জেগে টানা কয়েকদিন গাড়ি চালিয়ে শুট করতে হয়েছিলো। এর কারণে তাঁর শারীরিক সমস্যাও দেখা দেয়। কিন্তু কষ্টের লাঘব ঘটে দর্শকের সাদরে গ্রহণ করার ফলে।

ফাহাদ ফাসিল পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে অনেকটা খুঁতখুঁতে। যদিও সূচিবায়ু টাইপ কিছু নয়। কিন্তু আশেপাশের পরিচ্ছন্নতা মুড রিফ্রেশ করে বলেই মানেন তিনি। ব্যস ‘নর্থ ২৪ কাথাম’ সিনেমায় জার্মোফোবিক চরিত্রটি একেবারে খাপেখাপ হয়ে গেল। একজন সূচিবায়ু লোকের ভ্রমণকে ঘিরে চমৎকার জীবনধর্মী গল্পটিকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। এমনকি সেরা অভিনেতা হিসেবে পুরষ্কার ফাহাদের ঝুলিতে আসে।

‘আয়োবিন্তে পুস্তাকাম’ পিরিয়ডিক ধাঁচের গল্পতে ফাহাদের চমৎকার লুক আর চরিত্রটি দারুণ ছাপ ফেলে দর্শকের মাঝে। এতদিনে দর্শকের মাঝে জনপ্রিয় অভিনেতা রূপে চারদিকে সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

‘ব্যাঙ্গালোর ডেয়জ’ গল্পটি তিন কাজিনের জীবন ঘিরে নির্মিত হলেও ফাহাদের চরিত্রটি সিনেমায় অন্য মাত্রা যোগ করে। চরিত্রানুসারে তাঁকে লুকিয়ে করা রাখা হয় দীর্ঘ সময় ধরে। যার ফলে গুমোট স্বভাবের অনুভূতিগুলোকে ধামাচাপা দেওয়া অদ্ভুতুড়ে এক চরিত্রে ফুটে উঠেছে।

ফাহাদের গুণে মোহিত হয়ে সিনেমায় তাঁর স্ত্রীর চরিত্র করা নাজরিয়া নাজিম বাস্তবে তাঁর প্রেমে পড়ে যান। সিনেমা মুক্তির পর তাদের গভীর প্রণয় বিয়েতে রূপান্তরিত হয়। আজো তারা সুখো দম্পতি হিসেবে সংসার জীবন কাটাচ্ছেন।

মনসুন ম্যাঙ্গোজ একজন স্বপ্নবিভোর নির্দেশকের গল্পনির্ভর ফাহাদের চরিত্রটি সমালোচকদের ভীষণ পছন্দ হয়। অন্যদিকে জাতীয় পুরস্কার জয়ী মহেশিন্তে প্রাথিকারাম গল্পটি আজীবন মনে রাখার মতো অভূতপূর্ব সিনেমা হিসেবে ঠাঁয় পায় মালায়ালাম সিনেমা ইতিহাসের পাতায়।

‘টেক অফ’ নার্সদের রক্ষাকে ঘিরে বাস্তব গল্পনির্ভর সিনেমাতে ফাহাদের দূর্দান্ত ইফেক্টিভ হিসেবে ফুটে উঠে। সিনেমার তুমুল প্রশংসার পাশাপাশি পার্বতী ও ফাহাদের কাজেরও সুদূরপ্রসারী প্রশংসা হয়।

‘ভেল্লাইকারান’ সিনেমার মধ্য দিয়ে তামিল সিনেমাতে আবির্ভাব হয় ফাসিলের। শুরুতেই বাজিমাত বলা যায়। ফাহাদের চতুর স্বভাবের চরিত্রটি তামিল দর্শকদের মনেও দারুণ প্রভাব ফেলে।

‘থোন্ডিমুথালুম দৃকশাকশিয়্যুম’ মূলত এক চোরের গল্প। আর সেই চোর হলেন ফাহাদ। অথচ বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে ফাহাদ সিনেমাতে লিড রোলে নেই বরং সাপোর্টিং কাস্টে ছিলেন। এক পোশাকেই পুরো সিনেমার শুট করেছিলেন। পরিচালক সুকৌশলী নির্মাণশৈলিতায় চোর চরিত্রটি মূল চরিত্রের অংশ রূপেই ফুটে উঠছে। অভিনব অভিনয় দক্ষতা দিয়ে সমগ্র ভারতে সেরা পার্শ্ব  অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার পান ফাসিল।

‘কার্বন’ সিনেমাতে ধাপ্পাবাজ স্বভাবের চতুর ব্যক্তি ছিলেন ফাসিল। নিজের কাজ হাসিল করার জন্য জীবন বাজি রাখতেও প্রস্তুত ফাহাদ। চরিত্রের প্রয়োজনে দীর্ঘদিন জঙ্গলে রাত কাটাতে হয়েছে। সেসময়ের নানান বিচিত্র ঘটনা পরিবার লোকদের জানিয়ে ভীষণ মজা পান ফাহাদ।

‘নান প্রাকাশান’ গল্পে একেবারে চাপাবাজ টাইপের এক চরিত্র ফাহাদের। চরিত্রটি খুবই চেনা। আমাদের জীবনে জড়িয়ে থাকা আশেপাশেও এমন মানুষ রয়েছে। ফাহাদের জীবনেও ঠিক এমন ঘনিষ্ঠ মানুষ আছে। ঠিক যেন তাকে ভেবেই মিশে গেছেন তারই মতো করে। ফলাফল দূর্দান্ত সফলতার পাশাপাশি ফাহাদের অভিনয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন সকলে।

‘আথিরান’-এ ফাহাদের অভিনয়ের তারিফ না করে কেউ থাকতে পারেনি। অন্যদিকে মাস্টারপিস ‘সুপার ডিলাক্স’ সিনেমায় সামান্থার স্বামী হিসেবে ফাহাদের নজরকাড়া অভিনয় সেথুপাথির পাশাপাশি মোহিত করেছে সামান্থাকেও। সামান্থা সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ভবিষ্যতে সুযোগ হলে আবারো ফাহাদের সাথে কাজ করতে চাই। ফাহাদ অসাধারণ অভিনেতা, ওর চোখগুলোতে সরলতার ছাপ আছে। ওর এক্সপ্রেশনগুলো চমকপ্রদ। ফাহাদের সাথে অভিনয় করতে পারা সৌভাগ্যের ব্যাপার বটে।’

ফাহাদের নিজের প্রোডাকশনে ‘কুম্বালাঙ্গি নাইটস’-এ তাঁর চরিত্রটি সবাইকে রীতিমতো ভড়কে দিয়েছে। আসলেই আর কী সম্ভব না এই অভিনেতার দ্বারা? সব চরিত্রেই সমরূপে মিশে যেতে ওস্তাদ সুদক্ষ প্রতিভাবান এই অভিনেতা।

কেবল একজন অভিনেতা হিসেবে নয়, ব্যক্তি মানুষ হিসেবেও ফাহাদ ফাসিল খুবই সহজ সরল হাস্যোজ্জ্বল স্বভাবের মানুষ।চাইবো এভাবেই তিনি তাঁর অভিনয়ের জাদুতে জড়িয়ে রাখুক দর্শকদের।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।